kalerkantho

এবার সেমির চৌকাঠেই থামল বাংলাদেশ

২১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এবার সেমির চৌকাঠেই থামল বাংলাদেশ

আন্ডারডগের থিওরিতেও কাজ হয়নি। পারফরম্যান্সও হয়েছে ছোট দলের মতোই। তাই সেমিফাইনালে ভারতের কাছে ৪-০ গোলের হারে মনের ঝাঁপিতে লুকিয়ে রাখা স্বপ্ন আর উঁকিও দেয়নি বাংলাদেশ দলের। 

আগেরবারের রানার্স-আপ হিসেবে স্বপ্নটা ছিল ফাইনাল খেলার। সেটাও যে খুব উচ্চৈঃস্বরে বলে বেড়িয়েছেন, তা-ও নয়। তবে টিম ম্যানেজমেন্ট ঠারেঠোরে বলেছিলেন ফাইনালের কথা। তবে সেই অঙ্কে গরমিল শুরু হয়েছিল গ্রুপ থেকেই। নেপালের বিপক্ষে উড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেমিফাইনালের অঙ্কে প্রতিপক্ষ হয়ে হাজির হয় শক্তিশালী ভারত। চারবারের চ্যাম্পিয়ন তারা, এখনো পর্যন্ত সাফের ইতিহাসে তারা অপরাজেয়। তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশ সিনিয়র দলের বড় সাফল্য ড্র এবং সাকল্যে তিন গোল! এমন দলের বিপক্ষে কিনা গোল-বিলাসী হতে গিয়ে নিজেদের পায়ে গোলের কুড়াল মেরেছেন সাবিনা-মনিকারা।

সেমিফাইনালের জন্য বেশ আক্রমণাত্মক দল সাজিয়েছিলেন কোচ। বেশ ভালো, গোল করে জিততে চায় বাংলাদেশ। কিন্তু আক্রমণে মনোযোগী হতে গিয়ে নিজেদের রক্ষণ যে অরক্ষিত হয়ে যেতে পারে, সে খেয়াল ছিল না ম্যানেজমেন্টের। আগের ম্যাচে ২৮ মিনিটেই নেপালের কাছে তিন গোল হজম থেকে টিম ম্যানেজমেন্ট কোনো শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে হয়নি। রক্ষণ যে প্রতিপক্ষের জন্য ‘খোলা মাঠ’ হয়ে আছে, সেদিকে নজর দেননি কেউ। তাই গোলরক্ষক রূপনার প্রথম ভুলের পর ভারতীয়রা গোলের মালা গেঁথেছে বাংলাদেশের সীমানায় বসে। বিনি সুতোর সে মালা গাঁথা অসহায়ের মতোই দেখেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। ভারতীয় মেয়েদের ফুটবল টেকনিক-ট্যাকটিকসে উড়ে গেছে বাংলাদেশের শুরুর ১৭ মিনিটের তৃপ্তি। গোলাম রব্বানী ছোটন তাই আক্ষেপ করেন, ‘নেপাল ম্যাচের মতোই হয়েছে। ১৭ মিনিট ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছি আমরা, এরপর রূপনার এক ভুলে গোল খেয়ে পুরো দল ছন্নছাড়া হয়ে যায়। পরের দুই গোলে ম্যাচ গ্রিপ থেকে বেরিয়ে যায়, দুটো গোলে ডিফেন্ডাররা কেউ পজিশনেই ছিল না।’

