kalerkantho



মহসিনের স্মৃতিতে কোচদের অমৃতযোগ

সনৎ বাবলা   

২০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মহসিনের স্মৃতিতে কোচদের অমৃতযোগ

২০০৫ সালে, আর্জেন্টাইন কোচ ক্রুসিয়ানির আমল থেকে মহসিন বাফুফের চাকুরে। মূল কাজ কোচের গাড়ি চালানো হলেও খেলোয়াড়দের ম্যাসাজ থেকে শুরু করে সব কাজই তাঁর কমবেশি জানা।

মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির বিদ্যা দিয়ে এত এত বিদেশি কোচের সঙ্গে উদয়াস্ত ফাইফরমাশ খাটা তো সহজ কর্ম নয়! তা-ও আবার ফুটবল কোচ—গরম-ঠাণ্ডা,  খেপাটে, নিয়মনিষ্ঠ কত বিচিত্র চরিত্রের হয়। মহসিনের চাকরিটা যেন সব সময় দোনলা বন্দুকের ব্যারেলের সামনে ঝুলছে। সাহেবদের ইংরেজি বুঝে, না-বুঝে কোনো ভুল হয়ে গেলে আর রক্ষা নেই। চাকরির গোড়া আলগা হয়ে যেতে পারে মুহূর্তে। কিন্তু এমন দুর্ভাগ্য কখনো এই সাদামাটা বাঙালির জীবনে হানা দেয়নি। ঘটেছে সব উল্টো ঘটনা, ওই বিদেশিদের মধ্যে তিনি পেয়েছেন পিতৃসম অভিভাবক আর বন্ধুভাবাপন্ন মানুষ যাঁদের সঙ্গে এখনো তাঁর নিত্য ফোনালাপ হয়। তাঁর ও তাঁর পরিবারের খোঁজখবর নেন কোচরা।

কী অমন বশীকরণ জাদু জানেন যে তাঁরা এখনো অপনাকে ভুলতে পারেননি?

—এটা জাদুটাদু নয়। তাঁরা প্রত্যেকে আমার বস ছিলেন। ইংরেজিটা একটু সমস্যা করেছে, তবে আমার আন্তরিকতায় কোনো কমতি ছিল না। সব সময় চেষ্টা ছিল আমার কাজ দিয়ে তাঁদের সন্তুষ্ট করা। এই সততাই আমার সম্বল।

আরেকটি স্পষ্ট জবাব চাই। কোচ স্কুলের হেডস্যারের মতো, তাঁর কাছের লোক হিসেবে খেলোয়াড়দের বাঁদরামির খবরাখবর নিশ্চয়ই  দিতেন?

—ব্যবসার লক্ষ্মী হলো ক্রেতারা। তেমনি ফুটবলের লক্ষ্মী ওই খেলোয়াড়রা, তারা না থাকলে কোচ কিংবা আমার প্রয়োজন নেই। আমি সব সময় খেলোয়াড়দের ভালো দিকটাই দেখেছি। কিন্তু ফেডারেশনে যখন কারো নামে নালিশ যায়, তখন সবাই আমাকে সন্দেহ করে। এটা তাদের ভুল ধারণা, এর পরও এই ফ্যাসাদের মধ্যে পড়তে হয় মাঝেসাঝে।

পুরো নাম মোহাম্মদ মহসিন। শৈশবে তাঁর মাথাটা খেয়েছে ফুটবল। বাড়ি বরিশালের হিজলা থানার হরিনাথপুর গ্রামে। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে মা-বাবাকে হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়া এই শিশুর জীবনে নেমে আসে অমানিশা। চার বোনের ছোট ভাই। কিন্তু জন্মের পরই যে তাঁর জীবনে ফাঁস লেগে গেল! অভাব জাঁকিয়ে বসে ভাই-বোনের সংসারে। এর পরও স্কুল শিক্ষকদের সস্নেহে তাঁর বিনা বেতনে লেখাপড়ার একটা হিল্লে হয়েছিল। সে-ও চলছিল কোনো রকমে। তবে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর সেই শিশুর মনটা মজে গেল ফুটবলে। লেখাপড়া শিকেয় তুলে খেলার নেশায় মত্ত। এ-ও যে বড় বিপজ্জনক, খিদেপেটে স্বপ্নের সিঁড়ি ভাঙা কঠিন। গ্রামের কয়েকজন সুহূদের হাত ধরে ঢাকায় পাড়ি দিয়েও তাঁর ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিশোর লিগ, পাইওনিয়ার লিগের পর মুখ থুবড়ে পড়ে মহসিনের স্বপ্ন, ‘আমাদের অভাবের সংসারে টাকার দরকার ছিল। আমি আয়ের পথ খুঁজছিলাম। একদিন মোহামেডানের ম্যাচ শেষে কায়সার হামিদ ভাইকে সামনে পেয়ে যাই। ভয়ে ভয়ে আমার নিজের কথা বলি। আমার অবস্থা বুঝে তিনি মোহামেডান ক্লাবে নিয়ে গেলেন আমাকে। ক্লাবে খেলোয়াড়দের কাজকর্ম করে দিই। এরপর ১৯৯৪ সালে কোচ ম্যান ইয়াং ক্যাংয়ের ক্যাম্পেও খেলোয়াড়রা আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁদের কাজকর্ম করে দিতে।’

