kalerkantho


নিয়মিত মতিনের পায়ে নিয়মিত গোল

সনৎ বাবলা   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



নিয়মিত মতিনের পায়ে নিয়মিত গোল

তিনি যেন হঠাৎ মণি-মুক্তা হাতে পেয়েছেন। ‘মতিন দুর্দান্ত খেলেছে। এই প্রথম তাকে শুরুর একাদশে খেলিয়েছি এবং ম্যাচের চেহারা বদলে দিয়েছে সে। বল পায়ে তার গতি ভীতি ছড়ায় প্রতিপক্ষে’— নীলফামারীতে আবাহনীকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে মতিনে আপ্লুত হয়েছিলেন অস্কার ব্রুজোন। বসুন্ধরা কিংসের স্প্যানিশ কোচের চোখে প্রতিপক্ষের বড় আতঙ্ক এই দেশি ফরোয়ার্ড।

লিগে আবাহনীর সঙ্গে ছিল তাদের দ্বিতীয় ম্যাচ। অতীতের ঘটন-অঘটনে কিংস-আবাহনীর এই লড়াই হয়ে উঠেছিল ভীষণ আকর্ষণীয়। সেই ম্যাচই বদলে দিয়েছে মতিন মিয়ার ফুটবল মৌসুমটা। বদলি থেকে ঢুকেছেন নিয়মিত একাদশে। আর সুযোগ পেয়েই এই দেশি ফরোয়ার্ড জ্বলে উঠেছেন অসম্ভব সম্ভাবনা নিয়ে। তাঁর তেড়েফুঁড়ে খেলা বারবার আবাহনীর রক্ষণকে আতঙ্কিত করে ম্যাচ শেষের প্রাপ্তি এক গোল। ‘ওই ম্যাচে আমার হ্যাটট্রিক করা উচিত ছিল। সুযোগ নষ্ট করেছি আমি। তার পরও ওই একটি গোলই বোধহয় আমার পরের ম্যাচগুলো নিশ্চিত করে দিয়েছে’—লিগের কঠিনতম ম্যাচটি সহজে পার দিয়েই ২০ বছর বয়সী এই তরুণ পেয়েছেন পরের ম্যাচগুলোর গ্যারান্টি। নিয়মিত একাদশে থাকার নিশ্চয়তা। পরের দুই ম্যাচেও করেছেন একটি করে গোল। প্রথম ম্যাচে বদলি খেলে গোলহীন এই তরুণ পরের তিন ম্যাচে করেছেন তিন গোল। অথচ তারায় তারায় খচিত এই দল। সবচেয়ে বড় তারকা বিশ্বকাপার ড্যানিয়েল কলিনড্রেসের আছে দুই গোল আর ‘নাম্বার নাইন’ মার্কোস ভিনিসিয়াসের মাত্র এক গোল। সুতরাং লিগের চার ম্যাচ শেষে বসুন্ধরা কিংসের বড় ভরসার নাম মতিন মিয়া। কদিন আগেও যিনি ছিলেন নিয়মিত বদলি!

দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর যোবায়ের নিপুও স্বীকার করেন, ‘শুরুতে তাকে বদলি খেলাতাম আমরা। দ্বিতীয়ার্ধে নামলে তার গতি খুব কাজে লাগে। এরপর আমরা চিন্তা করলাম তাকে শুরু থেকে খেলানোর। সেটা যে ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে, তিন ম্যাচেই সে প্রমাণ করেছে। উইথ দ্য বল ও ড্রিবলিংয়ে সে খুব ভালো।’ ৪-৩-৩ ফরমেশনে এই দেশি ফরোয়ার্ড খেলেন ডান দিকে। বাঁ-দিকের উইংয়ে কলিনড্রেস আর সামনে ভিনিসিয়াস। তাঁদের পজিশন মেনে খেলতে হলেও মতিনের বেলায় সেই শর্ত নেই। মাঠের সব জয়গায় খেলার স্বাধীনতা তাঁকে দিয়ে রেখেছেন কোচ! ‘আসলে মতিনকে পজিশন বেঁধে খেলানো যায় না। তাকে দিয়ে ওয়ান টাচে খেলা ও ওয়াল পাস খেলা সম্ভব নয়। তাকে খেলাতে হবে তার মতো করে। সেটা বুঝেই কোচ তাকে পুরো মাঠজুড়ে খেলার স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাতেই সে দারুণ খেলছে। গোলও পাচ্ছে’—বলেছেন যোবায়ের নিপু।

