kalerkantho


জয়ে রাঙাল না পঞ্চপাণ্ডবের দিনটা

নোমান মোহাম্মদ   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জয়ে রাঙাল না পঞ্চপাণ্ডবের দিনটা

ছবি : মীর ফরিদ

এমন এক ম্যাচেই কিনা কাল হেরে গেল বাংলাদেশ!

ম্যাচটি সেঞ্চুরির। অন্য রকম শতরানের। মাশরাফি বিন মর্তুজা, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল এবং মাহমুদ উল্লাহর একত্রে খেলা ১০০তম ম্যাচ। তাতে কাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে গেলেও কত কত বিজয়গাথা লেখা হয়েছে এ পাঁচজনের ব্যাট-বলে! শুধু শুধুই তো আদুরে নাম ‘পঞ্চপাণ্ডব’ হয়নি!

মহাভারতের ওই পাণ্ডবপুত্রদের প্রতিবিম্ব যেন বাংলাদেশের পাঁচ ক্রিকেটবীরে। ভীমের বুনোশক্তি তামিমের ব্যাটিংয়ে, অজুর্নের অব্যর্থ নিশানা মেনে চলে সাকিবের ব্যাট-বল, মাহমুদের ব্যাটে নকুলের সৌন্দর্য, সহদেবের প্রাজ্ঞতা মুশফিকে আর যুধিষ্ঠিরের সততা এবং অভিভাবকত্বে পুরো দলকে এক সুতায় বেঁধে রাখেন মাশরাফি। কালও তো বাংলাদেশের তিন ফিফটিই তিন পাণ্ডবের—সাকিবের ৬৫, মুশফিকের ৬২ এবং তামিমের ৫০। চতুর্থ সর্বোচ্চ ৩০ রানও আরেক পাণ্ডব মাহমুদের ব্যাটে। পঞ্চমজন মাশরাফি বোলিংয়ে ততটা উজ্জ্বল ছিলেন না। তবু ১০ ওভারে ৫২ রান দিয়ে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক রোভম্যান পাওয়েলের উইকেট তো পান ঠিকই। তবু এ পঞ্চক জেতাতে পারেন না দলকে। তাঁদের অন্য রকম সেঞ্চুরির ম্যাচে সতীর্থরাও জয় উপহার দিতে ব্যর্থ।

তবে কাল না পারলেও একসঙ্গে পথচলায় গর্বিত হতেই পারেন এ পঞ্চপাণ্ডব। তাঁরা একসঙ্গে ওয়ানডে খেলেছেন ৭০টি, টি-টোয়েন্টি ২৯টি এবং টেস্ট একটি। একমাত্র টেস্ট ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, যেখানে এই ফরম্যাটে অভিষেক হয় মাহমুদ উল্লাহর। ইনজুরির কারণে ম্যাচের মাঝপথে ছিটকে পড়া মাশরাফির সেটিই হয়ে থাকে শেষ টেস্ট। ফলে ওই একমাত্র টেস্টে জয় পেলেও পাঁচজনে একসঙ্গে আর পাঁচ দিনের ক্রিকেট খেলা হয় না। একত্রে খেলা ২৯ টি-টোয়েন্টির মধ্যে বাংলাদেশ জেতে ১২ ম্যাচে, হার ১৬টিতে, এক খেলায় কোনো ফল হয়নি। আর ৭০ ওয়ানডেতে অমন ‘নো রেজাল্ট’ তিনটিতে। ৩৪ জয়ের বিপরীতে কাল হারল ৩৩তম ম্যাচে।

ওয়ানডেতে জয়-হারে প্রায় সমতার যে পরিসংখ্যান, এই সত্যের ভেতরও সত্য আছে। খ্রিস্টপূর্ব-খ্রিস্টাব্দের মতো মাশরাফির এ দফা অধিনায়ক হওয়ার আগের ও পরের ফলগুলোয়। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ দিয়েই তো নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন তাঁর। এর আগের পঞ্চপাণ্ডবের খেলা ২৫ ওয়ানডের মধ্যে মাত্র সাতটিতে জেতে বাংলাদেশ। হার ১৭ ম্যাচে, একটি নো রেজাল্ট। মাশরাফি এবার অধিনায়ক হওয়ার পর তাঁদের পাঁচজনের খেলা ৪৫ ওয়ানডের পরিসংখ্যান কতই না ভিন্ন! সেখানে ১৬ হারের বিপরীতে ২৭ জয়। ফল হয়নি বাকি দুই ম্যাচের।

