kalerkantho


ডাউন দ্য উইকেট

ফেসবুক ক্রিকেট

সাইদুজ্জামান

১১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ফেসবুক ক্রিকেট

—ভাই, এটা লিখেন না আবার। আমাকে একদম ধুয়ে ফেলবে!

রাজধানীর নামি একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ঠাট্টা করেই আড্ডার একটি অংশ গোপন করে যেতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। তবে ওই ঠাট্টার আড়ালেই রয়েছে নির্মম একটি সত্য। পান থেকে চুন খসলেই সেলিব্রিটির জীবন অতিষ্ঠ ছিল এত দিন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রমরমা যুগে পান থেকে চুন খসানোরও আর দরকার নেই। যে যাঁর মতো করে একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছেন আর সেটিকে কেন্দ্র করে চারদিকে তোলপাড়!

এমন একটি ইস্যু ধরে সেদিন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান তো সংবাদ সম্মেলনই করে বসেছেন নিজের বাসায়। তাঁকে দোষও দেওয়া যাচ্ছে না। এশিয়া কাপে জোর করে খেলিয়েই সাকিবের সর্বনাশ করেছেন বোর্ড সভাপতি—এমন একটি ধারণা কোথা থেকে যেন সর্বজনস্বীকৃতি পেয়ে যায়। তো, তিনিও একজন মানুষ, সর্বোপরি একজন রাজনীতিবিদও। জাতীয় নির্বাচনের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তিনি কেন অকারণ সমালোচনা গায়ে মাখবেন? সেই সংবাদ সম্মেলনে নাজমুলের আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে সাকিবের তোলা অভিযোগ খণ্ডন করছেন তিনি। অথচ দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সাক্ষাত্কারেও বিসিবির পক্ষ থেকে জোর করে এশিয়া কাপ খেলানোর অভিযোগ তোলেননি সাকিব। এমনকি সংবাদকর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও এ জাতীয় কিছু বলেননি তিনি। সাকিব যদি পরোক্ষে কাউকে দুষেও থাকেন, সেই লোকটি জাতীয় দলের ফিজিও থিহান চন্দ্রমোহন। যুক্তিযুক্ত কারণে তাঁর বিষয়টি খতিয়েও দেখছে বিসিবি। অথচ মাঝখানে বোর্ড সভাপতি বনাম সাকিব এক রাউন্ড হয়ে গেল নিছকই ফেসবুকের ঝড়ে!

জাতীয় দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার সেদিন দুঃখ করে বলছিলেন, ‘ভাই, ফেসবুকটা উঠিয়ে দিলে আমাদের ক্রিকেটে শান্তি ফিরে আসত। আমাদের সবারই এখন ফ্যান পেজ আছে। সেখানে কী কী যে কমেন্ট হয়! আমরাও মানুষ। সব কথা তো হজম করা যায় না।’ একটু বিরতি নিয়ে আত্মসমালোচনাও করেছেন তিনি, ‘দোষ আমাদেরও আছে। ফেসবুক নিয়ে আমরাও বাড়াবাড়ি রকমের ব্যস্ত। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে সেভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারা ক্রিকেটারকেও দেখবেন ফেসবুকে ভীষণ অ্যাক্টিভ। এতে হয় কি, তাদের ফোকাসটা ঠিক থাকে না। আরে, ফেসবুকে ফলোয়ারের সংখ্যা দিয়ে তো আর ক্রিকেট খেলার মান ধরে রাখা যাবে না। নিজেকে কষ্ট করে দলে থাকতে হবে!’

ফেসবুকের প্রতিক্রিয়াই এখন বাংলাদেশ জাতীয় দলের আর্তনাদ। ফেসবুক গোটা সমাজকেই কমবেশি গ্রাস করেছে। তবে ক্রিকেট দলে এর প্রভাবের মাত্রাটা ভিন্ন। দাপ্তরিক কাজে কেউ ফাঁকি দিলে সেটা গোটা সমাজের চক্ষুগোচর হচ্ছে না। কিন্তু মোটে গোটা বিশেক উইকেট নেওয়া তরুণ পেসার যখন ১০ লাখ ফলোয়ার নিয়ে ফেসবুকে তোলপাড় করেন, তখন তা নজরে পড়ে সমাজের সিংহভাগের। ক্ষণে ক্ষণে তাঁর পোস্ট ভাসে ফেসবুকে। দেখে দুঃখ হয়, আহা, এতটা সময় যদি নেটে কাটাতেন তিনি! বেশ কজন উঠতি ক্রিকেটারের পতনের অন্যতম কারণ মনে করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডুবে থাকাকে। তাঁদের অনেকের কাছে সাফল্যের অন্যতম মানদণ্ডই যেন ফেসবুকে ফলোয়ারের সংখ্যা! মাশরাফি বিন মর্তুজার অমর একটি বাণী রয়েছে, ‘ওর খেলা মুখে উঠে গেছে। আর হবে না!’ মুখে উঠে গেছে মানে, মাঠে খেলার চেয়ে কথা বেশি বলা আর কি। তো, সেদিন এক নির্বাচক নতুন উপমা দিলেন, ‘ও তো এখন ফেসবুকে খেলে!’ কোরবানির গরুর ছবি থেকে শুরু করে সেই ক্রিকেটারটির প্রতিদিনের প্রায় সব কর্মকাণ্ডই দৃশ্যমান তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। সেসবে তাঁর ক্রিকেটার হিসেবে উন্নতির ইঙ্গিত নেই, রয়েছে নিছকই স্থূল আত্মপ্রকাশ।

