kalerkantho



তাইজুলের টানা তিন

যাঁর কথা বলে না কেউ

নোমান মোহাম্মদ   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যাঁর কথা বলে না কেউ

ছবি : মীর ফরিদ

খ্যাতির আলোর মিছিল খোঁজে না তাঁকে। যদিও তাঁর পারফরম্যান্সে রোশনাই হাজার জোনাকির।

সমর্থনের শব্দের কলরব ওঠে না তাঁকে ঘিরে। যদিও বল হাতে তাঁর মুহুর্মুহু স্লোগানের দাবি আকাশ স্পর্শের।

তিনি থেকে যান আড়ালে। নিভৃতে। ওই রংমিস্ত্রির মতো, যার আঁচড়ে তৈরি রংমহলে মুগ্ধ সবাই, কিন্তু এর কারিগরকে মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করে না কেউ। বাংলাদেশের ক্রিকেট চিত্রনাট্যে নেপথ্যের নায়ক হয়েই থাকেন তাই বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম।

কারণ? কারণ তিনি ওয়ানডেতে সুযোগ পান না; টি-টোয়েন্টিতে ব্রাত্য। শুধু টেস্ট খেলে বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে তারকা হওয়া যায় নাকি! হলেনই বা তাইজুল সাদা পোশাকের রঙিলা জাদুকর! থাকলই বা এই মুহূর্তে তাঁর স্পিন জাদুতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বিব্রতকর সিরিজ হার ঠেকানোর রক্ষাকবচ!

সাধকের মগ্নতায় নিজের কাজটি বরাবর করে যান তাইজুল। যেমনটা করছেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজেও। প্রথম টেস্টে দলের বিপর্যয়ের মধ্যেও মাথা উঁচু করা পারফরম্যান্স তাঁর। প্রথম ইনিংসে ছয় এবং দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ শিকার; দুইয়ের যোগফলে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ম্যাচে ১০ উইকেটের অর্জন। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে কাল জিম্বাবুয়েকে অলআউট করায় তাইজুলের পাঁচ উইকেটের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ম্যাচের বর্তমান বাঁকে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা অনেকখানিই লুকানো তাঁর গোটানো আস্তিনে।

সিরিজজুড়ে এমন চোখ-ধাঁধানো পারফরম্যান্সে কত কত রেকর্ডের রেণু উড়ছে এখন তাইজুলকে ঘিরে! দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের যেমন। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯ উইকেট নিয়ে সে মুকুট মেহেদী হাসানের। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চলতি সিরিজে এরই মধ্যে ১৬ উইকেট হয়ে গেছে তাইজুলের। রেকর্ড বইয়ের এই পাতাটি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারেন তাই সতীর্থ অফ স্পিনার। অন্য আরেক পাতায় দুই বাঁহাতি স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র ও সাকিব আল হাসানের রেকর্ডেও তো বিদায়ের তিরতিরে কাঁপন। বাংলাদেশের হয়ে টানা তিন ইনিংসে পাঁচ বা ততোধিক উইকেট শিকারের স্বাক্ষর এত দিন ছিল শুধু ওই দুজনের পরিসংখ্যানে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০৫ সালে এনামের; ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা-শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাকিবের। চলতি সিরিজের প্রথম তিন ইনিংসের কীর্তিতে তাঁদের পাশে এখন তাইজুল। আর চতুর্থ ইনিংসে পূর্বসূরিদের ছাড়িয়ে যাওয়ার উপলক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে। আর এক পঞ্জিকাবর্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডেও পিছিয়ে নেই খুব। ২০০৩ সালের মোহাম্মদ রফিকের ৩৩ উইকেটের চেয়ে মাত্র দুই শিকার দূরে এখন।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চলতি টেস্টে সব রেকর্ডই তো হয়ে যেতে পারে তাইজুলের।

তবু তিনি রাজা নন, খ্যাতিমানদের ভিড়ে সাধারণ এক প্রজা যেন। অথচ কি জানেন, ২০১৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অভিষেকের পর থেকে সময়কালে টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট পাওয়া বোলারের নাম তাইজুল! ২১ টেস্টের ৩৭ ইনিংসে ৩২.৩১ গড়ে ৮৫ শিকারে। ১৯ টেস্টে ৭৪ উইকেট নেওয়া সাকিবের চেয়েও সফল তিনি।

