kalerkantho


যেখানে বাংলাদেশ

খাবারের চাহিদাটুকুও পূরণ হয় না কুস্তিতে

২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



খাবারের চাহিদাটুকুও পূরণ হয় না কুস্তিতে

৩৬ বছর পর এশিয়ান গেমসে পদকহীন বাংলাদেশ। এত দিন মেয়েদের কাবাডি মুখরক্ষা করে চললেও এবার হতাশ করেছে তারাও। এশিয়ান গেমস কাভার করার পর দেশি-বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গে কথা বলে এর কারণ ও ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার উপায় বের করার চেষ্টা করেছেন রাহেনুর ইসলাম। আজ তৃতীয় কিস্তিতে থাকছে কুস্তি

উশু থেকে কুস্তিতে নাম লিখিয়ে তাহলে ভুল করেননি শিরিন সুলতানা? খেলা বদলানোর পর ২০১৬ এসএ গেমসে জিতেছেন রুপা। পরের বছর আজারবাইজানের বাকুতে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ব্রোঞ্জ। ২০১৮ গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসেও পেতে পারতেন ব্রোঞ্জ। নিয়ম অনুযায়ী সেমিফাইনালের দুই বিজিত পান এই পদক। কিন্তু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আটজনের কম হওয়ায় খেলতে হয় ব্রোঞ্জ নিষ্পত্তি ম্যাচ, সেখানে পেরে ওঠেননি ভারতের দিব্যা কাকরানের কাছে। খুব কাছে গিয়েও দুর্ভাগ্যে ব্রোঞ্জ হাতছাড়া হয়েছে শিরিনের। ২০১৮ জাকার্তা এশিয়ান গেমসে তাই শিরিনের ওপর ছিল বাড়তি আলো।

আশার বেলুন ফুটো মাত্র ১৮ সেকেন্ডে। জাপানের আয়ানা গেম্পেইয়ের কাছে হেরেছেন ০-১০ ব্যবধানে। চীনের ফেং ঝোর কাছেও উড়ে যান ০-৫ পয়েন্টে। ১২ প্রতিযোগীর মধ্যে তাঁর অবস্থান ১২তম। কমনওয়েলথ গেমসে যাঁর কাছে হেরেছিলেন ভারতের সেই দিব্যা কাকরান জেতেন ব্রোঞ্জ। পদক গলায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে দিব্যা বলছিলেন, ‘বাবা লেঙ্গট (কুস্তির এক ধরনের পোশাক) বিক্রি করে খুব কষ্টে মানুষ করেছেন আমাকে। এই পদকটা তাঁর জন্য।’ আর শিরিন ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছিলেন ফেডারেশনের কর্তাদের, ‘এত বড় একটা গেমসের আগে দেড় মাসের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করলে কিভাবে হবে। বছরজুড়ে অনুশীলন করতে না পারলে সাফল্য আসবে না।’ শুধু কুস্তি নয়, বাংলাদেশের বেশির ভাগ খেলার অবস্থাই এমন করুণ।

পাশের দেশ ভারতে আবার উল্টো ছবি। ক্রিকেটের আইপিএলের আদলে ছোট প্রায় সব খেলাতেই পেশাদার টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে তারা। কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে ‘প্রো কুস্তি লিগ’। বলিউডে সিনেমা হচ্ছে কুস্তি নিয়ে। জাকার্তা এশিয়ান গেমসে দিব্যাকেও ম্লান করে মেয়েদের ৫০ কেজি ওজন শ্রেণিতে সোনা জিতেছিলেন ভিনেশ ফোগাট। এশিয়ান গেমসের মতো মর্যাদার আসরে কোনো ভারতীয় নারীর প্রথম সোনা এটিই। ভারতীয় মেয়েদের কুস্তি দলের কোচ ছিলেন কুলদীপ সিং। জাকার্তায় তাঁর দুই শিষ্যের একজনকে সোনা আরেকজনকে ব্রোঞ্জ জিততে দেখে ভীষণ খুশি। তিনি খেলা দেখেছেন শিরিনেরও। বাংলাদেশের কুস্তি নিয়ে কুলদীপের পরামর্শ, ‘স্পিড, স্ট্যামিনা, স্ট্রেংথ—এই তিনটি জিনিসের সঙ্গে টেকনিকে ভালো করতে পারলেই পদক আসবে। শিরিনের খেলায় এসবের অভাব আছে। রাতারাতি এগুলো হবেও না। আন্তরিকতার সঙ্গে টানা অনুশীলন করতে হবে।’

