kalerkantho


চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও খসরু ভাই

মোরশেদুল ইসলাম   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ ০০:০০



বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বছরব্যাপী সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালিত হলো গত বছর। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি (বর্তমানে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ দেশে সফল সূচনা হয়েছিল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের।

৪ জানুয়ারি ২০১৩ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হয় বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার। উদ্বোধন করেন ঋতি্বক ঘটকের যমজ বোন শ্রীমতী প্রতীতি দেবী। এরপর একে একে আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী সেমিনার (১৬ মার্চ), সুবর্ণজয়ন্তী শোভাযাত্রা (৩ এপ্রিল, জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে), 'বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সংকট: উত্তরণের পথ' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা (৮ জুলাই), সুবর্ণজয়ন্তী চলচ্চিত্র উৎসব ও স্মারক বক্তৃতা (১২-২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৪) এবং চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের পুনর্মিলনী ও সম্মাননা প্রদান (১৮ এপ্রিল ২০১৪)। এ ছাড়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ইতিবৃত্ত নিয়ে প্রকাশিত হয় সুবর্ণজয়ন্তী স্মারক গ্রন্থ। বছরব্যাপী পুরো আয়োজনটির প্রধান সহযোগী স্পন্সর ছিল বসুন্ধরা গ্রুপ।

বছরব্যাপী উৎসব আয়োজনের জন্য মুহম্মদ খসরুকে আহ্বায়ক করে একটি জাতীয় উদ্যাপন পরিষদ গঠন করা হয়। এ ছাড়া মাহবুব জামিলকে সভাপতি করে গঠিত হয় জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদ।

সব আয়োজনই সফলভাবে সম্পন্ন হয় বটে, কিন্তু বরাবরের মতো এবারও দুর্ভাগ্যজনকভাবে চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থেকে সব আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। শুরুটা হয়েছিল চমৎকারভাবে। আয়োজকদের প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ মুহম্মদ খসরুর নেতৃত্বে সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবটি আয়োজন করার। এ ক্ষেত্রে আমরা সফলও হয়েছিলাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুহম্মদ খসরুর প্রাণবন্ত উপস্থিতি আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু তারপর আর একটি অনুষ্ঠানেও আমরা খসরু ভাইকে পাইনি। তিনি এমনকি উৎসব বর্জনের জন্য বিভিন্নজনকে প্রভাবিত করতে থাকেন। কিন্তু কেন? কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছিল কি? থাকলে সেটা কী আলোচনা করে দূর করা যেত না? কিন্তু শত চেষ্টা করেও আমরা খসরু ভাইয়ের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসতে পারিনি। যে কারণগুলো আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তাই এই লেখাকেই বেছে নিতে হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিন, ৫ জানুয়ারি 'সময়' টেলিভিশনে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন নিয়ে একটি সরাসরি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রথমেই খসরু ভাইকে অনুরোধ জানানো হয় তাতে উপস্থিত থাকতে, কিন্তু স্বভাবসুলভভাবেই তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। তাঁর পরিবর্তে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় লাইলুন নাহার সেমিকে। আরো আমন্ত্রণ জানানো হয় উৎসব উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি মাহবুব জামিল ও বর্তমান প্রজন্মের চলচ্চিত্র সংসদকর্মী বেলায়েত হোসেন মামুনকে। অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় উঠে আসে ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ গঠনের কিছু বিচ্ছিন্ন ও অসফল উদ্যোগের কথা। এটিও ব্যাখ্যা করা হয় যে কেন আমরা বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সূচনা সাল ধরছি ১৯৬৩ সালকে এবং তা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে। কারণ বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদই প্রথম সফল চলচ্চিত্র সংসদ, যা দীর্ঘদিন টিকে আছে; শুধু তাই নয়, যে চলচ্চিত্র সংসদটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পেরেছে। অন্য উদ্যোগগুলো, এমনকি ১৯৬৩ সালের শুরুর দিকে মাহবুব জামিলের নেতৃত্বে গঠিত স্টুডেন্টস ফিল্ম সোসাইটিও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ। কারণ এর একটিও টিকে থাকতে পারেনি, একটি বা দুটি অনুষ্ঠানের পরই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাস আলোচনায় এই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোর কথাও আসবে। কারণ তৎকালীন পত্রপত্রিকায় এই উদ্যোগগুলো সম্পর্কে সংবাদ ছাপা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার মানে কোনোভাবেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদকে খাটো করে দেখা নয়; বরং ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।

সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে উদ্যাপন পরিষদের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে অবদান রাখার জন্য তিনজনকে সুবর্ণজয়ন্তী পদক এবং ৩১ জনকে সুবর্ণজয়ন্তী স্মারক সম্মাননা প্রদান করা হয়। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করার জন্য তিনজনকে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ সম্মান সুবর্ণজয়ন্তী পদক। তাঁরা হচ্ছেন আলমগীর কবির (মরণোত্তর), মাহবুব জামিল ও মুহম্মদ খসরু। এ তিনজনসহ অন্য ৩১ জনের নামের তালিকা করার সময় আমরা বয়সের জ্যেষ্ঠতা অনুসরণ করেছি এবং তা সব প্রকাশনায় উল্লেখও করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি যে খসরু ভাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, কেন তাঁর নাম ৩ নম্বরে দেওয়া হলো। এ ক্ষেত্রে আমাদের ব্যাখ্যা যে যুক্তিযুক্ত, তা যেকোনো সচেতন মানুষই উপলব্ধি করবেন বলে আশা করি। সুবর্ণজয়ন্তী পদক পাওয়া তিন ব্যক্তির মধ্যে বা স্মারক সম্মাননা পাওয়া ৩১ জনের মধ্যে কার অবদান বেশি বা কার কম, সেটা নির্ভুলভাবে বা সন্দেহাতীতভাবে নির্ণয় করা কি সম্ভব?

খসরু ভাইয়ের আরেকটি অসন্তোষ আমাদের স্মারক গ্রন্থটি নিয়ে। এই বইতে নাকি তাঁর বা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এটা কি সম্ভব? বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ইতিহাস আলোচনা কি মুহম্মদ খসরু বা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের অবদানকে অস্বীকার করে হতে পারে? এই বইটি একটি সংকলন গ্রন্থ, যেটি মূলত বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের লেখা দিয়ে সাজানো হয়েছে। খসরু ভাই তাঁর লেখা ছাপার অনুমতি দেননি। এবং খসরু ভাইয়ের লেখা ছাপতে না পারা যে এই বইয়ের অন্যতম অপূর্ণতা, সেই আক্ষেপ বইটির সম্পাদকীয়তে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। বইতে সর্বোচ্চ মোট ছয়টি লেখা ছাপা হয়েছে মাহবুব আলমের, যিনি মুহম্মদ খসরুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী। বইটিতে যতবারই খসরু ভাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে ততবারই তাঁকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলে লেখাটি শেষ করব। ১৯৮৩ সালে আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি 'আগামী'কে যখন সেন্সর বোর্ড আটকে দেয়, তখন আমি ফিল্ম আর্কাইভ মিলনায়তনে কিছু নির্বাচিত দর্শকের জন্য ছবিটির একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম। খসরু ভাই সেখানে এসেছিলেন। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের এই প্রবাদতুল্য মানুষটিকে আমি স্বচক্ষে সেদিনই প্রথম দেখি। আমার মনে আছে, ছবিটি দেখার পর তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, 'ভালো ছবি বানাইছ'। তাঁর সেই একটি কথা আমার জন্য যে কত মূল্যবান ছিল তা আমিই জানি। ছবিটি পরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেও খসরু ভাইয়ের সেই একটি বাক্যই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। আজ যখন সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে শত ব্যস্ততার মাঝেও আমরা সফলভাবে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালন করলাম, তখন খসরু ভাই যদি একটা ফোন করে বলতেন, 'যাক শেষ পর্যন্ত ভালোই করছ', তাহলে তারচেয়ে আনন্দের কি আর কিছু থাকত?

লেখক: চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী

 

 



মন্তব্য