kalerkantho


কুশল-কীর্তিতে শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য জয়

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



কুশল-কীর্তিতে শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য জয়

এক যুগেরও বেশি সময় আগে, শ্রীলঙ্কার পি সারাভানামুত্থু স্টেডিয়ামের বিকেলটাই যেন ফিরে এলো ডারবানে। শ্রীলঙ্কা সফরে আসা দক্ষিণ আফ্রিকা কলম্বো টেস্টটা হেরে গিয়েছিল মাত্র ১ উইকেটে। জয়ের খুব কাছে গিয়েও জিততে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা, ফারভিজ মাহরুফের অপরাজিত ২৯ রানের ইনিংসটা জিতিয়েছিল শ্রীলঙ্কাকে। কাল ডারবানে কুশল জেনিথ পেরেরার জন্য কাজটা ছিল আরো কঠিন। নবম উইকেটের যখন পতন ঘটল, জয় তখনো ৭৮ রান দূরে। অন্য প্রান্তে সঙ্গী বিশ্ব ফার্নান্ডো, ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামা এই বাঁহাতি পেসারের টেস্টে সর্বোচ্চ রান ৪! তাঁকে নিয়ে বিরুদ্ধ স্রোতে সাঁতরে, ডেল স্টেইন আর কাগিসো রাবাদাদের হাত থেকে ছুটে আসা আগুনের গোলা সামলে দলকে নিরাপদে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিলেন কুশল পেরেরা। অপরাজিত ১৫৩ রানের অসাধারণ একটি ইনিংস খেলে কুশল মনে করিয়ে দিলেন ২০ বছর আগে ব্রিজটাউনে আরেক বাঁহাতির অসাধারণ ব্যাটিং কীর্তিকে। সেদিন শেষ ব্যাটসম্যান কোর্টনি ওয়ালশকে নিয়ে অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছিলেন লারা, খেলেছিলেন ক্রিকেট রূপকথায় ঠাঁই করে নেওয়া অপরাজিত ১৫৩ রানের ইনিংস। কাল কুশলের নামের পাশেও অপরাজিত ১৫৩ এবং তিনিও বাঁহাতি!

এই টেস্টেই নেতৃত্ব পেয়েছেন দিমুথ করুনারত্নে, দীনেশ চান্ডিমালকে নিউজিল্যান্ড সফরের ব্যর্থতায় ছেঁটে ফেলে তাঁকেই করা হয়েছে অধিনায়ক। কুশল তাঁকে নেতৃত্বের অভিষেকেই উপহার দিলেন অসাধারণ এক জয়। ৩০৪ রানের জয়ের লক্ষ্যে ৩ উইকেটে ৮৩ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের শুরুটা করেছিল শ্রীলঙ্কা। কুশল পেরেরা অপরাজিত ছিলেন ১২ রানে, সঙ্গী ওশাদা ফার্নান্ডোর রান ২৮। সেই ফার্নান্ডো ২৮ থেকে ৩৭ রানে পৌঁছে বিদায় নিলেন, কুশল মেন্ডিস ও নিরোশান ডিকেলা বিদায় নিলেন শূন্য রানে। ১১০ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কা তখন ধুঁকছে। ধনঞ্জয় ডি সিলভার ৪৮ রানের অবদানে কুশলের ৯৬ রানের জুটিতে লড়াইয়ে ফেরে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু কেশব মহারাজের পর পর দুই বলে ধনঞ্জয় ও সুরঙ্গা লাকমলের বিদায়ে ফের ম্যাচের লাগাম প্রোটিয়াদের হাতে। এরপর এমবুুলডেনিয়া আর রাজিথাও বিদায় নিলে শ্রীলঙ্কার রান তখন ৯ উইকেটে ২২৬। একপ্রান্তে ৮৬ রানে থাকা পেরেরা, অন্যপ্রান্তে অনভিজ্ঞ ফার্নান্ডো। জয় তখনো ৭৮ রান দূরে। এখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ই তো অনিবার্য!

কিন্তু দলটা যে দক্ষিণ আফ্রিকা। ভাগ্যদেবীর সঙ্গে তাদের অদ্ভুত এক বৈরী সম্পর্ক। কখনো অদ্ভুত কোনো আইনের মারপ্যাঁচ, কখনো কারো অতিমানবীয় পারফরম্যান্স, কখনো বা হাস্যকর কোনো ভুল; কিভাবে যেন জয়ের চৌকাঠে আটকে দেয় প্রোটিয়াদের। আর অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় প্রতিপক্ষ। শতরান থেকে ১৪ রান দূরে থাকা কুশল তিন অঙ্কে পৌঁছালেন। এরপর একটু একটু করে আরো এগোলেন। ক্রমেই কমতে লাগল জয়ের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার দূরত্ব। ফাফ দু প্লেসিস নতুন বলও নিলেন। তবু প্রোটিয়া বোলাররা পারলেন না কুশল-ফার্নান্ডোর শেষ জুটিটা ভাঙতে। রাবাদার বলে থার্ডম্যান দিয়ে বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়েই জয়ের অনবদ্য মহাকাব্য লিখলেন কুশল পেরেরা। শ্রীলঙ্কার ড্রেসিংরুমে তখন অবিশ্বাস্য জয়ের বাঁধনহারা উল্লাস।

হেরে গেলেও টেস্ট ম্যাচের সুদিন ফেরানোর জন্য এমন রোমাঞ্চকর ম্যাচ দরকার, এটাই বললেন ফাফ দু প্লেসিস, ‘অসাধারণ একটা ম্যাচ। শেষ পর্যন্ত হেরে গেছি বলে খারাপ লাগছে, তবে সমর্থকরা এ রকম একটা ম্যাচই দেখতে চায়। পেরেরা পুরো সুপারম্যান।’ ম্যাচসেরার পুরস্কার নিতে আসা পেরেরা অবশ্য মানবীয় গুণেরই পরিচয় দিলেন, ‘আমি খুব ক্লান্ত। জানি না কী বলব। শেষের দিকের ব্যাটসম্যানরা খুব সমর্থন দিয়ে গেছে। আমি আমার কাজটা করেছি, এই জয়টা আসলেই খুব স্পেশাল।’

এই নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে মোট ১৩টি টেস্টের হারজিতের নিষ্পত্তি হয়েছে ১ উইকেটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঁচবার ১ উইকেটে হেরেছে অস্ট্রেলিয়া আর এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ১ উইকেটে হারল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথমটি সেই ১৯২৩ সালে, আর পরের যে দুইবার ১ উইকেটে হেরেছে প্রোটিয়ারা, দুটোরই সাক্ষী হাশিম আমলা ও ডেল স্টেইন। ক্রিকইনফো



মন্তব্য