kalerkantho

ষোলোতেই বৃত্তবন্দি মহিলা ফুটবল

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ষোলোতেই বৃত্তবন্দি মহিলা ফুটবল

বয়সভিত্তিক ফুটবলের সাফল্য দিয়ে বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল একটা ঘোর তৈরি করেছিল। গোটাকয়েক টফি জিতে বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু বিরাটনগরে ভারত-নেপালের তোপে সেই চশমা ভেঙে গিয়ে এক চরম সত্যের মুখোমুখি দেশের মহিলা ফুটবল। সত্যটা হলো, মহিলা ফুটবল এখনো বয়সের গণ্ডি পেরোতে পারেনি—সাফল্যের রণক্ষেত্র সেই অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যন্তই।

বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল দলটাকে দেখে সেই শিয়ালের কুমিরছানা দেখানোর গল্পই মনে হবে। একটি ছানাকেই বারবার দেখিয়ে কুমিরকে মিথ্যা আশ্বাস দিত শিয়াল। আর বাফুফের উইমেন্স উইংয়ের ডানার নিচে আছে একদল প্রতিশ্রুতিশীল কিশোরী ফুটবলার। ওদের দিয়ে বয়সভিত্তিক আসর জেতা যায়, কিন্তু সিনিয়র পর্যায়ে সাফল্যের পথটা বহু দূরের। হাতে গোনা কিছু খেলোয়াড় দিয়ে সিনিয়র ও বয়সভিত্তিক তিনটি দল গঠন করা প্রায় দুঃসাধ্য। সব মিলিয়ে ক্যাম্পে আছেই মাত্র ৪২ জন মেয়ে। এঁদের নিয়েই বাফুফের মহিলা ফুটবলের সংসার। দুই বছর ধরে ক্যাম্প করে যাচ্ছে তাদের নিয়ে। অথচ একাডেমি-প্রথায় একটি বয়সভিত্তিক দলেরই ওই পরিমাণ খেলোয়াড় থাকার কথা। পরশু সেমিফাইনালে ভারতের কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বাফুফের টেকনিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক ডিরেক্টর পল স্মলিও সেটি স্বীকার করেছেন, ‘ভারত ও নেপালের বিভিন্ন বয়সী দলে আলাদা আলাদা ২০-২৫ জন খেলোয়াড় আছে। এটা তাদের শক্তি। কিন্তু আমাদের আছে সিনিয়র-জুনিয়র মিলিয়ে কিছু খেলোয়াড়। ফুটবল উন্নয়নের দিক দিয়ে এটা বড় অসুবিধার দিক। তাই সিনিয়র দলের ফলের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। এই মেয়েরা বড় হলে এবং অভিজ্ঞতা বাড়লে একসময় ফল মিলবে।’

কিন্তু বাংলাদেশ দলের মেয়েদের বয়স কত? গ্রুপ ম্যাচের আগে সে প্রশ্ন তুলে নেপালি কোচ হরি হড়কা বলেছেন, ‘লড়াইটাকে মেয়ে আর মহিলার বলা সংগত হবে না। বাংলাদেশের মেয়েদেরও বয়স অনেক, তাদেরও সিনিয়র দলে খেলার বয়স হয়েছে।’ বোঝা গেল টুর্নামেন্ট শুরুর আগে পল স্মলির বলা ‘লড়াইটা মেয়ে বনাম নারীর’—কথাটা পছন্দ হয়নি খড়কার। আর বয়সভিত্তিক আসরে বাংলাদেশের বয়স বাড়ানোর অতীত তো রয়েছেই। তবে প্রতিপক্ষের মুখ থেকে এমন অভিযোগ শুনে বাংলাদেশের ব্রিটিশ টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খুব মর্মাহত, ‘আমি খুবই অপমানিত এবং হতাশ। প্রতিবেশী দেশের বন্ধুর কাছ থেকে এ রকম মন্তব্য আশা করিনি। আমরা অনূর্ধ্ব-১৪ ও ১৫ বয়সভিত্তিক দল গঠনের সময় প্রচুর পরিশ্রম করেছি। সব দেখে-শুনে বাছাই করা হয়েছিল মেয়েদের।’

এর পরও সাফের তিনটি ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই দলের সব পারফরমারই অনূর্ধ্ব-১৬ দলের। ১৯-২০ বয়সীদের কারো পায়ে খেলা ছিল না। ভুটানের বিপক্ষে সাবিনার গোলটি বাদ দিলে অধিনায়কও ছিলেন সাদামাটা। কারণ দুই বছর ধরে কাজ হয়েছে ১৬-১৭ বছর বয়সীদের নিয়েই। ২০১৭ সালে থাইল্যান্ডে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলের মূল পর্ব খেলে আসার পর তারা দেশে-বিদেশে খেলেছে ৯টি টুর্নামেন্ট। বাফুফের মহিলা ফুটবল ক্যাম্পের বাকি ২০-২২ জনের জন্য ছিল না প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক টুর্নামেন্ট, শুধু সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ টুর্নামেন্ট ছিল। দীর্ঘদিন ম্যাচ থাকার পর তারা নেপালে এসেছে সিনিয়র ফুটবল খেলতে। পল এটাকেও বড় সংকট মানছেন, ‘মেয়েদের জন্য ঘরোয়া ফুটবলে কিছু নেই। তাদের কোনো খেলা নেই। এই অবকাঠামো তৈরি করা না গেলে মহিলা ফুটবলের উন্নতি করা যাবে না।’

এ নিয়ে অবশ্য বাফুফের কোনো তোড়জোড় নেই। তাদের মহিলা ফুটবল ডেভেলপমেন্টের থিওরি হলো, ৪২ জনকে বছরের পর বছর ক্যাম্পে রেখে প্র্যাকটিস করানো। এরপর বিদেশে গিয়ে ম্যাচ খেলা। সেটাও আবার সবার জন্য নয়। ফুটবলের আকাশ এত ছোট হলে সেখানে সূর্যোদয় হবে না কখনোই।

মন্তব্য