kalerkantho


১২৭ রানের জুটি

একার কাঁধে দলকে বইলেন ইমরুল

সামীউর রহমান   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



একার কাঁধে দলকে বইলেন ইমরুল

ছবি : মীর ফরিদ

প্রথম পঞ্চাশে পৌঁছতে সাবধানী, লাগিয়েছেন ৬৪ বল। পরের পঞ্চাশ করলেন ৫৪ বলে। ১১৮ বলে ৮ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় ক্যারিয়ারের তৃতীয় শতক। একটা সময় ১৩৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন ধুঁকছে তখন সাইফউদ্দিনকে নিয়ে ১২৭ রানের জুটি। তাতেই রানটা চলে যায় জিম্বাবুয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

 

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বয়স এক দশক হলেও জাতীয় দলে স্থায়ী নন তিনি। এই আছেন, এই নেই। এই আসা-যাওয়ার মাঝেই নিজের চিহ্ন এঁকে যান ইমরুল কায়েস। গতকাল মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে যেমন তাঁর সেঞ্চুরিতেই ‘প্রাণ’ পেয়েছে বাংলাদেশ।

অভিষেক ২০০৮ সালের অক্টোবরে। মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদের মাত্র এক বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেছেন ইমরুল। মাহমুদ যেখানে সিঁড়ি বেয়ে নেতৃত্বের সোপানে উঠে গেছেন, ইমরুল সেখানে আড়ালের মানুষ। ওপরে উঠবেন কী, নিজের পায়ের নিচের জমিটাই যে এখনো খুঁজে ফিরছেন ১৬৩ ওয়ানডে আর ৩৯টি টেস্ট খেলে ফেলা এই বাঁহাতি

উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। অথচ ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন ইমরুল, ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে।

সামান্য ছুতোতেই নির্বাচকরা কোপটা বসান ইমরুলের ওপরে। তাঁর জায়গায় সুযোগ দেওয়া হয় তরুণ কোনো প্রতিভাবানকে। সেই ধূমকেতুর অকাল বিদায়ে ফের ইমরুল-শরণ! সেখানে মেহেরপুরের ছেলেটি কখনো সফল, কখনো ব্যর্থ। কিন্তু ইমরুলের ব্যর্থতাটাই সবাই মনে রাখে, সাফল্যটা ভুলে যায় দ্রুতই। ২০১১ বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ সেরার পুরস্কারজয়ী তিনি বাদ সে বছরের শেষেই। বাঁহাতি তামিম ইকবালের সঙ্গে ডানহাতি ব্যাটসম্যানের সমন্বয় করতে ইমরুলের বদলে এনামুল হক, নাজিমউদ্দিন, শামসুর রহমান, জহুরুল ইসলামসহ অনেককেই পরখ করেছেন কোচ আর নির্বাচকরা। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলার পর আবার রঙিন পোশাকে জাতীয় দলে ডাক পান ২০১৪ সালের মার্চে। ফেরার ম্যাচটি হাফসেঞ্চুরি দিয়ে উদ্যাপন করলেও এরপর টানা সাত ইনিংসে আউট হয়েছেন দুই অঙ্কের নিচে। টানা খারাপ করে যাওয়ায় শুরুতে ২০১৫ বিশ্বকাপের দলে জায়গা পাননি। এনামুল হক চোট পেলে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইমরুলকে।

চন্দিকা হাতুরাসিংহের চোখে ততক্ষণে লেগে গেছে সৌম্য সরকারের মায়াঞ্জন। সৌম্য সেই যুক্তিতে খারাপ ফর্ম নিয়েও অনেক দিন সুযোগ পেয়ে গেছেন। ইমরুল তাই আবারও দলের বাইরে। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের যে সোনালি অধ্যায়; ঘরের মাঠে ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইতিহাস গড়ে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের গৌরবগাথায় ইমরুল ছিলেন অনুপস্থিত। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটায় সৌম্য বাদ পড়লেন চোটের কারণে, সেই সুযোগেই ইমরুলের দলে ফেরা। দলে থাকলেও একাদশে সুযোগ পাননি প্রথম ম্যাচে, সৌম্যর জায়গাটা নিয়েছিলেন লিটন দাশ। কিন্তু প্রথম ম্যাচে লিটন শূন্য রানে আউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তাঁর জায়গায় ইমরুল। সাত মাস পর দলে ফিরেই টানা দুই ম্যাচে ৭৩ আর ৭৬ রানের ইনিংস খেললেন। এমন পারফরম্যান্সের পরও পরের ম্যাচটি খেলতে লেগে গেল এক বছর। ২০১৫-র নভেম্বরের পর ২০১৬-র সেপ্টেম্বরে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে। তত দিনে সৌম্য ফিরে এসেছেন, ইমরুলকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে ওয়ান ডাউনে। সৌম্য প্রথম ওয়ানডেতে শূন্য রানে আউট হলেও খেললেন পুরো সিরিজ, ইমরুল ৩৭ রান করলেও একাদশে জায়গা পাননি পরের দুই ম্যাচে।

