kalerkantho


ঝুঁকি নেওয়াতেও সতর্ক বাংলাদেশ

নোমান মোহাম্মদ   

২১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ঝুঁকি নেওয়াতেও সতর্ক বাংলাদেশ

‘এই ম্যাচের ফলাফলটা গৌণ। ছেলেরা যেভাবে খেলেছে, তাতে আমি ভীষণ উচ্ছ্বসিত। এই ধারায় খেলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল।’

কথাটি লিওনেল স্কালোনির। আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের কোচের। তাঁর এই মন্তব্য ব্রাজিলের কাছে দিনকয়েক আগের প্রীতি ম্যাচে হারের পর। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হারের পরও এমন কথা বলতে পারেন তিনি! ব্রাজিলের কাছে হারের ফলও কিনা আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচের কাছে গৌণ। ভাবা যায়!

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল মহারণের পাশে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দ্বৈরথ নিশ্চয়ই বড্ড ম্যাড়মেড়ে। কিন্তু ওই যুদ্ধ যুদ্ধ সাজের লড়াইয়েও আর্জেন্টিনা কোচের যেভাবে ভবিষ্যতের সুলুকসন্ধানের সুযোগ রয়েছে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আজ থেকে শুরু হওয়া সিরিজে বাংলাদেশের কি তা আছে? আট মাস পরের বিশ্বকাপে সবার পাখির চোখ। ইংল্যান্ডের সেই আসরের আগে বাংলাদেশের চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানে এই সিরিজের চেয়ে ভালো সুযোগ আর কোথায়! কিন্তু তা করতে গিয়ে পরাজয়ের ঝুঁকি নেওয়ার মতো ক্রিকেট সংস্কৃতি কি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে? তিন ওয়ানডে কোনোটি হারের পর মাশরাফি বিন মর্তুজা কিংবা স্টিভ রোডস কি স্কালোনির মতো বলতে পারবেন, ‘এই ম্যাচের ফলাফল গৌণ’?

এখানে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের গানের শরণ নেওয়ায় বাড়াবাড়ি নেই কোনো, ‘প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।’

স্কালোনি অমনটা বলতে পারেন, কারণ তিনি শুধু ‘একটি ম্যাচ’ই দেখেননি। দেখেছেন ক্যানভাসটা বড় করে। বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টেরও ওই বড় ক্যানভাসে চোখ রয়েছে সত্যি। তবে জিম্বাবুয়ের কাছে কোনো ম্যাচ হেরে গেলে যে ‘গেল গেল’ শোরগোল উঠবে—তাও জানেন ভালো করে। জানেন বলেই এমন প্রশ্নের উত্তরে কাল কিছুটা অসহায়ই শোনায় অধিনায়ক মাশরাফিকে, ‘আমরা হয়তো নতুন চার ক্রিকেটারকে খেলিয়ে দিলাম। হারি কিংবা জিতি সেটা তো দেখতে চাই-ই। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিতে এটা সবাই কিভাবে নেবে, তার গুরুত্ব অনেক। কারণ হারটা আমরা খুব সহজে নিতে পারি না। এটা দল নির্বাচনের সময় চিন্তায় থাকে। আলোচনা না হলেও মনে মনে এই ব্যাপারটা থাকেই।’ থাকে বলেই টিম ম্যানেজমেন্টে যে দ্বিধার স্রোত বহমান, তা স্বীকারেও অকপট অধিনায়ক, ‘অন্য অনেক দলে যাকে দলে নেয়, তাকে বাজিয়ে দেখতে চায়। তাতে দল হারুক বা জিতুক। আমাদের ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিধা থাকে। তবে আমার মনে হয়, সে ক্রিকেট সংস্কৃতি একটু একটু করে বদলাচ্ছে।’ সেই বদলে সবাইকে শরিক হওয়ার আহ্বান মাশরাফির কণ্ঠে, ‘যাকে দেখতে চাই, আশা করি আমরা তাকে সুযোগ দেব। আপনারা (গণমাধ্যম) কিংবা সাধারণ মানুষও যেন ওই সময়টা দেয়। সবার বুঝতে হবে ঘরোয়া ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এক না। দেখুন, ফজলে রাব্বি ঘরোয়াতে কত রান করেছে কিন্তু গতকাল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কিছুটা হলেও নার্ভাস ছিল। ওকে থিতু করতে হলে কিছুটা সময় তো দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তরিক হতে হবে সবাইকে।’