মানে মতিন যেভাবে চাইবেন, সেভাবে খেলবেন। এটা তিনিও দারুণ উপভোগ করছেন, সহজ-সরলভাবেই তিনি বলেন, ‘আমি আমার মতো খেলি। কোনো বাঁধা-ধরা নিয়ম নেই আমার বেলায়। বল নিয়ে ড্রিবল করে সামনে এগোতেই ভালো লাগে। তখন আমার গতিও বেড়ে যায়, গোলের সুযোগও তৈরি হয়।’ বল পায়ে সব সময় তিনি ভয়ংকর। করতে চান নতুন কিছু। এই করতে গিয়ে গত মৌসুমে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে করেছেন দুর্দান্ত এক গোল। তখন ছিলেন সাইফ স্পোর্টিংয়ে, নিজেদের অর্ধে বল ধরে এক এক করে ছয়জনকে পরাস্ত করে বল পৌঁছে দেন মুক্তিযোদ্ধার  জালে। এ রকম বল প্লেয়ার কিন্তু দেশের ফুটবলে এখন খুব একটা দেখা যায় না। দুর্ভাগ্য হলো, সেই মৌসুমে ২১ ম্যাচে নিয়মিত একাদশে থেকে করেছেন মাত্র তিন গোল। ‘সাইফে খেলতাম মাঝমাঠে, ওখানে ঠিক সাপোর্ট দেওয়ার মতো খেলোয়াড় ছিল না। এই দলে ঠিক উল্টো, সবাই বল তৈরি করে দেয়, গোলে সাহায্য করে। আমার চাওয়া হলো প্রত্যেক ম্যাচে একটি করে গোল করা। গোলদাতার তালিকায় ওপরের দিকে থাকতে চাই আমি’—নতুন দলে বদলি থেকে নিয়মিত হয়ে তাঁর স্বপ্নটাও হয়ে গেছে বড়। সে রকম হলে জেমি ডেও দারুণ খুশি হবেন। জাতীয় দলে যে গোলের লোকের বড় অভাব। তাই বাংলাদেশ দলের সামগ্রিক ভালো খেলাটা গোলে ফুটে ওঠে না। তাঁর পায়ে গোলের ঘনঘটা জারি থাকলে আসন্ন কম্বোডিয়ার ম্যাচেও একসময়ের সিলেটি ‘খেপ’ খেলোয়াড় ঢুকে যেতে পারেন জাতীয় দলের নিয়মিত একাদশে। বাংলাদেশ দলে এখনো যে তিনি বদলি ফুটবলার।

খুব শিগগিরই যে তাঁর নিয়মিত একাদশের দুয়ার খুলে যাবে, সেটা তিনি ভালোভাবে বুঝতে পারছেন। ঢাকায় আসার পর আরেকটি জিনিস বুঝতে পারছেন। সেটা নতুন নতুন জীবনবোধও, ‘খেপের চেয়ে ঢাকা লিগের মান অনেক উন্নত। এখানে এসে জীবনটাও বদলে গেছে। এখন জাতীয় দলে খেলছি। অনেক নাম হয়েছে। সবাই এখন আমাকে চেনে। এভাবে খেলেই জীবনটা সাজাতে চাই আমি।’ মতিন সাজবেন নতুন করে, সাজাবেন ফুটবলকে।



মন্তব্য