kalerkantho


আনিসুরের কীর্তিতে সেমিতে কিংস

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আনিসুরের কীর্তিতে সেমিতে কিংস

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ফুটবল ১১ জনের খেলা বটে। তবে কখনো কখনো এটা হয়ে যায় একজনের খেলা। তার পায়েই ফুটবলটা খোলে, মেলে এবং গোলে পরিণতি পায়। ৫৭ মিনিটে সেই স্পেশাল খেলোয়াড়টি নামার পরই কেমন রং বদলে গেল বসুন্ধরা কিংসের। ১১ জনের এতক্ষণের অর্থহীন উপস্থিতি হয়ে গেল অর্থপূর্ণ! সেই ‘স্পেশাল’ ড্যানিয়েল কলিনড্রেসের উজ্জীবনে কিংস কোনো রকমে ২-২ গোলের সমতায় পার করে নির্ধারিত ৯০ মিনিট। এরপর স্নায়ুরোধী টাইব্রেকারে ‘ছোট্ট গোলরক্ষক’ আনিসুরের অবিশ্বাস্য উচ্চতায় আরোহণে বসুন্ধরা কিংস পৌঁছে যায় স্বাধীনতা কাপের সেমিফাইনালে। টাইব্রেকারে তিন বিদেশির শট ঠেকিয়ে ৩-২ গোলে এই গোলরক্ষক ছিটকে দিয়েছেন রহমতগঞ্জকে। তাঁর কীর্তির সুবাদেই কিংসের আনন্দ-অবগাহন। তাই কিংসের স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোনও মহানন্দে বলে গেছেন হিরোর কথা, ‘এটা খুব কঠিন ম্যাচ ছিল আর এই ম্যাচের হিরো জিকো (আনিসুর রহমান)। শ্যুট আউটের আগে তার সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছিল। সবাই মিলে তাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছি। দারুণ কিপিং করেছে সে।’

শেষ মুহূর্তে এসে নায়কের আসন নিয়েছেন আনিসুর রহমান। ৫ শটের ৩টি ঠেকিয়ে দেবেন তিনি, সেটা কেউ ভাবতেও পারেনি! ‘এর আগে কিন্তু ঢাকা মাঠে কোনো পেনাল্টি সেভ করার অভিজ্ঞতাও ছিল না। তবে কিংসে আমি নিয়মিত পেনাল্টি সেভের প্র্যাকটিস করেছি। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল আজ (কাল)’—বলেছেন ম্যাচ জেতানো ২১ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। ২০১৫ সাল থেকে এই গোলরক্ষক খেলছেন প্রিমিয়ার লিগে। এত দিনের সাদামাটা ক্যারিয়ার হঠাৎ হয়ে গেল আলো ঝলমলে, ‘নিজের মতো করে আমি চেষ্টা করেছি, হয়ে গেছে। এটা অবশ্যই আমার ক্যারিয়ারের স্মরণীয় এক ম্যাচ।’ তিনি ঠেকিয়েছেন জুনাপিও, চিগোজি ও মানডের শট। রহমতগঞ্জের হয়ে গোল করেছেন ফয়সাল ও দিদার। কিংসের গোলদাতা বখতিয়ার, নাসির উদ্দিন ও কলিনড্রেস। মিস করেছেন ইমন বাবু ও মাশুক মিয়া।

