kalerkantho


তাঁর নেতৃত্বেই স্বপ্নের বাংলাদেশ

নোমান মোহাম্মদ   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তাঁর নেতৃত্বেই স্বপ্নের বাংলাদেশ

সেবার আবহাওয়ায় শীতের আমেজ। আবহে বাংলাদেশ ক্রিকেটের শীতনিদ্রা না ভাঙার হাপিত্যেশ।

এবারও শীতের আমেজ রয়েছে ঠিক। তবে আবহে হাপিত্যেশের জায়গা নিয়েছে আশার গান। যে গানের সুরে সুরে অত্যাশ্চর্য অর্জনের স্বপ্নে বিভোর ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণ।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে চার বছর আগ-পরের চিত্রে কী আশ্চর্য বৈপরীত্য!

২০১৪ সালে এমন শীত শীত সময়ে কী ভীষণ হন্যে হয়েই না একটি জয় খুঁজছিল বাংলাদেশ! ২০১৮ সালে সে জয় আর সোনার হরিণ না, যেন পোষা হরিণ। এখন বাংলাদেশ অধিনায়ককে তাই দ্বিপক্ষীয় সিরিজ শুরুর আগে ‘বাংলাওয়াশ’-এর সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে হয়। তিন ম্যাচের টক্করে দ্বিতীয় ম্যাচেই সিরিজ জয়ের আলোচনায় অংশ নিতে হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলতি দ্বৈরথও ব্যতিক্রম না। পরশু প্রথম ওয়ানডে জেতার পর আজ দ্বিতীয় ম্যাচে সিরিজ জয়ের নিশ্চয়তা চায় স্বাগতিকরা। বিশ্বকাপের স্বপ্নঘুড়িটি যে তাহলে আরেকটু ওপরে উড়িয়ে দেওয়া যাবে!

চার বছর আগেও এ সময়টা আবর্তিত হচ্ছিল বিশ্বকাপ ঘিরে। তবে স্বপ্ন না, আতঙ্ক নিয়ে। বছরজুড়ে ভীষণ বিবর্ণ পারফরম্যান্সের কারণে। এবার সেই পারফরম্যান্সই বদলে দেয় সব সমীকরণ। চার বছর আগের তুলনায় এখন যে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে, সে ঘোষণায় দ্বিধাহীন মাশরাফি বিন মর্তুজা। কারণ হিসেবে ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতাকেই বড় করে দেখেন অধিনায়ক, ‘অবশ্যই এবার আমরা ভালো অবস্থানে। কারণ যাদের তরুণ খেলোয়াড় বলছি, ওরাও তো দুই-তিন-চার বছর খেলে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সৌম্যর প্রায় চার বছর হতে চলল। ইমরুল খেলছে লম্বা সময় ধরে। লিটনেরও তিন বছর হয়ে গেছে। পেস বোলারদের মধ্যে শুধু সাইফ উদ্দিন ছাড়া সবাই বেশ অভিজ্ঞ। তুলনায় ২০১৫ বিশ্বকাপের আগের সময়টায় অনেকেই ছিল নতুন।’ ২০১৯ বিশ্বকাপে তাই সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্নও অলীক মনে হয় না। মাশরাফি অবশ্য তেমন আগাম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না, ‘আগের বিশ্বকাপের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি অর্থ এই না যে, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে খেলে ফেলব। তবে অভিজ্ঞতায় এগিয়ে থাকার কারণে অবশ্যই এবার আমাদের অবস্থান ভালো।’

বিশ্বকাপের আগের সময়টার বর্ণনা মাশরাফির চেয়ে ভালোভাবে আর কে দিতে পারেন! বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওই বাঁকবদলের মহানায়ক তো তিনিই। ২০১৪ সালটি ছিল ভয়াল গ্রহণকালের। অন্ধকারের থাবায় পথ হারানোর দশা বাংলাদেশ ক্রিকেটের। কোথাও আলোর রেখা নেই; কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয়ের খোঁজ নেই। বছরের প্রথম ১৩টি ওয়ানডে ম্যাচের মধ্যে একটিতেও জেতে না দল। হারে শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এমনকি সে সময়ের ‘পুঁচকে’ আফগানিস্তানের কাছেও। এর খেসারতে মুশফিকুর রহিমকে সরিয়ে দেওয়া হয় ওয়ানডে অধিনায়কত্ব থেকে। নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন মাশরাফির। চকমকি পাথরের ঘষায় দলের ভেতরের আগুন যেন জ্বেলে দেন তিনি। নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে আবার জয়ের সঙ্গে মিতালি তাই বাংলাদেশের। ধারাবাহিকতায় ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণের তুমুল সাফল্য। পাকিস্তান-ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো তিন প্রবল পরাশক্তির সঙ্গে সিরিজ জয়।