তাইজুলের বীরত্বের আরেক বড় উদাহরণ সাকিবের অনুপস্থিতিতে জ্বলে ওঠার ক্ষমতা। আর তা শুধু চলতি সিরিজে নয়, সব সময়। পরিসংখ্যান দেখুন। সাকিবের সঙ্গে খেলা ১৪ টেস্টের ২৬ ইনিংসে ৪৯ উইকেট। আর সাকিবহীন ৭ টেস্টের ১১ ইনিংসেই ৩৬ শিকার। ৩৩.৪২ গড় অগ্রজের অনুপস্থিতিতে কমে আসে ৩০.৮০-তে; স্ট্রাইকরেট ৬২.৭ থেকে ৫৭.৭-এ। সাকিবের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রাখা যুদ্ধে ২৬-এর মধ্যে মোটে দুইবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট তাইজুলের। যুদ্ধটা যখন একার, তখন ১১ ইনিংসেই অমন অর্জন চারবার। সিলেটে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ইনিংসে ১০ শিকারও তো বিখ্যাত কীর্তিমানকে ছাড়া!

বাংলাদেশের বোলিংয়ে সাকিবের বটের ছায়া সরে গেলে তাইজুল তাই অশ্বত্থের শীতলতা ছড়িয়ে দিতে পারেন পরম নির্ভরতায়।

অথচ এসব নিয়ে উচ্চকণ্ঠ নন তিনি। সাকিবের শূন্যতায় ভালো পারফরম্যান্সে বাড়তি তৃপ্তির প্রশ্নের উত্তরে কাল দিন শেষে বলেন তাই, ‘বাড়তি তৃপ্তি না। আমি এখন অনেক বেশি বোলিং করার সুযোগ পাচ্ছি। সাকিব ভাই থাকলে হয়তো আমার ওপর এত দায়িত্ব পড়ত না।’ নিজের আরেক দফা পাঁচ উইকেট নেওয়ার প্রতিক্রিয়াও চটকদার নয়, ‘ভালো পারফর্ম করলে সব ক্রিকেটারের ভালো লাগে। তবে দল আগে। আমাদের দল ভালো অবস্থানে আছে বলে ভালো লাগছে।’ তাঁর সামনে অনেক রেকর্ডের হাতছানি নিয়ে ওই মৃদু কণ্ঠেই বলে যান, ‘আসলে উইকেটের অবস্থা এমন যে যদি শৃঙ্খলা মেনে বোলিং করতে পারি তাহলে কিছুই অসম্ভব না।’

কথাবার্তায়ই তো স্পষ্ট, অন্য অনেক সতীর্থের মতো সপ্রতিভ নন তাইজুল। মমিনুল হকের মতো দার্শনিকসুলভ নির্লিপ্তের কাতারেও রাখা যায় না। তিনি বরং যেন সংকোচে গুটিয়ে থাকা শামুক। যাঁর কুণ্ঠার অবগুণ্ঠন ভেদ করা যায় না কিছুতেই।

আবার এই তাইজুলের বাঁহাতি স্পিন ভেলকির রহস্যভেদও তো করতে পারছেন না জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানরা। ধারাবাহিকতা দ্বিতীয় ইনিংসে ধরে রাখবেন, সে আশা করাই যায়। তাহলে বাংলাদেশের ম্যাচ জিতে সিরিজ ড্রয়ের প্রত্যাশাও বাড়াবাড়ি নয়। অমনটা হলেও কি আর তাইজুল মহানায়ক হয়ে উঠতে পারবেন! ডাবল সেঞ্চুরি করে চিত্রনাট্যের সে রোলে আগাম বুকিং দিয়ে রেখেছেন যে মুশফিকুর রহিম!

টেস্টটি তাই হয়তো হয়ে থাকবে তাইজুলের ক্যারিয়ারের এক খুদে সংস্করণ। বরাবরের মতোই যেখানে তিনি পার্শ্বচরিত্র!



মন্তব্য