kalerkantho


ধন্যবাদ রাজিন সালেহ

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ধন্যবাদ রাজিন সালেহ

টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে বাংলাদেশ তবে তখনো টেস্ট খেলা হয়নি। সেই সময়েই সাবেক ক্রিকেটার রফিকুল আলম এমন এক পর্যবেক্ষণ নিয়ে হাজির হলেন, যেটিকে কেউ ঠিক পাত্তা দিতে চাইছিলেন না। পাত্তা দেওয়ার মতো অবস্থাও তখন নয়। আরো তিন বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত রাজিন সালেহকে যে তিনি তখন ‘এশিয়ার সেরা ফিল্ডার’ বলছিলেন!

আশ্চর্যের ব্যাপার ২০০০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্কোয়াডে থেকেও খেলার সুযোগ না পাওয়া ব্যাটসম্যান রাজিনের নাম ঠিকই স্কোরকার্ডে লেখা হয়ে গিয়েছিল। বদলি ফিল্ডার হিসেবে নেমে নাঈমুর রহমানের বলে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ধরেছিলেন শচীন টেন্ডুলকারের ক্যাচ। নাইট ওয়াচম্যান মুরালি কার্তিকের ক্যাচও ধরেছিলেন একই বোলারের বলে। এর ১৮ বছর পর কাল যখন ক্রিকেট ক্যারিয়ারে দাঁড়ি টেনে দিলেন রাজিন, তখন সুদূর মার্কিন মুলুকে বসে নিজের দুই দশক আগের দূরদর্শিতায় আপ্লুত হতেই পারেন রফিকুল। সবাই এখন এক বাক্যে যা মানছেন, তাতে এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে রফিকুলের ওই সময়ের পর্যবেক্ষণে কিছুটা অতিরঞ্জন থাকলেও তা কিছুতেই সত্যের অপলাপ ছিল না। টেস্ট ক্রিকেটের ‘অ, আ, ক, খ’ শেখার পর্যায়ে ফিল্ডিংয়ের গুরুত্ব বোঝা প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার রাজিনই ছিলেন।

ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তাই ফিল্ডিংও অনুশীলন করতেন মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে। ভালো ফিল্ডিং করতে আবার ফিটনেসও হওয়া চাই উঁচুদরের। তাই সেই সময়ের রাজিনকে নিয়মিতই ব্যায়ামেও নিবিষ্ট থাকতে দেখা যেত। এমনকি সেটি ম্যাচ চলাকালীনও। আউট হয়ে ফেরার পর কদাচিৎই সেই সময়ের রাজিনকে বসে থাকতে দেখা গেছে। বাউন্ডারি দড়ির বাইরে দেখা গেছে একের পর এক পুশ-আপ দিয়েই চলেছেন রাজিন। সেই সময়ে তো আর জিম বলে কিছু বাংলাদেশের ক্রিকেট অভিধানে ছিল না। যখন এসেছে, তত দিনে রাজিন ব্যায়ামপুষ্ট শরীর নিয়ে শুদ্ধতম ব্যাটিংয়ের প্রতীকও হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।

পেরেছিলেন বলেই সমসাময়িক প্রায় সবার হারিয়ে যাওয়ার বহু বছর পরও ব্যাট হাতে নেমেছেন তিনি। জীবনের শেষ ইনিংসে কাল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও আউট হলেন ৮৭ রানে। কক্সবাজারে ঢাকার বিপক্ষে সিলেটের অধিনায়ক অফস্পিনার শুভাগত হোমকে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে মারতে গিয়ে বোল্ড হন। তার আগে প্রথম ইনিংসেও আছে ৬৭ রানের নক। দুয়েমিলে ম্যাচসেরা হয়ে ক্যারিয়ারের ইতি টানা রাজিনের আন্তর্জাতিক অভিষেকের আগেই প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাঈমুর। রাজিনের খেলা ছাড়ার সময়ে তিনি সংসদ সদস্য হয়ে পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। ২০০৪ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের চোটে হুট করেই নেতৃত্ব পাওয়া তাঁর ডেপুটি বছর দুয়েক ধরেই নিজের অবসরবিষয়ক পরামর্শ চাচ্ছিলেন বর্তমান নির্বাচকের কাছে, ‘গত দুই বছর ধরেই আমার সঙ্গে কথা হতো। খেলা ছাড়বে কি ছাড়বে না, তা নিয়ে। আমি চাইতাম ওর যা অভিজ্ঞতা, সেটি নতুনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করুক।’ সেই অনুরোধ রেখে আরো দুই বছর দিব্যি চালিয়ে যাওয়া রাজিন বিদায়বেলায়ও কিছুটা আক্ষেপ চেপেই গেলেন, ‘আফসোস রয়ে গেল শেষ ইনিংসে সেঞ্চুরি না পাওয়ার।’ তবে অনন্ত আক্ষেপ বোধ হয় এটিই যে, ‘আরো ভালো হতে পারত ক্যারিয়ার। বাংলাদেশ দলকে আরো কিছু ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারতাম হয়তো। ২০০৮-এ ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। শেষটা হতে পারত ২০১৪-১৫ সালেও।’ তা না হলেও তিনি ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত রেখে গেছেন পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর আত্মনিবেদনের অনুকরণীয় সব নজির।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনাধুনিক সময়ের ব্যায়ামবীর আধুনিক কালেও দেখিয়েছেন শুদ্ধতায় টিকে থাকার প্রতিজ্ঞা। নতুন প্রজন্মের সামনে সে উদাহরণ রেখে যাওয়ার জন্যও তো আলাদা করে ধন্যবাদ প্রাপ্য রাজিন সালেহর!



মন্তব্য