kalerkantho


আসুন, আগে দুর্নীতিকে স্বীকার করি

বিমল সরকার   

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৪ ০০:০০



আসুন, আগে দুর্নীতিকে স্বীকার করি

দুর্নীতি নিয়ে আমাদের দেশে আলোচনা-সমালোচনার কোনো শেষ নেই। কেবল দেশে নয়, কখনো কখনো আমাদের দুর্নীতি নিয়ে দুনিয়াজুড়েই হইচই শুরু হয়। টিআই (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল) জরিপের রিপোর্ট প্রকাশের পর কয়েকটি দিন বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা দল দুটির নেতা-কর্মীদের এ নিয়ে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ করতে দেখা যায়। সহসাই এসব নিয়ে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং মনোযোগ একেবারেই স্তিমিত হয়ে যায়। দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা ক্রমে আরো বিস্তৃত হতে থাকে। আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে মতলববাজরা।

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল একটি দেশে দুর্নীতির অস্তিত্ব বা এর প্রবহমানতা নিয়ে কারোরই সংশয় থাকার কোনো সুযোগ নেই। সংশয়-সন্দেহের সুযোগ যদি কিঞ্চিৎ থেকেই থাকে তা হচ্ছে দেশটি দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত না হয়ে থাকলে সত্যিকার অর্থে কী পরিমাণে নিমজ্জিত তা নিয়ে। এ নিয়ে মনগড়া আলোচনা-সমালোচনার কারণে প্রকৃত পরিস্থিতিটি দেশবাসীর জানার বলতে গেলে কোনো সুযোগই থাকে না।

বাংলায় 'এক-এগারো' কিংবা ইংরেজিতে 'ওয়ান-ইলেভেন' শব্দ বা শব্দবন্ধটি আমাদের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। প্রধানত রাজনীতিকদের সৃষ্ট এক চরম নৈরাজ্যকর ও দুঃসহ পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। দেশে ও বিদেশে ওই সরকার ও আমাদের সেনাবাহিনী দারুণভাবে প্রশংসিত হয়।

সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের কর্মকাণ্ড ও সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে নানাজনের নানা মত থাকতে পারে। কিন্তু যেসব কারণে ওই সরকার বোধ করি সবার আস্থা অর্জন ও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল, সেগুলোর অন্যতম হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান। রাজনীতি করে, রাষ্ট্রক্ষমতায় কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে কতিপয় ব্যক্তির অল্প দিনে শত শত, এমনকি হাজার কোটি টাকা এবং সম্পদ-সম্পত্তির মালিক বনে যাওয়া- ইত্যাকার পরিস্থিতিতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি সচেতন সবার কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন হয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানসহ সরকারের অনেক ইতিবাচক কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মনে প্রথম দিকে ব্যাপক আশা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। কিন্তু দিন দিন নানা কারণে তাতে ভাটার টান পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রকাশিত টিআই প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আমাদের দেশের অবস্থান হয় ১৪তম; গতবার যা ছিল ১৬তম। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচটি বছর বিশ্বের বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় এক নম্বরে থাকার পর ক্রমান্বয়ে অবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে ১৬তম অবস্থানে উঠে আসাটা কম কথা নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, আমরা আরো এগিয়ে নিয়ে যাব তো দূরের কথা, আগের অবস্থানটিকে ধরেই রাখতে পারিনি। উপরন্তু উল্টোদিকেই আবার যাত্রা শুরু করেছে।

বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে দুর্নীতি আজ দেশে দুরারোগ্য ব্যাধির রূপ নিয়েছে। কঠিন এই ব্যাধিকে রাতারাতি দমন বা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। দুর্নীতি দমন কিংবা প্রতিরোধ পরে, আগে দুর্নীতি যে হয় এবং দেশে দুর্নীতি আছে তাকে সবার স্বীকার করতে হবে। সবার মনে রাখা ভালো, দুর্নীতিকে অস্বীকার করে এর দমন কিংবা প্রতিরোধ করা কারো পক্ষেই সহজ এবং সম্ভব হবে না। এখানে আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। দেশে যে দুর্নীতি হয় কিংবা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু কিন্তু তা কখনো অস্বীকার করেননি। বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন খুবই সোচ্চার। ঘাতকদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হওয়ার এক মাস আগে ১০ জুলাই ১৯৭৫ বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে দুর্নীতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, 'কেবল পয়সা খাইলেই দুর্নীতি হয় না। বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করা যেমন দুর্নীতি, কাজে ফাঁকি দেওয়াও তেমনি দুর্নীতি। একইভাবে নিচের অফিসারদের কাজ না দেখাটাও দুর্নীতি।' বাংলাদেশ পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের যৌথ সম্মেলনে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি আরো বলেন, '... শুধু দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে মানুষের ৩০ শতাংশ দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে।' প্রকৌশলীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আপনারা যদি আজকে বলেন, আমরা কেবল দুর্নীতির উর্ধ্বে থাকব, তাহলে এক বছরে বাংলার চেহারার অনেক পরিবর্তন হবে। সামান্য কিছু লোকের জন্য আপনাদের মুখ কালো হয়ে যায়। ১০, ২০ বা ৩০ শতাংশ মানুষ যদি অন্যায় করে, তাহলে ১০০ জনেরই বদনাম হয়। তাদের ডিসমিস করেন না কেন? পানিশমেন্ট কেন দেন না? আমি শেখ মুজিবুর রহমান দালানের কাছে গেলে বুঝতে পারি না যে কয় বস্তা বালিতে এক বস্তা সিমেন্ট দিল। কিন্তু আপনি যে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আছেন, আপনি হাত দিলেই বুঝতে পারেন, কয়টায় কয়টা দিল? কেন ধরেন না? ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। ধরতে চাইলেই ধরা যায়।' (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ১১-০৭-১৯৭৫)।

লেখক : কলেজ শিক্ষক

 

 



মন্তব্য