kalerkantho


আজই...

তামিমের সঙ্গী কি পাওয়া গেল?

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

২৪ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



তামিমের সঙ্গী কি পাওয়া গেল?

ছবি : মীর ফরিদ, চট্টগ্রাম থেকে

তাঁর ব্যাটে বরাবরই প্রজাপতির ডানার শত রং। লাল-নীল-সবুজ-হলুদে রানোৎসবের আবাহন। সে আবেশে বিহ্বল বাংলাদেশ, হতবিহ্বল সব প্রতিপক্ষ। হলেই বা কী! অন্য প্রান্তে যে সে রঙের ছোঁয়া লাগে না! সেই কারণে জমে ওঠে না বাংলাদেশের ওপেনিং জুটিও। তামিম ইকবালের ব্যাটের রঙিন প্রজাপতি তাই যেন মন খারাপ করে উড়তে থাকে শুয়োপোকা সঙ্গীদের ডানা ভাঙা স্থবিরতায়।

আর সেই তামিম যখন ইনজুরির কারণে ছিটকে যায়, তখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সদর-অন্দরের অবস্থাটা ভাবুন। ওপেনিং জুটি নিয়ে অন্তহীন দুশ্চিন্তাটা তখন রীতিমতো আতঙ্কে রূপান্তরিত। অথচ কী আশ্চর্য, তামিমের অনুপস্থিতিই যেন দায়িত্ববোধে পরিণত করে তোলে সঙ্গীদের। ক্রিকেট জীবনচক্রে শুয়োপোকা থেকে তারা প্রজাপতি হয়ে যায় মুহূর্তে। পর পর দুই ম্যাচে দুই ওপেনার লিটন দাস ও ইমরুল কায়েসের সেঞ্চুরি সে বার্তাই তো দিচ্ছে!

ক্রিকেটমহলের রসিকতাটা তাই শোনা যায় কান না পাতলেও—ইনজুরি থেকে ফিরে ওপেনিংয়ে ফিরবেন কিভাবে তামিম!

রসিকতা। স্রেফ রসিকতা। ওপেনার হিসেবে তামিমের জায়গা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই কোনো। কিন্তু বিশ্বকাপ প্রস্তুতি পর্বে তাঁর সঙ্গী হওয়ার লড়াইটা জমজমাট করে তুলেছেন ওই দুজন। লিটন ও ইমরুল। দুই ম্যাচ আগেও বিজ্ঞাপন দিয়ে ওপেনার খোঁজার মতো অবস্থা যে বাংলাদেশের, সেই দলের দুজন কিনা পারফরম্যান্স দিয়ে হাত তোলেন এভাবে! এমন মধুর সমস্যায় কত কত দিন পড়েনি বাংলাদেশের নির্বাচক, অধিনায়ক, কোচ!

ওপেনার খুঁজে পেতে কী কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে গেছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল, সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে তা। সর্বশেষ চার ম্যাচে ভিন্ন চারটি ওপেনিং জুটি। প্রতিটিতেই লিটন, প্রতিবারই বদলেছে সঙ্গী। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচে ইমরুল। আগের ম্যাচে এশিয়া কাপ ফাইনালে মেহেদী হাসান মিরাজ। তার আগের খেলায় পাকিস্তানের বিপক্ষে সৌম্য সরকার। আর আফগানিস্তানের বিপক্ষে নাজমুল হোসেন। পরিধি আরেকটু বাড়িয়ে পুরো বছরের হিসাব দেখুন। এ বছর খেলা ১৫ ওয়ানডেতে সাতটি ভিন্ন ওপেনিং জুটি নিয়ে খেলেছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ চার ম্যাচে যেমন লিটনের অপরিহার্য উপস্থিতি, অন্য তিনটিতে তামিমের। সে তিনে তাঁর সঙ্গী এনামুল হক, মোহাম্মদ মিঠুন ও লিটন। এই যে বারবারের পরিবর্তন, সে তো

 সার্চলাইট দিয়ে তামিমের সঙ্গী খোঁজার জন্যই। অবাক কাণ্ড, শেষ পর্যন্ত সেই সন্ধান পর্ব সমাপ্তির প্রতিশ্রুতি ওই বাঁহাতি ওপেনারের ইনজুরির পর!

