kalerkantho


আমাদেরও সমান নিরাপত্তা দাবি করতে হবে

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



আমাদেরও সমান নিরাপত্তা দাবি করতে হবে

সকাল পৌনে ৮টা। ঘুম তখনো ভাঙেনি পুরোপুরি। ঘুম ঘুম চোখে মোবাইল স্ক্রিনের ফেসবুকে চোখ রাখতেই চমকে উঠি। একি দেখছি আমি! বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল তৃতীয় টেস্ট খেলার জন্য এখন যে ক্রাইস্টচার্চে আছে, নিউজিল্যান্ডের সে শহর এমন রক্তাক্ত!

চোখজোড়া থেকে ঘুম পালিয়েছে ততক্ষণে। আমি পাগলের মতো টিভির রিমোট খুঁজতে থাকি। আমাদের ক্রিকেটাররা নিরাপদে রয়েছে তো! আমার সন্তানতুল্য যে মুশফিক-তামিম-রিয়াদ ওরা সবাই সুস্থ তো! ক্রিকেটারদের নিরাপদে থাকার খবর শুনে একটু স্বস্তি পাই। কিন্তু ওদিকে যে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ! ২০, ২৭, ৩৮, ৪৭—সংখ্যা বাড়তেই থাকে। তা দেখতে দেখতে আমি অবাক হয়ে ভাবি ২০১০ সালের কথা।

সেবার বাংলাদেশ জাতীয় দলের নিউজিল্যান্ড সফরে আমি ম্যানেজার। এই ভূমিকায় ক্রিকেটবিশ্বের কত কত দেশে গিয়েছি! নিউজিল্যান্ডের মতো এমন নিরাপদ কোথাও বোধ করিনি। হবে না? ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীই তো নাকি দুজন মাত্র নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলাচল করেন। লোকজন কম। ৯ বছর আগের সেই সফরে হ্যামিল্টনে টি-টোয়েন্টি খেললাম। নেপিয়ার, ডানেডিন, ক্রাইস্টচার্চে ওয়ানডে খেলে হ্যামিল্টনে টেস্ট দিয়ে সফরের শেষ। প্রতিটি শহরের মানুষগুলো এত ভালো! কথা বলে কম। ব্যাংকে টাকা ভাঙাতে গিয়েও দেখি স্যুট-টাই পরা লোকজনও হাসিখুশি।

কালকের এই সন্ত্রাসী ঘটনার পর চিরদিনের জন্য নিউজিল্যান্ড হয়তো বদলে গেল!

২০১০ সালের সেই সফরে আমাদের অনুশীলন দেখতে কিছু লোক আসত। ম্যাচেও থাকত। প্রথা অনুযায়ী নিরাপত্তা দেওয়া হতো আমাদের। কিন্তু তাতে কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। আমাদেরও কখনো মনে হয়নি যে, আরো বাড়তি নিরাপত্তা প্রয়োজন। আজকের ঘটনার পর ৯ বছর আগের সেই সফরের কথা ভেবে আমার ভেতরটা বারবার কেঁপে উঠছে। খুব সহজেই তো তখন এমনই এক ঘটনা ঘটতে পারত!

নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে একেবারেই চিন্তিত ছিলাম না বলছি। কিন্তু ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলাম পাকিস্তান নিয়ে। ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের বাসে বন্দুকধারীর হামলার খবর তো সবার জানা। এর পর থেকে ওই দেশে যায় না কোনো জাতীয় দল। ২০১৫ সালে ম্যানেজার হিসেবে বাংলাদেশের নারীদের জাতীয় দল নিয়ে যাই পাকিস্তান। খেলি দুটি করে টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে। করাচিতে আমাদের সেবার দেওয়া হয় প্রায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা। ছয় স্তরের নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছিলাম বলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।

পাকিস্তানে ভয় ছিল, সেখানে কিছু হয়নি। অথচ যে নিউজিল্যান্ডকে আমি মনে করি পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ তিন দেশের একটি, সেখানেই কিনা আজ এমন একটা রক্তপাত হয়ে গেল!

অনেক বড় ট্র্যাজেডির শিকার হতে পারত আজ বাংলাদেশ ক্রিকেট। সেটি হয়নি। এখন নিশ্চিত করতে হবে, ভবিষ্যতে যেন অমন আশঙ্কা এড়িয়ে চলতে পারি। বিদেশিদের আমরা যে নিরাপত্তা দিই, সফরের সময় ঠিক তেমন নিরাপত্তার দাবি করা উচিত বিসিবির। বোর্ডের সিকিউরিটি ম্যানেজারকে সফরের ১৫ দিন বা এক মাস আগে সে দেশে পাঠিয়ে অবস্থা সম্পর্কে পুরো ধারণা পেতে হবে। জানতে হবে সে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা আমাদের ছেলেদের জন্য যথেষ্ট কি না। পুরো সফরে দলের সঙ্গে কমান্ডো রাখা উচিত। মোদ্দা কথা, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার ব্যাপারে এক বিন্দু ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তাতে যত টাকা লাগে লাগুক। ক্রিকেট বোর্ডের যত বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে, তা যেন নেয়।

আর এখনকার কাজ যত দ্রুত সম্ভব পুরো দলকে দেশে ফিরিয়ে আনা। এরপর এই ট্রমা থেকে বের করার জন্য প্রয়োজনে মনোবিদদের সাহায্য নেওয়া। পরবর্তীতে ক্রিকেট মাঠে গিয়ে যদি এ ঘটনা ওদের মাথায় ঘুরপাক খায়, তাহলে কখনোই শতভাগ দিয়ে খেলতে পারবে না।

আজ যা হয়েছে, তা অনেক বড় সতর্কঘণ্টা। সে পাগলাঘণ্টির আওয়াজে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সতর্ক হতে হবে। হতেই হবে।

♦ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও ম্যানেজার



মন্তব্য