kalerkantho


‘থ্যাংক ইউ স্যার’

শাহজাহান কবির   

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



‘থ্যাংক ইউ স্যার’

দৈনিক কালের কণ্ঠ’র দশম জন্মদিনে সম্মাননাপ্রাপ্ত ক্রিকেট কোচ ওয়াহিদুল গনি এবং কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিশোরী ফুটবলারদের কোচ মফিজ উদ্দিন।

মফিজ উদ্দিন তখন মঞ্চে, তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। কল্পনার চোখ মেলে দেখি মফিজ উদ্দিন একা নন, তাঁকে ঘিরে মারিয়া, মার্জিয়া, তহুরা, শামসুন্নাহার এমন শত শত হাসিমুখ। কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই কিশোরীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে টেনে এনে দেশসেরা হওয়ার মন্ত্র পড়িয়ে দিয়েছিলেন এই শিক্ষক, ফুটবল পায়ে তারাই এখন নারীজীবনের নতুন গল্প লিখছে।

আরেকজন ওয়াহিদুল গনি। দৈনিক কালের কণ্ঠ দশম জন্মদিনে দেশবরেণ্য শিক্ষকদের সম্মাননা জানাতে গিয়ে এ রকম প্রথা ভেঙেই সম্মানিত করেছে এই ক্রিকেট কোচকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে মোহাম্মদ আশরাফুল, শাহরিয়ার নাফীসদের মতো তারকাকে উপহার দেওয়া এই কোচ এখনো প্রতি ভোরে সবুজ ঘাসে মেতে ওঠেন কচি প্রতিভাগুলোকে নিয়ে। সম্মাননা পেয়েছেন এদিন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, জামিলুর রেজা চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সন্জীদা খাতুন, হাসান আজিজুল হক, রফিকুল ইসলামের মতো কালোত্তীর্ণ শিক্ষকরা। তাঁদের মাঝেও মফিজ উদ্দিন, ওয়াহিদুল গনিরা ছিলেন আপন ঐশ্বর্যে ভাস্বর। একজন কোচ শেষ পর্যন্ত শিক্ষক, ওয়াহিদুল গনিও যেমন বলছিলেন, ‘যাদের শেখাই তাদের কজনই বা বড় খেলোয়াড় হয়। কিন্তু তারা বড় মানুষ যেন হয়, এই চেষ্টা আমার সব সময় থাকে। খেলার মধ্য দিয়ে যে সততা, শৃঙ্খলা, মহত্ত্বের শিক্ষা আমি দিতে পারি, সেটাও আমার কাছে অনেক বড়।’ আর মফিজ উদ্দিন এমন এক আয়োজনে নিজেকে আবিষ্কার করতে পেরে মুগ্ধ, ‘কলসিন্দুরের মেয়েদের শিক্ষক হিসেবে অনেক জায়গায় অনেক সম্মাননা আমি পেয়েছি। কিন্তু এই যে এত এত দেশবরেণ্য শিক্ষকের মাঝে আমাকে মূল্যায়ন করা হলো, এর চেয়ে বড় আনন্দ আমার আর কিছু নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত আমি একজন শিক্ষক।’

সম্মাননা অনুষ্ঠানে কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন যেমন বলছিলেন, ‘আমি এই শিক্ষকদের মানুষ গড়ার কারিগর বলি না, বলি শিল্পী। কারিগর একটা কিছু তৈরি করতে পারেন, কিন্তু তাতে প্রাণ দেন শিল্লী।’ মফিজ উদ্দিন তেমনি যেন প্রাণ দিয়েছেন বাল্যবিবাহ, বৈষম্য, নিপীড়ন, পশ্চাৎপদতায় ঘিরে থাকা কলসিন্দুরের মেয়েদের। যাদের ফুটবল খেলা নিয়ে একসময় সমাজ কটু কথা বলত, তারাই এখন হাততালি পাচ্ছে। মেয়েদের সম্ভাবনার অপার দিগন্ত দেখিয়ে সারা দেশে এখন তারা উদাহরণ। মফিজ উদ্দিন পারতেন শ্রেণিকক্ষে তাদের আটকে রাখতে, তা তিনি করেননি। তিনি তহুরা, মারিয়াদের দেখেছেন তাদেরও সম্ভাবনা জগেজাড়া, ‘এই মেয়েদের অনেকের খেলার ইচ্ছা থাকলেও লজ্জায় বলতে পারত না। আমাকে তাদের অভয় দিতে হয়েছে, উৎসাহ দিতে হয়েছে। মাঠে নেমে এরপর কিন্তু তারা দেখিয়েছে তাদের ভেতরে লুকানো কত প্রতিভা!’

ওয়াহিদুল গনি বলেন, কোচ খেলোয়াড় তৈরি করেন না, বরং খেলোয়াড়রাই কোচকে তৈরি করেন। আশরাফুল, শাহরিয়ার নাফীসদের মতো খেলোয়াড়ের কারণেই তিনি জননন্দিত। তেমনি তহুরা-মার্জিয়ারাই অচেনা মফিজ উদ্দিনকে পরিচিতি দিয়েছে। এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য শিক্ষকের ত্যাগও। সততার শিক্ষা, আলোকিত মানুষ হওয়ার দীক্ষা—তাঁরা ছাড়া আর কারা দিতে পারেন, সেখানেই তাঁরা সবার ওপরে।

কালের কণ্ঠ এর আগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীগুলোতে মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও শহীদ জননীদের সম্মানিত করেছে। শিক্ষকরা জায়গা পেলেন তাঁদেরই পাশে, এও বিরল সম্মান। ওয়াহিদুল গনি বলেছেন তাঁর মতো কোচকেও এই শিক্ষকদের পাশে মূল্যায়ন করাটাও যুগান্তকারী ভাবনা, ‘অনেকেই এখনো শিক্ষকের পাশে কোচকে মূল্যায়ন করেন না। কিন্তু আমরাও শিক্ষক, ছোট ছোট বাচ্চাদের খেলা শেখানোর পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধও শেখাই আমরা। কালের কণ্ঠ’র এই স্বীকৃতি আমার দৃষ্টিতে তাই অনেক বড় ব্যাপার। এতে করে কোচরা নিজেদের কাজে আরো বেশি আস্থা পাবেন, অনুপ্রেরণাও তৈরি হবে।’

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কাল সারা দিন কালের কণ্ঠ কার্যালয় মুখর ছিল বিভিন্ন পর্যায়ের সফল ব্যক্তিদের আনাগোনায়। সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ছিলেন মধ্যমণি। ওয়াহিদুল গনির মতো মফিজ উদ্দিনও এমন উদ্যোগে আবেগাক্রান্ত হয়ে শুভ কামনা জানিয়ে গেছেন পত্রিকাটিকে, ‘ক্রীড়াঙ্গনের খবরাখবরের জন্য কালের কণ্ঠ পত্রিকাটির মুগ্ধ পাঠক আমি। আজকের এ আয়োজনে সেই মুগ্ধতা আরো বাড়ল।’ ফুটবল অঙ্গনে আলোড়ন তোলা বসুন্ধরা কিংসের খেলোয়াড়, কর্মকর্তারাও কাল শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন কালের কণ্ঠকে। কিংস সভাপতি ইমরুল হাসান, বিশ্বকাপে খেলা ডেনিয়েল কলিনড্রেসদের উপস্থিতি আরো বর্ণিল করে তোলে আয়োজনটাকে। এসেছিলেন সাবেক তারকা ফুটবলার আব্দুল গাফফার আর সাবেক ক্রিকেটার আতহার আলী খানও।

 



মন্তব্য