kalerkantho


চার ওপেনার খেলিয়েও ‘তিন’ সংকট!

নোমান মোহাম্মদ   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চার ওপেনার খেলিয়েও ‘তিন’ সংকট!

মাত্র কয়েক দিন আগেও রান ছিল তাঁর পোষা বিড়াল। ব্যাটের কাছে আলগোছে পড়ে থাকত আদুরে ভঙ্গিতে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ১৪৪, ৯০ ও ১১৫ রানের স্কোর কি সে কথাই বলছে না?

সে রানই এখন তাঁর জন্য সোনার হরিণ। ধরা দিচ্ছে না কিছুতেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ওয়ানডেতে চার ও শূন্য রান সে বার্তাই দিচ্ছে।

ক্রিকেটকে তো আর শুধু শুধু জীবনের মিনিয়েচার বলা হয় না! আজ যে রাজা, কাল তার ফকির হতে কতক্ষণ! এই মুহূর্তে ইমরুল কায়েসের চেয়ে বেশি তা কে বুঝছেন!

বাঁহাতি এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান নিজেকে দুর্ভাগা ভাবতে পারেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে খেলেন ওপেনার হিসেবে; কিন্তু তামিম ইকবালের প্রত্যাবর্তনে তিনে নেমে যেতে হয় ইমরুলকে। তাতেই রানফোয়ারা থেকে রানখরা। পাশাপাশি তামিম-লিটন-ইমরুল-সৌম্য, এই চার ‘ওপেনার’কে নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের যে চিন্তার দৈন্য, সেটিও স্পষ্ট। চার ওপেনারকে একাদশে খেলানোর বৈপ্লবিক চিন্তা যে এবারই প্রথম, তা নয়। ২০১১ বিশ্বকাপেও তামিম-ইমরুল-জুনায়েদ সিদ্দিকী-শাহরিয়ার নাফীসকে নামিয়ে দেওয়া হয় ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম চার পজিশনে। মাঝে সাত বছর চলে গেছে, এক বিশ্বকাপ পেরিয়ে আরেক বিশ্বকাপ ঠকঠক কড়া নাড়ছে দুয়ারে, বদলেছে টিম ম্যানেজমেন্টও। কিন্তু গোলমেলে ভাবনার জগৎ থেকে তাঁরা বেরোতে পারছেন কই!

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের জন্য থিম সং ছিল চার স্পিনার। ওয়ানডে সিরিজে চার ওপেনার। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এই ভয় থেকে প্রথম দুই ম্যাচের একাদশে চারজনকেই রেখে দেয় স্বাাগতিকরা। যদিও ২০১৯ বিশ্বকাপ পরিকল্পনার প্রতিফলন তাতে নেই। ওই বিশ্ব আসরে তামিম-লিটনকে ওপেনার হিসেবে দেখছে টিম ম্যানেজমেন্ট, ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষেও তাই। আর তিন নম্বরে এখন প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছেন সৌম্য। তবে আগের সিরিজে ৩৪৯ রান করা ইমরুলকে তিনেরও পেছনে পাঠানো হলে জনরোষের আশঙ্কা। তাতেই সৌম্যকে খেলতে হয় ছয়-সাত নম্বরে।

এসবের তালগোলে তিন নম্বরে সাকিবের কথা কিভাবে যে ভুলে গেল টিম ম্যানেজমেন্ট, তা বিস্ময় ছড়াতে বাধ্য!

চার ওপেনার নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে প্রতি সংবাদ সম্মেলনে। প্রথম ওয়ানডে জেতার পর ম্যাচসেরা অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা আরেকবার মুখোমুখি সে প্রশ্নের। সে ম্যাচের ওপেনার তামিম-লিটন, তিনে ইমরুল, ছয়ে সৌম্য—বিশ্বকাপ পরিকল্পনাও কি এভাবে সাজানো? অধিনায়কের জবাব, ‘সৌম্যর জন্য আদর্শ ওপেনিং বা তিন নম্বর। আবার নিচেও খেলতে পারে। আর ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম তিনে এই চারজনের তিনজনকে খেলানোর সম্ভাবনাই বেশি। যেহেতু এই মুহূর্তে বাইরে ওই রকম কেউ নেই। আর বেশির ভাগ ম্যাচই এরা খেলে আসছে।’ তাই কি? অধিনায়কের কথার সমর্থন কিন্তু পরিসংখ্যানে নেই। তিন নম্বরে সাকিবের সাম্প্রতিক সাফল্যের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন মাশরাফি!

