kalerkantho



যেন হঠাৎ করেই ঘনিয়ে এলো অন্ধকার

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যেন হঠাৎ করেই ঘনিয়ে এলো অন্ধকার

ক্রীড়া প্রতিবেদক : এভাবে যে হুট করে ঘনিয়ে আসবে আষাঢ়সন্ধ্যা, ভাবা যায়নি। এভাবে যে ব্যর্থতার মিছিলে পোস্টার হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন সব্বাই—সাধারণ ক্রিকেটচিন্তায় অচিন্তনীয় ছিল তা। টানা চার টেস্টের আট ইনিংসে যে দুই শ পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ! যেখানে এক-দুয়ের না, ব্যর্থতা সব ব্যাটসম্যানের। সবারই যেন ‘এক ক্ষুরে মাথা মুড়ানো’।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের আগে ওই ব্যাটিংটাই যে বাংলাদেশের পরিকল্পনার বড় অংশ জুড়ে থাকছে, তা না বললেও চলছে।

বছরের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে রান এসেছে জলোচ্ছ্বাসের মতো। প্রথম ইনিংসে ৫১৩ করার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে পাঁচ উইকেটে ৩০৭ রানে। দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি মমিনুল হকের। মুশফিকুর রহিম (৯২), মাহমুদ উল্লাহ (৮৩*) ও লিটন দাশের (৯৪) আরো তিনটি ইনিংস ছিল সেঞ্চুরির সৌরভ মাখা। এ তিনের সঙ্গে হাফসেঞ্চুরি তামিম ইকবালেরও (৫২)। এক টেস্টেই এত কিছু অথচ পরের চার টেস্টের আট ইনিংস মিলিয়ে দুজনের মোটে পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংস—সাকিব আল হাসান ও নুরুল হাসানের। দলীয় রান আটকে যায় ১১০, ১২৩, ৪৩, ১৪৪, ১৪৯, ১৬৮, ১৪৩ ও ১৬৯ রানে। বছরের একেবারে প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে ১৭৬ রানের ইনিংস খেলেন মমিনুল, দল হিসেবেও সর্বশেষ আট ইনিংসে তা করতে পারেনি বাংলাদেশ। ভাবা যায়!

এ অন্ধকার যাত্রায় কোনো ব্যাটসম্যানকে ব্যতিক্রমের ব্র্যাকেটবন্দি করার উপায় নেই। একজনও না। ওপেনিং থেকে শুরু করুন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের একাদশে ছিলেন না ইমরুল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের পর সুযোগ পান জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে। এ দুই ম্যাচের চার ইনিংসে তাঁর রান ১৯, ১৭, ৫ ও ৪৩। সাকল্যে ৮৪। গড় ২১। সিলেট টেস্টে তাঁর ওপেনিং সঙ্গী লিটন দাশ একাদশে ছিলেন চার ম্যাচেই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিডল অর্ডারে, সর্বশেষ তিন ম্যাচে ওপেনারের ভূমিকায়। কিন্তু রানের সঙ্গে তাঁর ব্যাটের আড়ি ভাঙেনি। ২৫, ১২, ২৫, ২, ১২, ৩৩, ৯ ও ২৩ রানের আটটি ইনিংস লিটনের। খেয়াল করে দেখুন, অন্তত চারটি ইনিংসে তাঁর শুরুটা মন্দের ভালো কিন্তু পরে সেগুলো বড় স্কোরে রূপান্তরের ব্যর্থতা।

তিন নম্বরে মমিনুলের রানখরা আরো পীড়াদায়ক। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রামে এক টেস্টেই ১৭৬ ও ১০৫ রানের দুটি চোখধাঁধানো ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যান পরের চার টেস্টের আট ইনিংস মিলিয়েও পারেন না ১০০ রান করতে। ০, ৩৩, ১, ০, ০, ১৫ রানের পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১১ ও ৯ রানের দুটি ইনিংস। মোট রান মোটে ৬৯। রানগড়ে ডন ব্র্যাডম্যানের পরের জায়গাটির জন্য লড়াইয়ে থাকা মমিনুলের এ সময়কালের গড় ৮.৬২!

মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটিংয়ের আলো আরো নিভু নিভু। সর্বশেষ চার টেস্টে মমিনুলের চেয়ে ১১ রান কম তাঁর। ১৭, ৬, ০, ১৫, ০, ৪, ০, ১৬— মাহমুদের এ সময়ের ব্যাটিংয়ের আমলনামা। আট ইনিংসের মধ্যে এক অঙ্কে আউট পাঁচবার, রানের খাতা খোলার আগে তিনবার, সর্বোচ্চ ১৭—পরিসংখ্যানের প্রতিটি পাতাই ব্যর্থতার কালিতে লেখা। মোট ৫৮ রান এবং ৭.২৫ গড়ও বিব্রতকর ভীষণ। আর যখন জানবেন, প্রথম ও শেষ টেস্টে অধিনায়ক ছিলেন, তখন মাহমুদের অস্বস্তি বাড়বে বহুগুণে।

টেস্টে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে স্বীকৃত মুশফিকের অবস্থাও তথৈবচ। রানের জন্য হাঁসফাঁস তাঁরও। সর্বশেষ আট ইনিংস ১, ২৫, ০, ৮, ২৪, ৩১, ৩১ ও ১৩ রানের। লিটনের মতো শুরু পেয়ে বড় স্কোর না করার দোষে দুষ্ট তিনি। আট ইনিংসে ১৬.৬২ গড়ে ১৩৩ রানের পরিসংখ্যান মুশফিককে আত্মদহনে না পুড়িয়ে পারে না। সিলেট টেস্টে খেলা বাকি স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান নাজমুল হোসেন। গত বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সতীর্থদের ইনজুরি মিছিলে আচমকা টেস্ট অভিষেক হওয়ার অনেক দিন পর ফিরলেন সাদা পোশাকে। কিন্তু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সে প্রত্যাবর্তন সুখের হয়নি মোটেও। ৫ ও ১৩ রানের দুটি ইনিংসে মোটে ১৮ রান, গড় ৯। তাঁর প্রতিভায় রাখা টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার মর্যাদা দিতে পারেননি তাই। ঢাকা টেস্টের একাদশে জায়গা খুইয়ে এর মাসুল চুকাতে হতে পারে নাজমুলের।

ইনজুরির কারণে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে নেই তামিম ও সাকিব। যতক্ষণ ছিলেন এ সময়কালে, সতীর্থদের সঙ্গে আকাশ-পাতাল প্রভেদও নেই। সাকিবের ব্যাট থেকে তা-ও একটি ফিফটি এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। তবু দুই টেস্টের চার ইনিংস মিলিয়ে ‘সেঞ্চুরি’ হয় না। ৯৮ রান করেন ২৪.৫০ গড়ে। তামিম টেস্ট খেলেন একটি বেশি; রান ২৮ কম। ৪, ২, ৪, ১৩, ৪৭ ও ০ রানের ছয় ইনিংসে মোট রান ৭০। গড় ১১.৬৬। তাঁদের বাইরে স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ছিলেন সাব্বির রহমান। সেখানে দুই ইনিংস মিলিয়ে তাঁর ১ রান। গড় তাই ‘অর্ধেক’ রান!

হুট করে ঘনিয়ে আসা এই আষাঢ়সন্ধ্যা সন্ধ্যাপ্রদীপের আলোয় দূর করার চ্যালেঞ্জ এখন ব্যাটসম্যানদের। ঢাকা টেস্টে তা যদি করতে না পারেন, তাহলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওপরই যে আষাঢ়ের অমাবস্যা নেমে আসার আশঙ্কা! জিম্বাবুয়ের কাছে দুই টেস্টেই হার? অতটা ভাবতেও পারছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট!



মন্তব্য