এক-দেড় মাস বাদেই হাইজ্যাক হয়ে গেল খেলোয়াড়দের ‘প্রিয় মহসিন’। কাজেকর্মে পটু দেখে ১৪ বছর বয়সী ছেলেটাকে নিজের জন্য নিয়ে নেন জাতীয় দলের দক্ষিণ কোরিয়ান কোচ। নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে অভাবী কিশোর-জীবন, ‘খুব ভয়ে ছিলাম। একে তো ভাষার সমস্যা, এরপর বিদেশি মানুষ। ভুলভাল হলে আয়ের সুযোগটাও হারাব।’ এটা চাকরি নয়, ক্যাম্প চলাকালীন কোচের সঙ্গে কাজের জন্য ভাউচারে দু-তিন হাজার টাকা মিলত। ক্যাম্প না থাকলে ক্লাবে ক্লাবে ঘোরা। কখনো মুক্তিযোদ্ধার কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক হাত বাড়িয়ে দেন, কখনো-বা আরামবাগের ‘ওস্তাদ’ প্রয়াত ওয়াজেদ গাজী। এমনও দিন গেছে, সোনালী অতীত ক্লাবের বারান্দায় শুয়ে খালি পেটে রাত কাটিয়েছেন। ক্ষনিকের বিতৃষ্ণা আসে ফুটবলে। পরের দিনই আবার কোনো ফুটবল সুহূদ ভরপেট খাইয়ে দিয়েছে, অমনি ফুটবলের প্রেমে সব রাগ গলে পানি। ‘আমার এ জীবনে ফুটবলার ও কোচদের কাছে ঋণের শেষ নেই। প্রেসিডেন্ট স্যার, বাদল স্যার, মুন্না ভাই, রকিব ভাই, জুয়েল-আরমান ভাইসহ লম্বা তালিকা। কোচদের মধ্যে মানিক-টিটু-মারুফ স্যারসহ প্রায় সব কোচই আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ-মমতা দিয়েছে। তবে বাবার আদরটা পেয়েছি বোধ হয় জর্জ কোটানের কাছ থেকে। আমাকে নিজের হাতে গাড়ি চালানো শিখিয়েছেন, যেন কিছু করে খেতে পারি। তাঁর ছেলের ইংরেজি শিক্ষক দিয়ে আমাকে ইংরেজি শিখিয়েছেন। এরপর নানা তদবির করে বাফুফের চাকরির ব্যবস্থাটাও তিনি করে দিয়ে গেছেন। আমার বাবা বেঁচে থাকলেও হয়তো এত করতে পারতেন না’ বলতে বলতেই চোখ ভিজে যায় মহসিনের।

২০০৫ সালে, আর্জেন্টাইন কোচ ক্রুসিয়ানির আমল থেকে মহসিন বাফুফের চাকুরে। মূল কাজ কোচের গাড়ি চালানো হলেও খেলোয়াড়দের ম্যাসাজ থেকে শুরু করে সব কাজই তাঁর কমবেশি জানা। জুতা সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ—সব কাজের কাজি বলেই হয়তো কোচদের এত প্রিয় তিনি। হালের জেমি ডে বাদ দিলে আগে ১৬ জন বিদেশির সঙ্গে কাজ করেছেন। বেশির ভাগের সঙ্গেই তাঁর পুরনো সখ্য এখনো রয়ে গেছে, ‘আমার অসুস্থতার সময় অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছিল। কিছুদিন আগে রুবচিচের স্ত্রী ফোন করে আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। রুবচিচ ইতালির একটি ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। ক্রায়োভিচ ফিফা প্রজেক্টে আছেন, রেনে কোস্টার আফ্রিকার এক ক্লাবে, মার্ক হ্যারিসন এক জিম্বাবুইয়ান ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। আমাদের দেশ থেকে গিয়ে অনেকে ভালো ভালো জায়গায় কাজ করেন। তাঁরা ফোন করে আমার ভালো-মন্দ খবর নেন, এটাই তো বড় পাওয়া।’ এঁদের মধ্যে ‘নিপাট ভদ্রলোক’ ক্রোয়েশিয়ান রবার্ট রুবচিচের মধ্যরাতে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার রহস্য এখনো তাঁর অজানা। ভুলতে পারেন না অটো ফিস্টারের গালভরা হাসিতে সোনালি দাঁতের ঝিলিক আর অমন সুন্দর ইংলিশ কোচ হ্যারিসনের সঙ্গে ঢাকার রাস্তায় রিকশা ভ্রমণ। সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। ইরাকি কোচ সামির শাকিরের টেম্পু-বাসে চেপে ঢাকা-বিকেএসপি করাটাও কি কম বিস্ময়ের! স্মৃতিরা এসে ভিড় করে, আনন্দ-বিষাদের লহরি তৈরি করে। কোচদের এই অমৃতযোগ মহসিনের স্মৃতিতে অমলিন।



মন্তব্য