একটা সময় নাসের-ভুলুদের কুস্তি দেখকে উপচে পড়ত দর্শক। আবদুল জলিল পেয়েছিলেন টাইগার উপাধি। এখন কুস্তির সেই সুদিন নেই। এমনকি কুস্তির নেই নিজস্ব কোনো স্টেডিয়াম বা ভেন্যু। খেলাটা শক্তির, দরকার পর্যাপ্ত খাবার। ন্যূনতম সেই চাহিদাটুকুও পূরণ হয় না খেলোয়াড়দের। তাহলে কি পেছাতে পেছাতে একটা সময় হারিয়ে যাবে কুস্তি? বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তারকা কুস্তিগীর বিল্লাল হোসেন তা-ই মনে করেন। তিনি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে টানা ১১ বারের চ্যাম্পিয়ন। গত ১০ জানুয়ারি পল্টন শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ৩৪তম জাতীয় কুস্তিতেও ৯৭ কেজি ওজন শ্রেণিতে চ্যাম্পিয়ন বিল্লাল। জাতীয় কুস্তিতে কখনো না হারা ৪০ বছর বয়সী এই খেলায়াড়ও হতাশ কুস্তি নিয়ে, ‘খেলোয়াড়দের ন্যূনতম চাহিদা ভালো খাবার। সেটাও পাই না আমরা। কুস্তি হয়ে পড়েছে আবার সার্ভিসেস নির্ভর। নিয়মিত ডিউটি শেষে এরপর আসে অনুশীলনের সুযোগ। অথচ গেমস শুরুর আগে কর্তারা পদকের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। আমি তিনবার এসএ গেমসের সেমিফাইনালে হেরেছি, উন্নত প্রশিক্ষণের অভাবেই পারিনি। আমি খেলা শুরু করার সময় বাংলাদেশ ছিল ভারত ও পাকিস্তানের পর। এখন শ্রীলঙ্কার চেয়েও পিছিয়ে পড়েছি। এভাবে চললে খেলাটাই হারিয়ে যাবে একসময়।’ হতাশা লুকাচ্ছেন না ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে কুস্তির সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে থাকা তাবিউর রহমান পালোয়ানও—‘আর্থিক সমস্যাই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ। টাকার অভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ করাতে পারি না আমরা। এ জন্যই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল নেই।’

এত কিছুর পরও শিলং-গুয়াহাটি এসএ গেমসে বাংলাদেশ কুস্তি দল পদক জেতে ১০টি, এর তিনটি রুপা ও ৭টি ব্রোঞ্জ। সেই দলের কয়েকজনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে শুধুই শিরিন সুলতানাকে পাঠানোর। ২০১৬ সালের পর ঘরোয়া আসরে অংশ নেন না তিনি। এ নিয়ে ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক মেসবাহ উদ্দিন আজাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে শিরিনের সমমানের কেউ নেই বাংলাদেশে। তবে সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান পালোয়ান শাসিয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, এখন থেকে ঘরোয়া টুর্নামেন্টে অংশ না নিলে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলা হবে না শিরিনের। ভালো ফলের জন্য একচোখা নীতি থেকেও বেরিয়ে আসাটা জরুরি।

শেষ করা যাক কুস্তিতে বিশ্বসেরা ইরানের উদাহরণ টেনে। জাকার্তা এশিয়ান গেমসে ছেলেদের ফ্রিস্টাইলে তিনটি আর গ্রিকো-রোমানে ইরান পেয়েছে দুটি সোনা। ১২৫ কেজি ওজন শ্রেণিতে সোনা জেতা পারভিজ হাদি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বলছিলেন, ‘কুস্তি ইরানের জাতীয় খেলা, এ নিয়ে উন্মাদনা দেশজুড়ে। ইরানে রেসলিং একাডেমি আছে অসংখ্য। অন্যরা শুরু করে ১৮ বছর বয়সে, সেখানে ইরানিরা এই বয়সে খেলে বিশ্বকাপ। শুরুটা হয় সাত-আট বছর বয়সে এবং স্কুল থেকে। প্রচুর স্পন্সর। এ জন্যই এগিয়ে আমরা।’ বাংলাদেশের কুস্তির জন্য অলীক কল্পনাই এগুলো!



মন্তব্য