‘উদ্ভিন্ন-যৌবনা’ ফেসবুকের প্রতি আকৃষ্ট জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররাও। সদ্য কলি হয়ে জাতীয় দলে ফোটা ক্রিকেটারেরও ফ্যান পেজ আছে, সেখানে মাশরাফি, সাকিব, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদ উল্লাহর তো থাকবেই। সেসব পেজে তাঁদের হয়ে ব্যাটিং-বোলিং করেন অ্যাডমিনরা। বিশ্বের সব সেলিব্রিটিরই ফ্যান পেজ থাকে। এতে দোষেরও কিছু নেই। তবে ফ্যান পেজের কিছু কিছু পোস্ট দেখে সন্দেহ জাগে, এঁরা আবার নিজেদের বিরুদ্ধে ব্যাটিং-বোলিং করছেন না তো? এশিয়া কাপে ভাঙা আঙুল নিয়ে তামিমের বীরত্বের পরদিন সাকিবের ফ্যান পেজে ঝড়— আঙুলে চোট নিয়ে তো খেলছেন তাদের মহানায়কও। সাকিবের আঙুলে সংক্রমণ নিয়ে ভীতিজাগানিয়া সব খবরের সঙ্গে তাঁর অনুসারীদের হুঙ্কার, ‘তোমরা হেটাররা কি এখনো বলবে যে সাকিব দেশের জন্য না টাকার জন্য খেলে?’

আশ্চর্য! আঙুলে ভয়ানক সংক্রমণ বাধিয়ে সাকিবকে প্রমাণ দিতে হবে যে তিনি দেশের জন্য খেলেন? এক হাতে ব্যাটিংয়ের পরই শুধু দেশপ্রেমিকের স্বীকৃতি পাবেন তামিম? অবশ্য কে না জানে হাঁটুতে সাতটা অস্ত্রোপচার করিয়ে তবেই না ‘দেশপ্রেমিক’ হয়েছেন মাশরাফি। কেন জানি মনে হয়, সাকিবের মতো বিদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নিয়মিত হলে মাশরাফি-তামিমকে আরো অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো ফেসবুক-সমাজে দেশপ্রেমিকের তকমা পেতে। মুশফিক কিংবা মাহমুদ উল্লাহর ভাগ্যে অবশ্য এ জাতীয় তকমা এখনো জোটেনি। যদিও চোট নিয়ে এশিয়া কাপে খেলেছেন তাঁরাও। মাশরাফি তো বলেন, ‘সব তো আর আপনাদের দেখার সুযোগ হয় না। ঘুরে ফিরে সবাই-ই কিছু না কিছু সমস্যা নিয়ে খেলে ফেলে। সবাই-ই চেষ্টা করে।’

তাই ফেসবুকে নিজেদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলা ক্রিকেটারদের প্রায় সবার মনেই এ নিয়ে কমবেশি খেদ আছে। তাঁরা সবাই জানেন, আজ মাথায় তুলে নাচা ফেসবুক-সমাজ হয়তো কালই আছড়ে ফেলবে মাটিতে। আজ দেশপ্রেমিক তো কালই দেশদ্রোহী! সবাই বেমালুম ভুলে যান যে, ক্রিকেট খেলাটাও একটা পেশাই মাত্র। কিছু ভিন্নতা অবশ্য আছে। আমি কিংবা আমাদের অনেকেই অফিস ফাঁকি দিলে বাইরের কারো নজরে পড়ে না। কিন্তু ক্রিকেট মাঠে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই। প্রকাশ্য হয়ে যাবে সব। এর পরও সব দিন এক রকম যায় না কারোরই। আজকের সেঞ্চুরিয়ান পরের ইনিংস শুরু করেন শূন্য থেকে। বোলারের ক্ষেত্রেও তাই। তাই ক্রিকেট মাঠে সবাই-ই শতভাগ দেন, স্বেচ্ছায় কিংবা বাধ্য হয়ে; তা আপনি যেভাবেই দেখুন না কেন। তো, সবার শতভাগ আত্মনিবেদনেই জয় আসে, কখনো সব নিংড়ে দিয়েও হারতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্রিকেট দলের সাফল্যের রেসিপি কিন্তু একই। সবার সেরা নৈপুণ্যেই চলে অগ্রযাত্রা। স্রেফ দেশপ্রেমের কথা ভেবে কেউ দাপ্তরিক কাজে ডুব দেন না। সবার লক্ষ্য থাকে নিজের দায়িত্বটুকু যেন সঠিকভাবে পালন করতে পারেন। তাতে প্রতিষ্ঠানের লাভ হয়, প্রতিষ্ঠান ফুলে-ফেপে উঠলে উপকৃত হয় দেশ। তেমনি, মাঠে মাশরাফিরা নিজেদের সেরাটা মেলে ধরতে পারলেই দল জেতে এবং জিতে যায় বাংলাদেশ। এই সাফল্যের জন্য দেশপ্রেমবিষয়ক বিশেষ কোনো ক্লাস করতে হয় না তাঁদের। ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীতে ঠোঁট মেলানোর সময় তাঁদেরও বুক কাঁপে। ‘আমরা দেশপ্রেমিক’ হুঙ্কার ছেড়ে মাঠে নামতে হয় না তাঁদের।

খুব সহজ কথা, সরল যুক্তি। কিন্তু প্রকাশ্যে এভাবে বলতে রাজি নন খুদে থেকে মহাতারকা ক্রিকেটারও। ফেসবুক তেড়ে আসবে যে!



মন্তব্য