ক্রিকেট সংস্কৃতির সে জায়গাটা তৈরি হলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটি বাংলাদেশের জন্য হতে পারত যথার্থ গবেষণাক্ষেত্র। ওয়ানডে দলের সমস্যাগুলো তো চিহ্নিত, খোঁজা যেত সমাধানের পথ। তামিম ইকবালের ওপেনিং পার্টনার খোঁজার কাজ চলছিল অনেক দিন। এশিয়া কাপ ফাইনালের বিস্ফোরক সেঞ্চুরিতে সে জায়গাটা নিজের করে নিয়েছেন লিটন দাশ। তিন নম্বরের সমস্যার সমাধান হয়েছিল সাকিব আল হাসানে। এ সিরিজে তামিম-সাকিব কেউ না থাকায় টপ অর্ডারের দুটি জায়গায় ব্যাকআপ খেলোয়াড় পরখ করার বড় সুযোগ। লোয়ার মিডল অর্ডারে মারকুটে ব্যাটসম্যানের অভাব পূরণে আরিফুল হক, মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনরা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। পেস বোলিংয়ে মাশরাফি-মুস্তাফিজ-রুবেলের ব্যাকআপ হিসেবেও কেউ এখনো নিশ্চিত নয়। স্পিনে সাকিব ও মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গীর জায়গাটিও অনিশ্চিত। ২০১৯ বিশ্বকাপের ওই শূন্যস্থানগুলো পূরণের জন্য দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের চেয়ে ভালো সুযোগ আর কী হতে পারে!

মাশরাফি সেটি জানেন। মানেনও। সে কারণেই বিকল্প খেলোয়াড়দের বাজিয়ে দেখার কথা বলেন কাল, ‘বিশ্বকাপের কথা বললে সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদদের নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। মুস্তাফিজ, রুবেল, লিটনরাও ভালো করছে। কিন্তু বিশ্বকাপের ভাবনায় কিছু পজিশনের জন্য খেলোয়াড়দের দেখার এটাই সুযোগ। যেমন সাইফুদ্দিন। ফজলে রাব্বিও, কারণ সাকিবের সমস্যা হলে কাউকে না কাউকে তো বাঁহাতি ব্যাটিং-বোলিংয়ের জন্য ভাবতে হবে। এত কম সময়ে বিকল্প তৈরি হবে না। কিন্তু সুযোগগুলো আমাদের নিতে হবে। সে চিন্তা থেকেই ওরা স্কোয়াডে এসেছে।’ বলেও আবার বাস্তবতা যেন মনে পড়ে যায় বাংলাদেশ অধিনায়কের, ‘একই সময়ে এটাও ঠিক আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো হারা যাবে না। আমাদের তাই হিসেবি হতে হবে। একাদশে আস্তে আস্তে এক-দুজন করে হয়তো বা দেখতে হবে আমাদের।’

আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের কোচ স্কালোনি নিশ্চয়ই ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলার আগে হারার জন্য দল তৈরি করেননি। কিন্তু হেরেও তাঁর আপত্তি নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ একাদশও হারের জন্য তৈরি হবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে হারলেও আপত্তি থাকবে না? তা হবে না কিছুতেই। কখনো কখনো ম্যাচের ফলাফলও যে গৌণ হতে পারে—সে ক্রীড়া সংস্কৃতিটাই তো তৈরি হয়নি বাংলাদেশের!

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আপাত অর্থহীন এই সিরিজে সেই দিনবদলের দূরবর্তী সুরটাও কি শোনা যাবে?



মন্তব্য