এ সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পথচলায় অভিজ্ঞতায় তাঁরা শাণিত হয়ে ওঠেন সত্যি। সঙ্গে মাশরাফির অধিনায়কত্বের পরশপাথর যোগ হওয়ায় পারফরম্যান্স ছোটে আরবি ঘোড়ার মতো। বাংলাদেশের ম্যাচের ফলও পাল্টে যেতে থাকে ক্রমশ। দেখুন না, ২০১৬ সালের শুরু থেকে ধরলে গত তিন বছরে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ম্যাচ জেতে ১৯টি। এর মধ্যে ১৫ বারই তো ম্যান অব দ্য ম্যাচ পঞ্চপাণ্ডবের কোনো পাণ্ডব। বাংলাদেশের জয়ে এই পঞ্চকের প্রভাব কতটা, পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।

১৫ ম্যান অব দ্য ম্যাচের ক্রমটাও কী সুন্দর—মাহমুদ একবার, মাশরাফি দুইবার, মুশফিক তিনবার, সাকিব চারবার এবং তামিম পাঁচবার। তামিমের পাঁচে এ বছর তিনবার; ত্রিদেশীয় সিরিজে একবার এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজে দুইবার। আগের দুই বছরেও একটি করে খেলায় ম্যান অব দ্য ম্যাচ তিনি। ওই দুই বছরে সাকিবও তাই; সঙ্গে এ বছরের ত্রিদেশীয় সিরিজের দুটি মিলিয়ে মোট চারটি ম্যাচসেরার ট্রফি আলো ছড়াচ্ছে তাঁর শোকেসে। মুশফিকের তিনে এ বছরের এশিয়া কাপের দুইবারের সঙ্গে ২০১৭ সালের একটি। মাশরাফি ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলতি সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে আরেকবার। আর মাহমুদের একমাত্র ম্যান অব দ্য ম্যাচ এ বছর এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে।

এই তিন বছরে পঞ্চপাণ্ডবের বাইরে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ম্যাচসেরা চারজন। গেল বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মুস্তাফুিজুর রহমান এবং কিছুদিন আগে শেষ হওয়া জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের তিন ম্যাচে ইমরুল কায়েস, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন এবং সৌম্য সরকার। সর্বশেষ সিরিজটি যে পঞ্চপাণ্ডবের দুজন সাকিব-তামিম ছিলেন না, তা নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দিতে হবে না।

পঞ্চপাণ্ডব শুধু মহাভারতে না, রয়েছে বাংলা সাহিত্যেও। ত্রিশের দশকে রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে গিয়ে বাংলায় আধুনিক কবিতা তৈরি করা পাঁচ কবির সে উপাধি— অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁদের কবিতার চরণেও না কিভাবে প্রতিস্থাপিত করা যায় বাংলাদেশ ক্রিকেটের পাঁচ মহারথীকে! ‘তুমি থেকে থেকে উত্তাল হয়ে ছোটো/কখনো জোয়ারে আকণ্ঠ বেয়ে ওঠো’—বিষ্ণু দের এই কবিতায় তামিমের ডাকাবুকো ব্যাটিং কি খুঁজে পাওয়া যায় না? কিংবা বুদ্ধদেব বসুর ‘কী নির্মল নীল এই আকাশ/কী অসহ্য সুন্দর’-এ সাকিবের ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং? সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যে লিখেছিলেন, ‘বসন্তদিনের সনে করিব কি তোমার তুলনা?/তুমি আরও কমনীয়, আরও স্নিগ্ধ, নম্র, সুকুমার’— সেটি তো সহজেই মুশফিকের ব্যাটিংয়ের উপমা হতে পারে। আবার ‘তুমি যেন বলো, আর আমি যেন শুনি/ প্রহরে প্রহরে যায় কল্পজাল বুনি’—অমিয় চক্রবর্তীর এই লাইনগুলো তো মাহমুদের ব্যাটের কথামালায় মুগ্ধ শ্রোতা-দর্শকের অভিব্যক্তিই। আর মাশরাফি? সেই যে জীবনানন্দ দাশের সেই বিখ্যাত লাইন, ‘সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়।’ বাকি সব তারাদের সঙ্গে ‘কথা বলে’, সবার সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের ক্রিকেটাকাশ উজ্জ্বল করে রেখেছেন তো অধিনায়কই।

মহাভারত আর বাংলা সাহিত্যের পঞ্চপাণ্ডবের মতো বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চপাণ্ডবও তাই অমরত্বের দাবিদার।



মন্তব্য