kalerkantho


যেখানে বাংলাদেশ

ঐতিহ্য ফেরানোর দায় কাবাডির

২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ঐতিহ্য ফেরানোর দায় কাবাডির

৩৬ বছর পর এশিয়ান গেমসে পদকহীন বাংলাদেশ। এত দিন মেয়েদের কাবাডি মুখরক্ষা করে চললেও এবার হতাশ করেছে তারাও। এশিয়ান গেমস কাভার করার পর দেশি-বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গে কথা বলে এর কারণ ও ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার উপায় বের করার চেষ্টা করেছেন রাহেনুর ইসলাম। আজ থাকছে কাবাডি

চায়নিজ তাইপের স্কুলগুলোর জনপ্রিয় খেলা ‘ইগল ক্যাচিং চিকেন’। পাঁচ মিনিটের এই খেলায় ‘ইগল’ থাকে একজন। সে চেষ্টা করে প্রতিপক্ষ দলের ‘চিকেন’ হওয়া ছাত্রদের কোনো একজনকে ছুঁয়ে নিজের প্রান্তে আসতে। সফল হলে ইগল হয়ে যাবে ‘চিকেন’। নিয়মে অনেক পার্থক্য থাকলেও স্কুলের মজার এই খেলার সঙ্গে কিছুটা মিল আছে কাবাডির। তাতেই কাবাডি খেলতে রাজি হয়ে যায় চায়নিজ তাইপে।

শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান এমনকি পিছিয়ে থাকা থাইল্যান্ডও তাদের নিয়ে ছেলেখেলাই খেলত। জাকার্তা এশিয়ান গেমসে নিজেদের গ্রুপে চায়নিজ তাইপে থাকায় এই একটি ম্যাচ সহজ জয়ের প্রত্যাশায় ছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। কিন্তু বিধিবাম। কয়েক বছর আগে কাবাডি শুরু করা চায়নিজ তাইপে প্রথম ম্যাচে শাহনাজ পারভিন মালেকার দলকে হারিয়ে দেয় ৪৩-২৮ পয়েন্টে। তাঁদের শক্তি, সামর্থ্য আর কৌশলে রীতিমতো অসহায় বাংলাদেশি মেয়েরা। শেষ পর্যন্ত সবাইকে চমকে চায়নিজ তাইপে জেতে ব্রোঞ্জ। আর বাংলাদেশ ২৮ বছর পর কাবাডি ইভেন্টে পদকহীন! এমন সাফল্যের রহস্য জানাতে চায়নিজ তাইপের অধিনায়ক লিন আই মিন জানাচ্ছিলেন, ‘ইগল ক্যাচিং চিকেন খেলাটা সাহায্য করেছে আমাদের দেশে কাবাডির প্রসারে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাবাডি খেলা হয় নিয়মিত। আমাদের দলের মেয়েদের প্রায় সবাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়। বাংলাদেশকে দেখে খারাপ লাগছে। ওদের সঙ্গে জিতে যাব ভাবতেই পারিনি।’

গত দুই আসরে কাবাডির ব্রোঞ্জ জেতা বাংলাদেশের মেয়েরা জাকার্তা থেকে ফেরে খালি হাতে। আর ছেলেদের দল তো স্বপ্নই দেখেনি পদকের। নিজেদের গ্রুপের শক্তিশালী দুই দল ভারতের সঙ্গে ৫০-২১ আর দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বিধ্বস্ত ৩৮-১৮ পয়েন্ট। দুর্বল শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডকে হারালেও বিদায় গ্রুপ পর্ব থেকে। এর অন্যতম কারণ ২০১৬ এসএ গেমসের পর থেকে কাবাডির কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ না খেলা। আড়াই বছরের বেশি সময় না খেলে যে মরচে পড়েছে, সেটা ভালোভাবে বোঝা গেছে জাকার্তায়। লাল-সবুজদের পারফরম্যান্স দেখে হতাশ ভারতীয় কাবাডি ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর প্রসাদ রাও, ‘তোমাদের খেলোয়াড়দের গড় বয়স অনেক বেশি। ফিটনেসেও পিছিয়ে। পুরনো নিয়মে আটকে আছে বাংলাদেশ। এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় কাবাডি থেকে হারিয়ে যেতে হবে। অথচ বাংলাদেশেই শুরু কাবাডির।’

