kalerkantho


কোচদের বেতনবৈষম্য

৯০ জনের ২৭ লাখ, একজনেরই ১৮!

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



৯০ জনের ২৭ লাখ, একজনেরই ১৮!

এক সময় শৈশবের পাঠ্য বইতে পণ্ডিতমশাইয়ের দুর্ভাগ্যের কথা জেনে কত কোমলমতিরই না চোখ ভিজেছে বেদনায়। বিলেতি স্কুল পরিদর্শকের পোষা কুকুরের পেছনে মাসিক ব্যয় ৭৫ টাকা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন ২৫ টাকা বেতনের পণ্ডিতমশাই। সে নির্দয়তার সঙ্গে তুলনীয় না হলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে দেশি আর বিদেশি কোচদের বেতনবৈষম্য চমকে ওঠার মতোই। তুলে ধরেছেন মাসুদ পারভেজ

বছর পনেরো হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অধীনে বয়সভিত্তিক পর্যায়ের কোচ হিসেবে কর্মরত সাবেক ফাস্ট বোলার দীপু রায় চৌধুরী। সম্প্রতি তাঁর বেতন বেড়ে ছয় অঙ্ক ছুঁয়েছে। বিসিবি নিযুক্ত ৯০ জন স্থানীয় কোচের মধ্যে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পান আরেকজন। তিনিও দীপুর মতোই হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটের সিনিয়র কোচ জাফরুল এহসান।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অঙ্কটা অনেক মনে হলেও এখানে কাজ করা বিদেশি কোচদের তুলনায় যা সামান্যই। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম পাওয়া জাতীয় দলের ভারতীয় স্পিন বোলিং কোচ সুনীল যোশীর মাত্র পাঁচ দিনের পারিশ্রমিকও দীপু-এহসানের মাসিক বেতনের চেয়ে বেশি। দৈনিকভিত্তিক চুক্তিতে আসা এই সাবেক বাঁহাতি স্পিনার দিনপ্রতি পেয়ে থাকেন ২৫০ ইউএস ডলার করে। ১ ইউএস ডলারের বিনিময়মূল্য ৮৫ টাকা ধরলে তাঁর প্রতিদিনের আয় ২১ হাজার ২৫০ টাকা।

যেটি জেলা পর্যায়ে বিসিবির নিয়োগ করা ৫৫ জন সহকারী কোচের একেকজনের পুরো মাসের বেতনের (১৮ হাজার ১৫০ টাকা) চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে হেড কোচ হিসেবে কর্মরত বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে কম আয় যাঁর, সেই অঞ্জু জৈনের পাঁচ দিনের রোজগারও সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া স্থানীয় দুজনের চেয়ে হাজার পনেরো বেশি। নারী জাতীয় দলের এই ভারতীয় কোচ দিনপ্রতি পান ২৭৫ ইউএস ডলার।

এ তো গেল সর্বনিম্ন পারিশ্রমিক পাওয়া বিদেশিদের সঙ্গে স্থানীয় কোচদের বেতনের ফারাক। দেশি ও বিদেশি কোচদের বেতনের যে হিসাব কালের কণ্ঠ’র হাতে এসেছে, তাতে ভিনদেশিদের পেছনে বিসিবির দেদার ব্যয়ের পাশাপাশি স্থানীয়দের সহজলভ্য মনে করার ব্যাপারটিও স্পষ্ট। দেশি কোচদের মধ্যে তা নিয়ে চাপা ক্ষোভ এবং অসন্তোষও আছে। জাতীয় পর্যায়ের দলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, এমন সম্ভাব্য কোচরা আবার দেশি-বিদেশির বেতনের সামঞ্জস্যহীনতার কারণে বিসিবির চাকরিকে আর আকর্ষণীয় বলেও মনে করছেন না। সে জন্য নিজ নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে বেতনবৈষম্য দূর করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে দুইবার বিপিএল জেতা কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।

পরেরজনের জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা দূর অতীত হলেও এখনো যেকোনো ক্রিকেটীয় সমস্যায় সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালদের মতো তারকার পাশাপাশি মমিনুল হকও নিয়মিতই শরণাপন্ন হন তাঁর। নিজের ব্যাটিংকে আরো শাণিত করতে মুশফিকুর রহিম যাঁর কাছে ছুটে যান, তিনিও বিদেশি নন। নাজমুল আবেদীন ফাহিমের পরামর্শে উপকৃত হওয়ার কথা নিত্য স্মরণও করেন। দেশি কোচের সাফল্য আছে নিচের পর্যায়েও।

