kalerkantho



চ্যালেঞ্জ বিজয়ী ছেলে

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চ্যালেঞ্জ বিজয়ী ছেলে

বিসিবি একাদশের ঠিকানা পেনিনসুলা হোটেল ছেড়ে তখন সবে তিনি উঠেছেন জাতীয় দলের আবাস র‌্যাডিসন হোটেলে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ থেকে টেস্ট দলে ঢুকে যাওয়া বাঁহাতি ওপেনারের তখনো দেখা হয়নি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান কিংবা মাহমুদ উল্লাহদের সঙ্গে। অচিরেই তাঁদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনায় গতকাল মাঝদুপুরে ফোনের ওপার থেকে ভীষণ রোমাঞ্চিত শোনাল সাদমান ইসলামের কণ্ঠ। দেখা হওয়ার পর ওই দুই তারকা প্রথম কী বলেন, সেটি নিয়েই যত রোমাঞ্চ তাঁর!

দেখা হওয়ার আগেই অবশ্য প্রথমবারের মতো টেস্ট দলে জায়গা করে নেওয়া সাদমানের সঙ্গে কথায় কথায় বোঝা হয়ে গেছে যে সাকিব-মাহমুদের মুখে তিনি আসলে কী শুনতে চান, ‘‘একসময় অনূর্ধ্ব-১৩, ১৫, ১৭ ও ১৯ দলের যত ক্যাম্প হতো, আব্বু আমাকে নিয়ে যেতেন। আমি তখন খুব ছোট। সাকিব ভাই যখন অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ক্যাম্পে, মনে আছে গিয়েছিলাম সেখানেও। রিয়াদ ভাইকেও (মাহমুদ উল্লাহ) তেমনই কোনো এক ক্যাম্পে প্রথম দেখেছিলাম। এখন মাঠে (ঘরোয়া ক্রিকেটে) দেখা হলেই তাঁরা আমাকে বলেন, ‘তোকে কত্ত ছোট দেখেছি! আর তুই কিনা এখন আমাদের সঙ্গে খেলছিস!’ দেখি এবার তাঁরা কী বলেন!’’

সেই ছোট্ট সাদমান এখন সাকিব-মাহমুদদের সঙ্গে টেস্ট দলে। ছোট্ট থেকে একটু একটু করে বড় হওয়ার পথে একসময়ের মারকুটে এই ব্যাটসম্যান নিজেকে বদলেও নিয়েছেন অনেকখানি। অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যায়ে ঢাকা গ্রিন দলের বিপক্ষে ঢাকা ব্লুয়ের হয়ে ২১৮ রানের ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যানের আর যা-ই হোক, হাতে শটের অভাব ছিল না। এমনকি ২০১৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও শটের ফুলঝুরি ছুটিয়ে ৬ ম্যাচে ১০১.৫০ গড়ে এক সেঞ্চুরি ও দুই ফিফটিতে করেছিলেন ৪০৬ রান, যা যুব বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো বাংলাদেশির সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে এখনো।

অথচ ওই আসরের পর থেকেই নিজেকে বদলে নিতে থাকেন ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়া সাদমান। একই স্কুলে পড়েছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ এবং দেশের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিয়ান মেহরাব হোসেন সিনিয়রও। তবে পূর্বসূরিদের মতো তাঁরও রঙিন পোশাকের ক্রিকেটের মোহে না পড়ার কারণ সাদমানের বাবা শহীদুল ইসলাম। টি-টোয়েন্টির এই রমরমা যুগে সেই ঝুঁকি আরো বেশি থাকলেও ক্রিকেট বোর্ডের গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক বাবার কথাই শিরোধার্য ছিল সাদমানের কাছে।

তাই গত চার বছরে নিজের ব্যাটিংয়ের খোলনলচেই বদলে ফেলেন সব শেষ জাতীয় লিগের সর্বোচ্চ স্কোরার। এমনই যে ৬৪.৮০ গড়ে ৬৪৮ রান করা সাদমান আসরের একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন এক হাজারেরও বেশি বল (১ হাজার ১৫ বল)। নিজেকে এভাবেই বদলে ফেলার পেছনের গল্পটি এ রকম, ‘‘যুব বিশ্বকাপ খেলে আসার পর থেকেই খেলার ধরন বদলাই, শট কমাই। ওই বিশ্বকাপের পর আব্বু বলতেন, ‘একটি ফরম্যাট নিয়ে চিন্তা কর। কিভাবে টেস্ট ব্যাটসম্যান হওয়া যায়, সেটি নিয়ে চিন্তা কর। ফার্স্ট ক্লাস খেল। টেস্ট খেলতে পারলে বাকি সব ফরম্যাটও তুই এমনিতেই খেলতে পারবি।’ আমি তাই আগে টেস্ট ব্যাটসম্যানই হতে চেষ্টা করেছি।’’

সেই সঙ্গে বাবার ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জও জেতার চেষ্টা করে গেছেন নিত্য। প্রথমবারের মতো টেস্ট দলের স্বপ্ন দুয়ার খোলার পর সেই চ্যালেঞ্জ জয়ের স্বস্তিই বেশি খেলে গেল সাদমানের কথায়, ‘‘আব্বু সব সময় বলতেন, ‘খেললে সব সময় নিজের যোগ্যতায় খেলবি। কেউ যেন এমন কথা বলার সুযোগ না পায় যে বাবার কারণে সুযোগ পেয়েছিস।’ আমি যখন অনূর্ধ্ব-১৪ দলে, তখন থেকেই আব্বু এসব বলে আসছেন আমাকে। আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগছে এই ভেবে যে আব্বুর কথা রাখতে পেরেছি। আমি নিজের যোগ্যতায়ই এত দূর আসতে পেরেছি।’’

আপাতত হতে পেরেছেন বাবার ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ বিজয়ী গর্বিত ছেলেও!



মন্তব্য