টাইব্রেকারের হিরো আনিসুর হলে তাঁর আগের উদ্ধারকর্তা ড্যানিয়েল কলিনড্রেস। দক্ষ মাঝির ডুবুডুবু অবস্থা হয়েছিল কিংসের নৌকার। এ কোস্টারিকান মাঠে নামার আগে তাদের খেলাটাই ছিল অর্থহীন। কী খেলছে, কেন খেলছে—পরিষ্কার ছিল না কিছুই। পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফেরার জন্য মারিয়া হয়েছে, সেটা হাবেভাবে আছে, খেলায় নেই। আসলে নিয়মিত একাদশের সাতজনের অনুপস্থিতিতে পুরো দিশাহারা এক দল। রক্ষণে নাসির উদ্দিনকে বাদ দিলে বাকি তিনজনই বেঞ্চের। শুরু থেকে সেই রক্ষণ বড় নড়বড়ে এবং ২৫ মিনিটে কাউন্টারে গোল খেয়ে তা বুঝিয়েও দিয়েছে। এনামুলের বাড়ানো বলে জামাল কিংসের জালে বল ঠেলে এগিয়ে নেন রহমতগঞ্জকে। এই গোল আর শোধ করতে পারে না কিংস। প্রথমার্ধ শেষ, নাসিরের এক হেড ছাড়া তেমন কিছু নেই। পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। সুতরাং আলামত ভালো নয়, বিরতির পরও সেই অর্থহীন ফুটবল। তাই ৫৭ মিনিটে নামতেই হলো ইনজ্যুরড ড্যানিয়েল কলিনড্রেসকে। ‘জাতীয় দলের চার খেলোয়াড় এবং তিন বিদেশিকে নিয়ে ম্যাচ শুরু করতে পারিনি আমরা। সাতজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতির পরও আমরা জিতেছি। কলিনড্রেস চোট নিয়ে নিজের ইচ্ছাতেই নেমেছে। সে-ই সব করে দিয়েছে, সে স্পেশাল ফুটবলার’—বলেই মাথা নেড়ে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন কিংস কোচ অস্কার।

অ্যানির বদলি হয়ে নামার পরের মিনিটেই কোস্টারিকান বিশ্বকাপার দুর্দান্ত এক ফ্রি কিক মারেন। সেটা রহমতগঞ্জের পোস্টে বাতাস লাগিয়ে গিয়ে যেন বুঝিয়ে দিল বিপদ সমাগত। আর কিংসকে দিলেন আশা। মিনিট দশেক বাদেই তাঁর পায়ে বহুপ্রত্যাশিত গোল! ৬৭ মিনিটে নাঈমের বাড়ানো বলটি বক্সের ভেতর বাঁ কোনা থেকে তিনি ডান পায়ে দূরের পোস্টে পাঠিয়ে ম্যাচে ফেরান দলকে। ফিরলে কী হবে, পিছিয়ে দেওয়ার জন্য ওই রক্ষণই যে যথেষ্ট। ৭১ মিনিটে কঙ্গোর ফরোয়ার্ড সিও জুনাপিওর বাড়ানো বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে মাটিতে লুটোপুটি খান দিদারুল। ফয়সাল ফাঁকা বক্সের ডান দিক দিয়ে ঢুকে চমৎকার ফিনিশ করেন গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে। তাতে হার এবং ছিটকে পড়ার ভয় পিছু নেয় কিংসের। কলিনড্রেসের দু-দুটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় পোস্টে লেগে। তাতে ভয় আরো বাড়ে। খেলা গড়ায় ইনজুরি টাইমে, ৫ মিনিট পার করে দিলেই কিংসের বিদায়। কিন্তু শেষ মিনিটে আবার কলিনড্রেসের পায়ের জাদুকরী, ক্রসটি এত নিখুঁত ফেলেছেন, যা কিরগিজস্তানের বখতিয়ারের মাথা ঘুরে পোস্টে লেগে রহমতগঞ্জের জালে পৌঁছে যায়। ২-২ গোলের সমতায় ম্যাচ চলে যায় অতিরিক্ত সময়ে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে বসুন্ধরা কিংস।

অতিরিক্ত ৩০ মিনিট নিষ্ফলা হওয়ার পর টাইব্রেকারে আনিসুরের কীর্তিতে বসুন্ধরা কিংসের সেমিফাইনালে আরোহণ। আগামী ২০ ডিসেম্বর তারা মুখোমুখি হবে ঢাকা আবাহনীর।



মন্তব্য