২০১৮ সালে নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপে ষষ্ঠ হওয়া বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অস্ট্রেলিয়ান কোচ ডেমিয়েন রাইট দিনপ্রতি ৩০০ ইউএস ডলারে কাজ করে গেছেন। আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠেয় যুব বিশ্বকাপের পরের আসর সামনে রেখে গত জুলাইতে নিয়োগ পাওয়া হেড কোচ নাভিদ নেওয়াজের পারিশ্রমিকও অবিশ্বাস্য। অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হওয়া এই শ্রীলঙ্কান কোচের মাসিক বেতন ১০ হাজার ৪০০ ইউএস ডলার। অথচ দেশের মাটিতে বাংলাদেশকে ২০১৬ যুব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তোলা কোচ মিজানুর রহমানের মাসিক বেতন এখন বেড়ে হয়েছে ৯২ হাজার ৯৫০ টাকা।

জাতীয় দলের ব্যাটিং উপদেষ্টা নেইল ম্যাকেঞ্জির এক দিনের পারিশ্রমিকও (১ ইউএস ডলার = ৮৫ টাকা হিসাবে ৭২ হাজার ২৫০ টাকা) এর চেয়ে খুব কম নয়। দৈনিক ৮৫০ ডলার করে পেয়ে থাকেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। একই দেশ থেকে আসা ফিল্ডিং কোচ রায়ান কুক দিনপ্রতি পান ৫০০ ডলার। দৈনিক একই পারিশ্রমিকে আসা ফাস্ট বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের অঙ্ক কিছুটা বেড়েছে। ৫৩০ ডলার করে (৪৫ হাজার টাকা) পাচ্ছেন এখন। যাঁর দুই দিনের রোজগারও দেশের ক্রিকেটের দুই পরীক্ষিত কোচ ওয়াহিদুল গণি (৮৪ হাজার ৭০০ টাকা) এবং নুরুল আবেদীনের (৮৪ হাজার ১৮৬ টাকা) মাসিক বেতনের চেয়ে বেশি। এইচপির এই দুই কোচই শুধু ৮০ হাজারের বেশি পেয়ে থাকেন। ৭০ হাজারের বেশি বেতন একজনেরই। ৬০-৭০ হাজারের মধ্যে পান দুজন, ৫০-৬০ হাজারের মধ্যে বেতন দেওয়া হয় আরো সাতজনকে।

৯০ জন দেশি কোচের বেতন দিতে গিয়ে বিসিবির মাসিক ব্যয় প্রায় ২৭ লাখ টাকা (২৬ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩৬ টাকা)। আর  জাতীয় দলের হেড কোচ স্টিভ রোডস একাই পেয়ে থাকেন ১৮ লাখেরও বেশি। চন্দিকা হাতুরাসিংহের উত্তরসূরি হিসেবে আসা এই ইংলিশ কোচের মাসিক বেতন ২১ হাজার ৪২৯ ডলার। অন্যান্য বিদেশি কোচের মতো তাঁর বেতন থেকেও বাংলাদেশের নিয়মানুযায়ী ৩০ শতাংশ হারে উেস কর কাটা হয়। তা কেটে নেওয়ার পরও রোডসের অ্যাকাউন্টে জমা হয় ১৫ হাজার ডলার। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ২০১৯ বিশ্বকাপের পর এর সঙ্গে প্রতি মাসে যোগ হবে আরো এক হাজার ৬৬৭ ডলার। বিদেশিদের পেছনে বিসিবির খরচ অবশ্য শুধু বেতনেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশে তাদের থাকার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি যাতায়াতের জন্য ড্রাইভারসহ গাড়ির পেছনেও ব্যয় কম নয়। নিজের দায়িত্বের বাইরেও আন্তর্জাতিক যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন অঙ্কের বিমান ভাড়া পেয়ে থাকেন বিদেশি কোচরা। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রোডসের জন্য। চুক্তি অনুযায়ী যেকোনো রুটে পরিবারসহ ভ্রমণের জন্য বছরে তাঁকে সাড়ে ১২ হাজার ডলার দিচ্ছে বিসিবি। বিদেশি কোচদের পারিশ্রমিকের সঙ্গে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যোগ হয়ে যা দাঁড়ায়, তাতে দীপু-জাফরুলদের মাসিক বেতনকে খুব সামান্যই মনে হয়।

এ দুজনের প্রাপ্তি ছয় অঙ্ক ছুঁলেও!



মন্তব্য