kalerkantho



রেকর্ডের মালায় সুশোভিত মুশফিক

মাসুদ পারভেজ   

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রেকর্ডের মালায় সুশোভিত মুশফিক

একাদশে আরো দুজন উইকেটকিপার ছিলেন এবং তাঁদের একজন কিপিং করলেই বাংলাদেশের দীর্ঘতম টেস্ট ইনিংস খেলার ক্লান্তি কিছুটা হলেও মুছত মুশফিকুর রহিমের। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ রাখলেন না, ৫৮৯ মিনিট ব্যাটিং করে ২১৯ রানের হার না মানা ইনিংস খেলার পরও ঠিক প্যাড-কিপিং গ্লাভস পরে নেমে গেলেন। 

এই নামাটাই সব কীর্তিমান উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের মুশফিকের পেছনে পড়ে যাওয়ার প্রতীকী ছবিও। আপাতত খুব বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই। দুজনের নামই নেওয়া যাক—কুমার সাঙ্গাকারা ও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। এঁদের প্রথমজনের ১১টি টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরির একটিই শুধু এই দ্বৈত ভূমিকায় করা। আর টেস্টে পরেরজনের ডাবল সেঞ্চুরিই তো একটি। তাই কাল যখন মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ৪০৭ বলে দুই শ ছুঁলেন মুশফিক, তখন একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করা প্রথম কিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে ইতিহাসেও লেখা হয়ে গেল তাঁর নাম।

বিশ্বরেকর্ডের পাতায় নিজের নাম টুকে নেওয়া মুশফিকের গলায় শোভা পেল আরো কত কীর্তির ফুলে ফুলে গাঁথা অদৃশ্য এক মালাও! যে মালার একেকটি ফুল আলাদা একেকটি রেকর্ডও। সব নিজের করে নেওয়ার দিনটি বাংলাদেশেরই হবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী! আগের দিন মমিনুল হকের সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে গড়েছিলেন বাংলাদেশের সেরা ২৬৬ রানের পার্টনারশিপ। কাল তাঁর ডাবল সেঞ্চুরির পথে বিশ্বস্ত সহযোগী মেহেদী হাসান মিরাজকে (৬৮*) নিয়ে গড়া অবিচ্ছিন্ন ১৪৪ রানের পার্টনারশিপও অষ্টম উইকেটের সেরা।

এমন আরো কত রেকর্ড ওলটপালট করে দেওয়া ব্যাটিংয়ে মুশফিক যেই না সাকিব আল হাসানকে পেছনে ফেললেন, তখনই ৭ উইকেটে ৫২২ রানে ইনিংস ঘোষণা করে দেন অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহ। সেটিই খুব স্বাভাবিক। এত রান জমা করার পর নিশ্চয়ই আরেকবার ব্যাটিংয়ে নামতে চাইছে না বাংলাদেশ। তাই প্রতিপক্ষকে ফলোঅনে ফেলে দুইবার অল আউট করার জন্য বোলারদের যথেষ্ট সময়ও তো দেওয়া চাই। জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক হ্যামিল্টন মাসাকাদজাকে ফিরিয়ে সিলেট টেস্টে ১১ উইকেট নেওয়া তাইজুল ইসলাম শুরুও করেছেন সেই কাজ। ওই একটি উইকেটই হারিয়ে ২৫ রানে দ্বিতীয় দিন শেষ করেছে সফরকারীরা।

আর স্বাগতিকদের দ্বিতীয় দিনের শুরু দেখে বোঝাই যায়নি যে রেকর্ডের মাল্যে সাজতে চলেছেন মুশফিক। ১১১ রান নিয়ে শুরু করা এই ব্যাটসম্যান প্রথম ঘণ্টায় করেছেন মোটে ৪ রান! দ্বিতীয় দিনে মুখোমুখি হওয়া ৫৬তম বলে মেরেছেন প্রথম বাউন্ডারি। উইকেটে সবুজ ঘাস থাকায় এদিনও জিম্বাবুয়ের পেসাররা সুবিধা পাচ্ছিলেন। তাই ভীষণ সাবধানী মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহর জুটি প্রথম ঘণ্টা পার করে দেন ১৪ ওভারে মাত্র ২২ রান তুলে। পরের ঘণ্টায় ওঠে ৪০ রান। সব মিলিয়ে প্রথম সেশনে ৩০ ওভারে ৬২ রান।

মধ্যাহ্নবিরতির পর দ্বিতীয় ওভারেই কাইল জার্ভিসের অফস্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে না দিয়ে ব্যাট বাড়িয়ে বিপদে পড়েন মাহমুদ উল্লাহ (৩৬)। সিলেট টেস্টে স্বাগতিক দলের সফলতম ব্যাটসম্যান আরিফুল হকও (৪) দ্রুত অনুসরণ করেন অধিনায়ককে। জার্ভিসকে ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মতো ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়ার আনন্দে ভাসান পয়েন্টের ফিল্ডারকে ক্যাচ প্র্যাকটিস করিয়ে! মুশফিকের (১৪৩*) তখন দেড় শও হয়নি, দলও পেরোয়নি চার শ (৩৭৮/৭)। আবার মিরাজও তো সেখান থেকে আরেকটি বড় পার্টনারশিপ গড়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা নন।

কিন্তু মুশফিকের রেকর্ডময় দিনে মিরাজ সেই নিশ্চয়তাও হলেন। তাই ডাবল সেঞ্চুরির আগেই সময়ের হিসাবে বাংলাদেশের দীর্ঘতম টেস্ট ইনিংসের রেকর্ডও হয়ে গেল মুশফিকের। ২০০০ সালের নভেম্বরে দেশের অভিষেক টেস্টে ইতিহাস গড়া ১৪৫ রানের ইনিংস খেলার পথে আমিনুল ইসলামের ৫৩৫ মিনিট উইকেটে থাকাই ছিল এত দিন রেকর্ড। সেটি পেরিয়ে ১৯৫ রান নিয়ে চা বিরতিতে যাওয়া মুশফিক ডাবল সেঞ্চুরিতে পৌঁছানোর আগে নিতে চাননি কোনো ঝুঁকিও। তাই লেগস্পিনার ব্রেন্ডন মাভুতাকে মেডেন দিয়ে যান ১৯৯ রানে। পরের ওভারে সিকান্দার রাজাকে পুল করে সিঙ্গেল নিয়েই হারিয়ে যান ডাবল সেঞ্চুরির অনির্বচনীয় আনন্দে।

আরো কিছু রেকর্ডও তখন তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ার বাকি। ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে গল টেস্টে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে করেছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি, একই ম্যাচে ১৯০ রান করতে ৪১৭ বল খেলা মোহাম্মদ আশরাফুলই এত দিন ছিলেন বলের হিসাবে বাংলাদেশের দীর্ঘতম টেস্ট ইনিংসের মালিক। ৪২১ বল খেলা মুশফিক সেটির মালিকানাও যেমন নিজের করে নিলেন, তেমনি বাংলাদেশের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংসেরও। গত বছর নিউজিল্যান্ডে সাকিবের খেলা ২১৭ রানের ইনিংস পেরিয়ে যেতেই আর বিলম্ব করেননি মাহমুদ উল্লাহ।

বোলারদেরও তো যথেষ্ট সময় দিতে হবে। তা বোলিংয়ে নামার সময়ই প্যাড-কিপিং গ্লাভস পরা মুশফিক পেছনে ফেলেছেন ইতিহাসের সব কীর্তিমান উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানকেও।



মন্তব্য