সেপ্টেম্বর গিয়ে অক্টোবর, বাংলাদেশে এসেছিল ইংল্যান্ড। প্রথম ওয়ানডেতে ইংরেজদের ৩০৯ রান তাড়ায় ইমরুলের লড়াকু সেঞ্চুরি। পানিশূন্যতায় পেশির টান নিয়েও লড়াই চালিয়ে দলকে জয়ের দিশা দেখিয়েছিলেন ইমরুল, সাকিব আল হাসানের সঙ্গে হয়েছিল ১১৮ রানের জুটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ২০১০ সালে ক্রাইস্টচার্চে করেছিলেন প্রথম শতরান, পরেরটা ছয় বছর পর ২০১৬ সালে। দুটি ম্যাচই হেরেছিল বাংলাদেশ।

সদ্য সমাপ্ত এশিয়া কাপেও শুরুতে দলে ছিলেন না ইমরুল। তামিমের চোটের পর অনভিজ্ঞ নাজমুল হোসেন শান্তর ওপর ভরসা রাখতে পারেনি বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট। জরুরি বার্তা পাঠিয়ে হাই পারফরম্যান্স দলের হয়ে খেলার মাঝপথেই ইমরুলকে উড়িয়ে নেওয়া হয় দুবাই। খুলনা-ঢাকা-দুবাই-আবুধাবি; লম্বা যাত্রার ধকল সামলে প্রায় এক বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে চিরাচরিত ওপেনার বা ওয়ান ডাউন পজিশনের বদলে ছয়ে ব্যাট করতে নেমে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮৯ বলে ৭২ রানের ইনিংস!

এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে ইমরুলকে একাদশে দেখেও শুরুতে খানিকটা বিস্ময় অনেকের। তরুণদের পরখ করে নেওয়ার এই সিরিজে, তামিমের অনুপস্থিতিতে ঘরের মাঠে লিটনের সঙ্গে নাজমুলের নামাটাই ছিল অনেকের প্রত্যাশাজুড়ে। শুরুতে একাদশে ইমরুলের নাম থাকার বিস্ময়টাই স্থায়ী হয়ে ছিল বাংলাদেশের ইনিংসের ৪৯তম ওভার পর্যন্ত। একদিকে দাঁড়িয়ে দেখেছেন প্রতিভাবান তরুণ আর অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠদের অকাল বিদায়, কিন্তু নিজে জমি ছাড়েননি এক ইঞ্চিও। তাইতো নামের পাশে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। প্রথম পঞ্চাশে পৌঁছতে সাবধানী, লাগিয়েছেন ৬৪ বল। পরের পঞ্চাশ করলেন ৫৪ বলে। ১১৮ বলে ৮ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় ক্যারিয়ারের তৃতীয় শতক। একটা সময় ১৩৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন ধুঁকছে তখন সাইফউদ্দিনকে নিয়ে ১২৭ রানের জুটি। তাতেই রানটা চলে যায় জিম্বাবুয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

বারবার তাঁকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে বাতিলের খাতায়। কিন্তু প্রত্যেকবারই ইমরুল পুনরুদ্ধার করেছেন হারানো জায়গাটা। দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রতিভার ঝলকানি উজ্জ্বল হলেও ক্ষণস্থায়ী আর পরিশ্রমের লণ্ঠনটা টিমটিম করে জ্বললেও অন্ধকার রাতে সেটাই হয়ে যায় আলোর মশাল।

 

 



মন্তব্য