চারবারের চ্যাম্পিয়নরা শুরুতে ম্যাচ ধরতে পারেনি। দাপিয়ে খেলার চেষ্টা করেছেন সানজিদা-কৃষ্ণা-সাবিনারা। তাতে হাততালিও মিলেছিল। ভারতকে যে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে না সাধারণ নেপালিরা। তা ছাড়া শ্রীলঙ্কাকে সেমিফাইনালে ৪-০ গোল হারানো নেপাল ফাইনালের মঞ্চে চারবারের চ্যাম্পিয়নকে চাইবে-ই বা কেন! তাই শিরোপার অঙ্ক সহজ করতে বাংলাদেশকে অকুণ্ঠে সমর্থন করেছে গ্যালারি। সে অনুপ্রেরণাতেই শুরুতে উজ্জ্বল সাবিনারা।  গোলের সুযোগ তৈরি করতে না পারলেও চাপে রেখেছিল ভারতীয় ডিফেন্সকে, সুবাদে তিনটা কর্নার কিকও পায় ওই ১৭ মিনিটে। অথচ প্রতিপক্ষ প্রথম কর্নার পায় ১৮ মিনিটে এবং সেটিতেই গোল, দায় এড়াতে পারবেন না রূপনা। সঞ্জুর কিকটি গ্রিপে নিতে গিয়ে ছোটখাটো গড়নের বাংলাদেশি গোলরক্ষকের হাত ফসকে গেলে দালিমার টোকায় লিড নেয় ভারত। গোলবারের অর্ধেকে পড়ে থাকেন এই গোলরক্ষক। তাঁর জন্য বল গ্রিপে নেওয়া বড় কঠিন, সহজতম ছিল পাঞ্চ করা। এই উচ্চতা নিয়ে তাঁর সিনিয়র দলে গোলবার আগলানোও যেন অনেকটা বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর মতো! গোলরক্ষকের এই অক্ষমতা বুঝেই প্রতিপক্ষ বারবার রূপনার মাথার ওপর দিয়ে শট নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

সেসব চেষ্টা বৃথা গেলেও ভারতীয়দের লং বলে খেলাটা ধরতেই পারেনি বাংলাদেশের মেয়েরা। ওপরে উঠে তারা তাড়াতাড়ি নিচে নামতে জানেন না। ২২ মিনিটের নিজেদের ডিফেন্স থেকে পাঠানো এক লং বলে ভারতের দ্বিতীয় গোলের সূত্রপাত। ডিফেন্ডার শিউলিকে পরাস্ত করে সঞ্জু পোস্টের সামনে ঠেলে ইন্দুমতিকে সাজিয়ে দেন সহজতম গোলটি। বাঁদিকে দুর্দান্ত খেলেছেন সঞ্জু যাদব, ২৮ মিনিটে বাঁদিক দিয়ে আরেকটি সুযোগ তৈরি করে রূপনার গায়ে মারায় রক্ষা। নইলে তখনই ব্যবধান ৩-০ হয়। আট মিনিট বাদে অবশ্য সেটাই হয়েছে। সেটাও লং বলে কাউন্টার, সন্ধ্যার বানিয়ে দেওয়া বলে ইন্দুমতি করেন নিজের জোড়া গোল। নেপাল ম্যাচ শেষ হয়েছিল ২৮ মিনিটে, সেমির শেষ ৩৬ মিনিটের তিন গোলে। এরপর আর বাংলাদেশের মেয়েদের খেলার কী থাকে! 

এরপর তাঁরা খেলেছেন, মাঝেমধ্যে বল নিয়ে ওদের সীমানায় হানা দিয়েছেন। বিরতির আগে মারিয়ার ফ্রি-কিকে একটি আত্মঘাতী গোলের সম্ভাবনা জেগেছিল, সেটিও শেষ পর্যন্ত হতে দেয়নি ভারতীয় ডিফেন্স। উল্টো ইনজুরি টাইমে খেয়েছে আরেক গোল, করেছেন বদলি মনীষা। ৪-০ স্কোরলাইনে ফুটে উঠেছে দুই দেশের ফুটবল সামর্থ্যের পার্থক্যও। ভারতীয় আক্রমণে বৈচিত্র্যে ভরপুর।  কখনো মাঝমাঠ দিয়ে উঠছে তো কখনো-বা উইং থেকে বল ফেলছে। বক্সের ওপর চমৎকার খেলে সামনে জায়গা করে বল বের করছে আর এসবে বারবার পরাস্ত হয়েছে বাংলাদেশি ডিফেন্স। ভারতীয় কোচ মায়মল রকির কণ্ঠে তাই ঝরেছে সন্তুষ্টি, ‘এই ম্যাচ নিয়ে আমরা কিছু কৌশল ঠিক করেছিলাম, মেয়েরা সেই অনুযায়ী খেলতে পেরেছে। সব সময় হয়তো মাঠে গিয়ে পরিকল্পনামতো খেলা যায় না। যেদিন পারে, সেদিন ফুটবলটা মাঠে দারুণ সুন্দর হয়ে ওঠে।’

সিনিয়র লেভেলে এই সৌন্দর্য কখনো বাংলাদেশকে আলিঙ্গন করেনি। জুনিয়র পর্যায়ের সাফল্যের ধারাবাহিকতা কবে যে সঞ্চারিত হবে সিনিয়র দলে!

মন্তব্য