বছরের শুরুতে মূল চেষ্টা ছিল এনামুলকে দিয়ে। প্রায় তিন বছর পর ওয়ানডে দলে ফেরানো হয় তাঁকে। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম চার ম্যাচ খেলানো হয় টানা। কিন্তু তাতে ১৯, ৩৫, ১, ০ রান করে আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি এনামুল। তবে তাঁর ওপর আস্থাও হারায়নি বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের ফাইনালে মিঠুন (১০) ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের তিন ম্যাচেই আবার এনামুল। কিন্তু এবারও তো ব্যর্থতার মিছিল তাঁর ব্যাটে। করেন ০, ২৩, ১০ রান। আর কত! এশিয়া কাপের স্কোয়াড থেকে তাই বাদ পড়েন তিনি।

এরপর নির্বাচক ও টিম ম্য্যানেজমেন্ট আশা নিয়ে আলো ফেলে লিটনের ওপর। প্রতিভার অনুবাদ পারফরম্যান্সে কিছুতেই করতে পারছিলেন না যিনি। এশিয়া কাপের শুরুটাও খুব একটা আশা জাগানিয়া নয়। ০, ৬ ও ৭ রানের তিন ইনিংসের পর বাদই পড়ার কথা। তামিম না থাকায় রক্ষা। এই ফরম্যাটে আগের সেরা ৩৬ রান টপকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৪১ করলেও তা ভরসা করার মতো না। সেই লিটনই ভরসার পাত্র হয়ে ওঠেন ফাইনালের এক বিস্ফোরক ইনিংসে। ১১৭ বলে ১২১ রানের ইনিংসটি তাঁর ক্যারিয়ারসেরা তো বটেই, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা।

তামিমের অনুপস্থিতিতে তরুণ ওপেনার নাজমুলকে দিয়ে চেষ্টা হয় এক দফা। টানা তিন ম্যাচ সুযোগ দেওয়া হলেও তা দুই হাতে নিতে পারেননি। এশিয়া কাপের ৭, ৭ ও ৬ রানের তিন ইনিংসের পর বাদ তিনি। দেশ থেকে উড়িয়ে নেওয়া সৌম্যকে ওপেনিংয়ে পাঠানো হয় পাকিস্তানের বিপক্ষে। কিন্তু রানের খাতা খোলার আগেই তিনি আউট। ‘আউট’ হয়ে যান তাই ওপেনিং পজিশন থেকে। ফাইনালে সবাইকে চমকে লিটনের সঙ্গী হিসেবে খেলানো হয় মেহেদীকে। ১২০ রানের দুর্দান্ত ওপেনিং জুটি গড়েন, যেখানে ৩২ রান ওই মেকশিফট ওপেনারের। কিন্তু এটি তো আর স্থায়ী সমাধান নয়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাই আবার ওপেনিংয়ে ফেরানো হয় পুরনো সৈনিক ইমরুলকে। তাতে কী সফলই না তিনি! এক বছর পর প্রিয় পজিশনে প্রত্যাবর্তনে খেলেন ১৪০ বলে ১৪৪ রানের ইনিংস।

সমস্যার জায়গাটা হঠাৎই ‘মধুর সমস্যা’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় ভীষণ খুশি মাশরাফি বিন মর্তুজা। কাল চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সেই তৃপ্তির রেশ বাংলাদেশ অধিনায়কের কণ্ঠে, ‘তামিম না থাকার পরও পর পর দুই ম্যাচে দুজন ওপেনার সেঞ্চুরি করেছে। এটা অনেক বড় পাওয়া। কারণ এ জায়গায় আমরা অনেক দিন থেকে ভুগছিলাম। এখন পর পর দুই ম্যাচে ওপেনাররা সেঞ্চুরি করল। এটা খুব ইতিবাচক দিক।’

লিটন ও ইমরুলের এখনকার দ্বৈরথটা আবার ভিন্ন। তামিমের অনুপস্থিতিতে নিজেদের দাবি যতটা সম্ভব জোরালো করা। আজ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লড়াইয়ের মাঝে অলক্ষ্যে বাজবে ভিন্ন এক লড়াইয়ের সুর। লিটন ও ইমরুলের ভেতর। আহা, এমন কিছুর জন্য কত দিনের অপেক্ষা বাংলাদেশের! আরো বেশি করে হয়তো তামিম ইকবালের!

তাঁর সঙ্গী খোঁজার অভিযানে কতজনেরই তো অডিশন নিয়েছে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট—এনামুল, মিঠুন, সৌম্য, লিটন, ইমরুল। তাতে পাস মার্ক শেষ দুজনের। শেষ দুই ম্যাচের সেঞ্চুরিতে। নিয়মিত ওপেনার না থাকায় যে মেঘের ভয় ভর করেছিল বাংলাদেশ ক্যাম্পে, সেখানেই এখন কিনা চাঁদের আলো। তামিমের প্রত্যাবর্তনের পর ওপেনিং জুটিতে প্রজাপতির রঙ ছড়ানোর প্রত্যাশায় তাই হয়তো আর বাড়াবাড়ি নেই কোনো।



মন্তব্য