kalerkantho



চাপ জয় করে শতরান

নোমান মোহাম্মদ   

১২ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চাপ জয় করে শতরান

ছবি : মীর ফরিদ

আবার পোড়োবাড়ির নিস্তব্ধতা। আবারও ধ্বংসের বাঁশির কর্কশ সুরে বেজে ওঠা। সিলেটের মতো ১৯ রানে চতুর্থ উইকেট পড়েনি ঠিক। কিন্তু কাল ২৬ রানে ৩ উইকেটের পতনও কি কম আশঙ্কার! বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে তখন অদৃশ্য এক সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে আতঙ্কের শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে। টিকটিকির টিকটিকে কাচঘেরা ওই ঘরের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনও চমকে ওঠে হয়তো। তাহলে কি আবারও...

নাহ্, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের ব্যাটিং বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি হয় না শেষমেশ। ঘোর বিপর্যয়ের গহ্বরে জন্ম যে জাদুকরী এক জুটির! কেটে যায় স্তব্ধতার গোঙানি; ধ্বংসবীণা সুর পাল্টে বেজে ওঠে আনন্দকল্লোল ছড়িয়ে। মমিনুল হক ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিং বীরত্বে তো ম্যাচে এখন বাংলাদেশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত।

কী ব্যাটিংটাই না করলেন এ দুজন! দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে এসে যেটিকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা হিসেবে রায় দিয়ে যান মমিনুল। ১৬১ রান করে আউট হওয়ায় এসেছিলেন গণমাধ্যমের সামনে। ১১১ রানে অপরাজিত মুশফিকের মনোযোগ তখন পরদিনে। আজ তিনি ইনিংসটা আরো কত দূর টেনে নিতে পারেন, বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসও অনেকখানি নির্ভরশীল এর ওপর। এরপর হয়তো সতীর্থের মতো নিজের ইনিংসকেও ‘ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা’ মর্যাদা দিতে দ্বিধা থাকবে না তাঁর।

হলোই-বা প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে! কিন্তু দলের বিপর্যয় এবং উইকেটের রহস্যময়তার কারণে মমিনুল-মুশফিকের ইনিংস দুটি ‘স্পেশাল’ মর্যাদার দাবি রাখে অবশ্যই।

ঢাকা টেস্ট মাঠে গড়ানোর আগে দুজনই যে চাপের মধ্যে ছিলেন, তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য সর্বশেষ চার টেস্টের ব্যাটিং মহামারিতে চাপে নেই কোন ব্যাটসম্যান! পার্থক্য বলতে লিটন দাশ, ইমরুল কায়েসরা নিজেদের ওপর চাপ আরো বাড়িয়ে আউট তড়িঘড়ি। অভিষেকে মোহাম্মদ মিঠুন খুলতে পারেন না রানের খাতা। কিন্তু মমিনুল-মুশফিক লড়াই করে যান বুক চিতিয়ে। আর সেটি পর্বতপ্রমাণ চাপ জয় করেই। চাপ হবে না? আগের চার টেস্টের আট ইনিংসে তাঁদের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় কারণটা। সেখানে মমিনুলের স্কোর ০, ৩৩, ১, ০, ০, ১৫, ১১ ও ৯। আট ইনিংসে ৬৯ রান; গড় ৮.৬২। মুশফিকের অবস্থা তুলনামূলক ভালো বটে, কিন্তু সেই ভালোই বা কতটা! ১, ২৫, ০, ৮, ২৪, ৩১, ৩১ ও ১৩ স্কোরে ১৬.৬২ গড়ে ১৩৩ রানই তো।

কাল মমিনুল-মুশফিকের প্রতিপক্ষ ছিল তাই শুধু জিম্বাবুয়ের বোলার-ফিল্ডার নয়, তাঁদের ব্যাট খামচে ধরা এই পরিসংখ্যানও।

তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে খেলেন ধ্রুপদি দুটি ইনিংস। শুরুতে নড়বড়ে ছিলেন, সুযোগ দেন—কিন্তু যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে যান না তাঁরা, করেন না আত্মসমর্পণ। দাঁত কামড়ানো লড়াইয়ে ৯২ বলে ৫০, ১৫০ বলে ১০০, ২৩৯ বলে ১৫০ হয়ে যায় মমিনুলের। ১০০ বলে ফিফটি এবং ১৮৭ বলে সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ মুশফিকের। একটু অবাক করা ব্যাপার হলো, শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ১৭তম টেস্টে এটি মুশফিকের প্রথম সেঞ্চুরি। আর আগের পাঁচ টেস্ট সেঞ্চুরির মধ্যে চারটিই দেশের বাইরে—গলে শ্রীলঙ্কা, কিংসটাউনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ড এবং হায়দরাবাদে ভারতের বিপক্ষে। দেশে তাঁর একমাত্র সেঞ্চুরিটি ছিল চট্টগ্রামে; ২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে। অন্যদিকে মমিনুল কাল সপ্তম টেস্ট সেঞ্চুরি করলেন, সাতটিই দেশের মাটিতে। পয়া মাঠ চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে পাঁচটি এবং শেরে বাংলায় দুটি। কালকের ১৬১ রানে অন্য একটি রেকর্ডের শিখরে অবশ্য নিজেকে তুলে নেন এই বাঁহাতি। ২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে তামিমের ১৫১ টপকে এটিই এখন এ মাঠে কোনো স্বাগতিক ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ইনিংস।

মমিনুল-মুশফিকের অনবদ্য যুগলবন্দিতে কাল ৭৪.৩ ওভারে তৈরি হয় ২৬৬ রানের সেতু। না, দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের জুটি হয় না তাতে। গত বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটনে মুশফিক-সাকিবের ৩৫৯ রান থাকে সবার ওপরে। ২০১৫ সালে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে তামিম-ইমরুলের ৩১২ এবং ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে আশরাফুল-মুশফিকের ২৬৭ রানের পেছনেও থাকে তা। কিন্তু বাংলাদেশের হোম অব ক্রিকেটে স্বাগতিকদের সর্বোচ্চ রানের জুটি তো হয়ে যায় ঠিকই। ২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে তামিম-জুনায়েদ সিদ্দিকীর ২০০ ছাড়িয়ে। আর এ বছরের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রামে মমিনুল-লিটন দাশের ১৮০ ছাপিয়ে বাংলাদেশের চতুর্থ উইকেট জুটির চূড়ায় এখন কালকের মমিনুল-মুশফিকের ২৬৬।

এক জুটিই ২৬৬ রানের অথচ বাংলাদেশের আগের চার টেস্টের আট ইনিংস মিলিয়ে সর্বোচ্চ জুটি ছিল মোটে ৫৯ রানের! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে তামিম-সাকিব জুড়েছিলেন সে রান। এর বাইরে এ সময়কালে বাংলাদেশের পঞ্চাশ পেরোনো জুটি আর তিনটি। ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে নুরুল হাসান ও রুবেল হোসেনের ৫৫, দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সাকিব-মুশফিকের ৫৪ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে লিটন-ইমরুলের ৫৬। ব্যস!

কাল দুই ইনিংসের এক জুটিতে কিভাবেই না ভোজবাজির মতো সব পাল্টে দিলেন মমিনুল-মুশফিক! তাতেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোড়োবাড়ি হয়ে যায় বিয়েবাড়ি; ধ্বংসবাঁশির সুর বদলে যায় সৃষ্টির ঝঙ্কারে। সাম্প্রতিক সব বিসর্জনের আবর্জনা পেছনে ফেলে এখন তাই আবার অর্জনের হাতছানি।

ক্রিকেট, আহ্ ক্রিকেট!



মন্তব্য