চার বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই ওয়ানডে সিরিজটি নভেম্বরে শুরু হয়নি। বর্ষশেষ সিরিজের আগের অবস্থায়ও কী পার্থক্য! এ বছর খেলা ১৮ ওয়ানডেতে ১২ জয় বাংলাদেশের। শ্রীলঙ্কা-জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল খেলেছে; উঠেছে এশিয়া কাপের ফাইনালেও। এই দুই টুর্নামেন্টের আগে-পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলতি সিরিজ জয়ও তো এখন সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে।

২০১৪ সালে ১৮ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের জয় ছিল ৫ ম্যাচে। সবগুলোই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ সিরিজে। তাতে বছরের জয়ের হার ২৭.৭৭% হলেও ওই সিরিজের আগ পর্যন্ত হিসাবের এ ঘর ছিল ০%। এ বছর এখন পর্যন্ত ১৮ ম্যাচে ১২ জয়ে সে হার ৬৬.৬৬%। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ দুটি ওয়ানডে জিতলে জয়ের শতকরা হার বেড়ে হবে ৭০%। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সফলতম বছরের তালিকায় শীর্ষ তিনে তখন ঠাঁই করে নেবে ২০১৮।

সবার ওপরে ২০০৯ সাল। ১৯ ম্যাচের ১৪ জয়ে সেবার জয়ের হার ৭৩.৬৮%। ২০১৫ সালে ১৮ ম্যাচে ১৩ জয়ে তা ৭২.২২%। বছরে ৬০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশের জয় রয়েছে আরেক বছরেই—২০০৬ সালে। ২৮ ম্যাচে ১৮ জয়ে সেবারের হার ৬৪.২৮%। আর সংখ্যা বিবেচনায় সর্বোচ্চ ওয়ানডে জয়ে ২০০৬ সালের ১৮ জয় সবচেয়ে ওপরে। হোক না এর বেশির ভাগই জিম্বাবুয়ে, কেনিয়ার মতো দলের বিপক্ষে। তবে সে সময়ের বিবেচনায় এটি দুর্দান্ত সফল বছর। বাংলাদেশের ২০০৭ বিশ্বকাপ সাফল্যের ভিতও গড়ে দেয় তা। সেবার ছাড়া বছরে দশের বেশি ওয়ানডে ম্যাচ জয়ের উদাহরণ লাল-সবুজের রয়েছে আরো তিনবার। ২০০৯ সালে ১৪, ২০১৫ সালে ১৩ এবং চলতি বছর ১২টি। ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে শেষ দুই ওয়ানডে জিতলে ২০১৮ সাল ক্রমে এগিয়ে যাবে আরেক ধাপ।

টেস্ট যুগের প্রথম চার বছরে কোনো ওয়ানডে জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ২০০০ সালে চার, ২০০১ সালে ছয়, ২০০২ সালে ১৪ এবং ২০০৩ সালে ২১ ওয়ানডে খেলেও জয়শূন্য। সে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের প্রত্যাবর্তন হওয়ার দশা ২০১৪ সালে। বছরের শেষভাগে মাশরাফির নেতৃত্বে দল ঘুরে দাঁড়ায় বলে রক্ষা! দুঃস্বপ্নের পাগলাঘোড়াকে বশ মানিয়ে সাফল্যের টাট্টুঘোড়া ছোটান তিনি এরপর।

চার বছর পর এবার সেই টাট্টুঘোড়া আরো গতিশীল। আরো বেগবান। ২০১৯ বিশ্বকাপ ঘিরে তাই বড় স্বপ্ন দেখবে না কেন মাশরাফির বাংলাদেশ!



মন্তব্য