kalerkantho


সাফল্যের মধ্যেও অপ্রাপ্তির আর্তনাদ

নোমান মোহাম্মদ, সিলেট থেকে   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সাফল্যের মধ্যেও অপ্রাপ্তির আর্তনাদ

জয়ের হাসি : মিরাজ ৪ উইকেট না নিলে হয়তো অতটা কম রানে আটকে রাখা যেত না ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। আবার সৌম্য যদি ৮০ রানের ইনিংসটা না খেলতেন, তাহলে জয়টা আসত না এত সহজে। সিরিজ জয়ের পর হোটেলে ফুরফুরে মেজাজে একসঙ্গে পাওয়া গেল তাঁদের। ৮১ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে জয় নিশ্চিত করে মাঠছাড়া তামিমও ক্যামেরাবন্দি হলেন হাসিমুখেই! ছবি : মীর ফরিদ

ফরম্যাট যখন ওয়ানডে, বাংলাদেশের ক্রিকেট ওড়ে তখন তারার দেশে। তারায় তারায় লেখা হয় লাল-সবুজের বিজয়কাব্য। এই যেমন এ বছরই ২০ ওয়ানডে খেলে জেতে ১৩টিতে। তিনটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলে সব কয়টিতে। সিলেটের প্রাকৃতিক নিসর্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জয় নিয়ে তাই বাড়তি উচ্ছ্বাসের কী আছে!

তবে সেই তারার দেশে বাংলাদেশের আছে ছোট্ট দুটো মেঘের বাড়িও। জানুয়ারিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলঙ্কা এবং এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারতের কাছে হার। এত অর্জনের ভিড়েও এই দুটো বিসর্জনের সুর বড্ড বেসুরো হয়ে বাজে বাংলাদেশের ক্রিকেট হৃদয়ে। ইস, একটি ট্রফি যে জেতা হলো না আজও।

তবু তো ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ, ক্যারিবিয়ানদের হারিয়ে আসে অ্যাওয়ে সিরিজে। পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কাকে টপকে উঠে যায় এশিয়া কাপের ফাইনালে। আর বছরের শেষ প্রান্তে ঘরের মাঠের দুই সিরিজে হারায় জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের ফুলে ফুলে গাঁথা মালাতেই তো এসব কীর্তি! এসব অর্জন।

রানের হিসাবে ওয়ানডেতে এ বছর বাংলাদেশের সফলতম ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। ১৯ ম্যাচে করেন ৭৭০ রান। গড় ৫৫। স্ট্রাইক রেট ৮২.৩৫। একমাত্র সেঞ্চুরি এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই ১৪৪। এ ছাড়া তাঁর ব্যাট থেকে আসে আরো পাঁচটি হাফসেঞ্চুরি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঢাকায়, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গায়ানার প্রভিডেন্সে, পাকিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে এবং ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে সদ্যঃসমাপ্ত সিরিজে ঢাকার প্রথম দুই ম্যাচে। এর মধ্যে এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে তো সেঞ্চুরি মিস করেন মাত্র এক রানের জন্য।

রানে মুশফিকের চেয়ে পিছিয়ে; কিন্তু ব্যাটসম্যানশিপে এ বছর সবার আগে রাখতে হবে তামিম ইকবালকে। ইনজুরির কারণে আট ম্যাচ না খেলেও যে তাঁর রান ৬৮৪ রান। ১২ ওয়ানডেতে এই ওপেনারের গড় অবিশ্বাস্য ৮৫.৫০। স্ট্রাইক রেট উল্টো পিঠে কম অবিশ্বাস্য নয়—৭৬.৩৩। কেননা, সেটি যে এ বছর মুশফিক, সাকিব, ইমরুল, সৌম্য, লিটন—সবার চেয়ে কম। প্রায় মাহমুদ উল্লাহ ও মোহাম্মদ মিঠুনের কাছাকাছি। নিজের ব্যাটিংয়ের ওই অহেতুক আগ্রাসনের অংশটুকু ছেঁটে ফেলে তামিম এখন বিস্ময়কর রকম ধারাবাহিক। এ বছরের ১২ ওয়ানডেতে তাঁর স্কোরগুলো দেখুন—৮৪*, ৮৪, ৭৬, ৫, ৩, ১৩০*, ৫৪, ১০৩, ২*, ১২, ৫০ ও ৮১*। বছরের শুরুতে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের প্রথম তিন ম্যাচেই তাঁর ফিফটি। শেষ দুই ম্যাচে ভালো করতে পারেননি অবশ্য। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজে প্রত্যাবর্তন রাজার বেশে। সেঞ্চুরি, ফিফটি, সেঞ্চুরিতে। এরপর এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচের অপরাজিত ২ রানের ব্যাটিংটা এ হিসাবে না আনাই ভালো। ইনজুরির কারণে মাঠ থেকে বেরিয়ে যান, পরে নেমে যে এক হাতে ব্যাটিং করে মুশফিককে সঙ্গ দেন, সেটিই হয়ে যায় ক্রিকেট রূপকথার বীরত্বগাথা। সেই ইনজুরি থেকে ফিরতে ফিরতে ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজ। সেখানেও শেষ দুই ম্যাচে তাঁর ফিফটি। ২০১৮ সালের এমন ঝলমলে পারফরম্যান্সে তামিমের একটাই অতৃপ্তি থাকতে পারে, ছয় ফিফটির বিপরীতে দুই সেঞ্চুরির রেকর্ড। খুব সহজেই তো আরো দু-তিনটি সেঞ্চুরি হয়ে যেতে পারত এই বাঁহাতির।