ওয়ানডেতে তিন নম্বর পজিশনটি বাংলাদেশকে ভোগাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। শেষ তিন বছর দেখুন না। ২০১৬ সালে খেলা ৯ ওয়ানডেতে তিন নম্বর পজিশনের ব্যাটসম্যানদের ব্যাট থেকে আসে মোটে একটি ফিফটি; আফগানিস্তানের বিপক্ষে ঢাকায় সাব্বির রহমানের ৬৫। ২০১৭ সালে ১৪ ওয়ানডেতে সংখ্যাটি বেড়ে হয় দুই। শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ফিফটি দুটিও এখন নিষিদ্ধ থাকা এই ব্যাটসম্যানের। এ বছরের শুরুতে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে তাই সাকিবকে তুলে আনা তিন নম্বরে। তিন নম্বরে ব্যাটিংটা তাঁর নিজেরও পছন্দের। কতটা? আগের দুই বছর ২৩ ওয়ানডেতে তিন নম্বর পজিশনের ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে যেখানে আসে সাকুল্যে তিন ফিফটি, সেখানে এ বছর সাকিবের ১০ ইনিংসেই চার ফিফটি!

ত্রিদেশীয় সিরিজের চার ম্যাচেই বাঁহাতির স্কোর ৩৭, ৬৭, ৫১ ও ৮। ইনজুরির কারণে ফাইনাল খেলতে পারেননি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে প্রত্যাবর্তন। সেখানে তিন ম্যাচে সাকিবের স্কোর ৯৭, ৫৬ ও ৩৭। এশিয়া কাপ ততটা ভালো যায়নি। সেখানে ০, ৩২ ও ১৭ রানের স্কোর সত্ত্বেও এ বছর তিন নম্বরে খেলা ১০ ইনিংসে সাকিবের রান ৪০২; গড় ৪০.২০।

আর শুধু সাকিবের নিজের রান কেন, এই ম্যাচগুলোয় তামিমের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় উইকেট জুটিও বিবেচনায় নিন না! তাহলে তিন নম্বর পজিশন থেকে ওই বাঁহাতিকে সরানোর বিস্ময় বাড়বে বৈকি! ২০১৮ সালে তিন নম্বরে খেলা সাকিবের ১০ ইনিংসের মধ্যে শেষ দুটিতে তামিম ছিলেন না। বাকি ৮ ম্যাচে এ জুটির রান দেখুন—৭৮, ৯৯, ১০৬, ১০, ২০৭, ৯৭, ৮১ এবং ০। আট ইনিংসের মধ্যে একবার জুটির রানের সেতু পেরোয় ২০০, একবার ১০০, নব্বইয়ের ঘরে দুইবার, আশির ঘরে একবার, সত্তরের ঘরে একবার। জুটিতে মোট রান ৬৭৮; গড় ৮৪.৭৫।

দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে বাংলাদেশের জার্সিতে সবচেয়ে বেশি রান শাহরিয়ার নাফীস ও আফতাব আহমেদের। তাঁদের ৮৪৩ রান এসেছে ২২ ইনিংসে। দ্বিতীয়তে তামিম ও মোহাম্মদ আশরাফুলের ৭২৪ রানের জন্য লাগে ২৪ ইনিংস। সেখানে তৃতীয়তে থাকা তামিম-সাকিবের ৬৭৮ রানের জন্য মাত্র আট ইনিংস। বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে অন্তত আট ইনিংসে জুটি বেঁধেছে, এমন জুটির পঞ্চাশের ওপর গড় মাত্র সাতটি। এর কোনোটিই তামিম-সাকিবের দ্বিতীয় উইকেট জুটির ৮৪.৭৫-এর ধারেকাছে না।

চার ওপেনারের ফর্মে থাকার জনজোয়ারে এ সব কিছুই খেলো হয়ে গেল বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে!

ইনজুরির কারণে ত্রিদেশীয় সিরিজ ফাইনালে ব্যাটিং করতে পারেননি সাকিব। সেদিন তিনে নেমে সাব্বির করেন ২ রান। এশিয়া কাপের শেষ তিন ম্যাচে ওই পজিশনে মিঠুন (১), মমিনুল (৫), ইমরুল (২) বিবর্ণ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচে ফজলে মাহমুদ তো রানের খাতাই খুলতে পারেননি। তৃতীয় ম্যাচে একাদশে ঢুকে সৌম্য ১১৭ রান করতেই সব কিছু তাহলে পাল্টে যায় কিভাবে! নিশ্চয়ই এর আগ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ভাবনায় তিনে সৌম্য ছিলেন না। থাকলে এশিয়া কাপ ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম স্কোয়াডে কেন তিনি থাকেন না!

চার ওপেনারের এই গোলমেলে তত্ত্বে তাই বড্ড অন্যায় ইমরুলের প্রতি। সৌম্যর প্রতি। মিডল অর্ডারে দারুণ কিছু ইনিংস খেলেও একাদশ থেকে বাদ পড়া মিঠুনের প্রতি। এবং অতি অবশ্যই সাকিবের প্রতি।

আর টিম ম্যানেজমেন্টের সবচেয়ে বেশি অবিচার বোধ করি নিজেদের প্রাজ্ঞতার প্রতিই।



মন্তব্য