বাংলাদেশের কাবাডি যে পেছনেই পড়ে আছে এর ছোট্ট একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভিয়েতনামে পঞ্চম এশিয়ান বিচ কাবাডির জন্য ট্রায়াল ছাড়া পছন্দের ছয় খেলোয়াড়ের নাম জমা দিয়েছিল ফেডারেশন! নাম ছিল মহিলা দলের ম্যানেজার আবদুল কাইয়ুম শিকদারের স্ত্রী শাহিন আরার। মাসুরা পারভিন সে বছর শেষ হওয়া অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল দলে দুর্দান্ত খেললেও কর্তারা নাম দেন কাবাডিতে। কোচের অনুমতি ছাড়া নিশি যেতেন সাইক্লিং খেলতে আর উশুতে জেমি ও তাসমি। জিয়াউর রহমান দলকে অনুশীলন করালেও কোচ হিসেবে নাম জমা দেওয়া হয়েছিল ভারতের বনানী সাহার। সেই বনানী ভারত সরকারের অনাপত্তিপত্রই পাননি। এমন হ-য-ব-র-ল দল নিয়ে কতটা কী আশা করা যায়?

এর মাঝেও আশার আলো এ কে এম শহীদুল হকের কাবাডির সভাপতি হয়ে আসা। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রায় তিন বছর পর কোর্টে গড়ায় প্রিমিয়ার কাবাডি লিগ। তিনি কিছুদিন আগে আর্তি জানিয়েছিলেন সরকারি সাহায্যের, ‘আমরা সরকারি অর্থ সেভাবে পাই না। বেসরকারি সাহায্যে সব টুর্নামেন্ট করেছি। অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার। সেন্ট্রাল জিম, অফিস এগুলো বেসরকারি টাকায় করা কঠিন।’

বিদেশি কোচ নিয়োগসহ সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন আবার বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। সব মিলিয়ে কাবাডি ফিরছে ঠিকপথে। তবে সাফল্য পেতে নতুন পরিকল্পনার দরকার। জাকার্তায় এ নিয়ে কথা হয় ইরানের মেয়েদের দলের ভারতীয় কোচ শৈলজা জৈনের সঙ্গে। তাঁর হাত ধরে এবার মেয়েদের কাবাডিতে সোনা জিতেছে ইরান। সোনা জিতেছে ছেলেদের ইভেন্টেও। অথচ দোহা এশিয়ান গেমস ঘিরে দেশটিতে ২০০৬ সালে গঠিত হয় কাবাডি ফেডারেশন। এত দ্রুত ইরানের উঠে আসা আর বাংলাদেশের পিছিয়ে যাওয়া নিয়ে শৈলজার অভিব্যক্তি, ‘ইরানের জনপ্রিয় খেলা কুস্তি। তেল মালিশ করা শরীরে গ্রিপ করতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে ওরা। সেই খেলোয়াড়দের আনা হয়েছে কাবাডিতে। শক্তিতে উপমহাদেশের চেয়ে এগিয়ে ওরা। আমি এই শক্তির সঙ্গে শুধু কাবাডির টেকনিক শিখিয়েছি। তাতেই সাফল্য এসেছে এবার। বাংলাদেশেরও উচিত বিদেশি কোচ নিয়োগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া। আর ভারতের মতো প্রো-কাবাডি লিগ চালু করা। এতে নতুন প্রতিভা আসছে আর বিদেশিদের সঙ্গে নিয়মিত খেলে পরিণত হচ্ছে ওরা।’

এমন পরামর্শ ভালোই জানা কাবাডি ফেডারেশনের। হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে তাদের আন্তরিক হওয়াটাই বেশি প্রয়োজন এখন।



মন্তব্য