সাকিব তো সেঞ্চুরিই পাননি এ বছর। তাই বলে ব্যাট হাতে বছরটা খারাপ কাটেনি মোটেও। ১৫ ম্যাচের ১৩ ইনিংসে ব্যাটিং করে পাঁচ ফিফটিতে করেন ৪৯৭ রান। গড় ৩৮.২৩। স্ট্রাইক রেট ৮৩.৯৫। ইমরুলর কায়েসের ৪৩৬ রান মাত্র আট ম্যাচে। এর মধ্যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজেই তো ১৪৪, ৯০ ও ১১৫ রানের তিনটি স্কোর। ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে বছরের শেষটা ভালো কাটেনি। তবে ৬২.২৮ গড় এবং ৯০.৪৫ স্ট্রাইক রেটের ইমরুলকে অবহেলার উপায় নেই। পঞ্চম সর্বোচ্চ ৪১৯ রান মাহমুদ উল্লাহর। ২০ ওয়ানডের ১৬ ইনিংসে এ রান করেন তিনি ৩২.২৩ গড় এবং ৭৫.৩৫ স্ট্রাইক রেটে। এ বছর ৫০ ওভারের ফরম্যাটে তাঁর ফিফটি তিনটি।

লিটন দাশ, সৌম্য সরকার, মোহাম্মদ মিঠুনরাও এ বছর পায়ের নিচে শক্ত মাটি খুঁজে পেয়েছেন। ১২ ম্যাচে লিটনের রান ৩৪০। যার মধ্যে এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ১২১ রানের সেই অবিশ্বাস্য ইনিংসও রয়েছে। ওই সেঞ্চুরির বাইরে তাঁর অন্য ৫০ পেরোনো ইনিংসটি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ২৮.৩৩ গড় এবং ৮৩.৭৪ স্ট্রাইক রেটে ওপেনিংয়ে তামিমের সঙ্গী হওয়ার দৌড়ে আপাতত এগিয়ে লিটন। সৌম্যর দাপটও প্রবল প্রতাপে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেতে হুট করে সুযোগ পেয়েই তাঁর সেঞ্চুরি; ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেতে তিনে নেমে ৮০ রানের আরেকটি রাজসিক ইনিংস। মাত্র ছয় ওয়ানডেতে ৪২.৫০ গড় এবং ১০৪.৫০ স্ট্রাইক রেটে ২৫৫ রান তাঁর। আর ১১ ওয়ানডের ১০ ইনিংসে মিঠুনের রান ২১৫। ২৬.৮৭ গড় এবং ৭৫.৯৭ স্ট্রাইক রেটের চেয়ে বড় ব্যাপার, মিডল অর্ডারে বেশ কয়েকটি ম্যাচে নির্ভরতা দিয়েছে তাঁর ব্যাট। বিশ্বকাপের সমীকরণে তাই প্রবলভাবেই উপস্থিত তিনি। এ ছাড়া এশিয়া কাপ ফাইনালে ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ ১২০ রানের ওপেনিং জুটিতে দায়িত্ব পালন করেন দারুণভাবে। সুযোগের সদ্ব্যবহারে মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনও করেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ফিফটি। এনামুল হক, সাব্বির রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন, নাজমুল হোসেন, ফজলে মাহমুদরা ব্যর্থ হলেও বছর শেষের সালতামামিতে দলীয় ব্যাটিং পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের খুশিই হওয়ার কথা।

মূল বোলারদেরও সবাই ছন্দে। ১৮ ম্যাচে ২৯ উইকেট নিয়ে সফলতম মুস্তাফিজুর রহমান। ২০ ওয়ানডেতে ২৬ শিকার মাশরাফি বিন মর্তুজার, সমান ১৫টি করে ম্যাচে রুবেল হোসেন, সাকিব এবং মিরাজের উইকেট যথাক্রমে ২৩, ২১ ও ১৮। মূল এ পাঁচ বোলারের প্রত্যেকে এই বছর একটি করে ম্যাচে পান ৪ উইকেট; একের বেশি খেলায় একজনও না। মিরাজের (৩.৯৯) ইকোনমি চারের নিচে, রুবেলের (৫.০১) পাঁচের সামান্য ওপরে। বাকি তিনজনের চার থেকে পাঁচের মধ্যে। ওয়ানডে ক্রিকেট বিবেচনায় দুর্দান্তই বলতে হবে। সবাই মিলে নেকড়ের পালের মতো প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সাক্ষ্য দেয় পরিসংখ্যান। একটু দুশ্চিন্তার জায়গা তাঁদের বিকল্প বোলারদের জ্বলে না ওঠা। একমাত্র জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে সাইফ উদ্দিনই যা একটু ভালো বোলিং করেন।

তবু ওই আক্ষেপ। একই হাহাকার। অভিন্ন আর্তনাদ। এ বছরও কোনো ট্রফি যে জিততে পারেনি বাংলাদেশ! তারার দেশে উড়তে উড়তেও ফাইনাল হারের ছোট্ট দুটো মেঘবাড়ি আর্দ্র করে দেয় বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। কিংবা কে জানে, বড় কোনো অর্জনের প্রস্তুতি পর্ব বলেই বিসর্জনের এত শ্রম-ঘাম-কান্না! হয়তো ২০১৯ বিশ্বকাপেই...।



মন্তব্য