kalerkantho


মরুর দেশে

বদলাচ্ছে অন্য সংস্কৃতিও

মাসুদ পারভেজ, দুবাই থেকে   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বদলাচ্ছে অন্য সংস্কৃতিও

মাংসের ওপর বিচিত্র ভঙ্গিতে লবণ ছিটানোই তাঁর ট্রেডমার্ক। এরই ভিডিও এমন ভাইরাল হয়েছে যে নুসারাত গোরচে পেয়ে গেছেন ‘সল্ট বে’ নিকনেমও। তা এই ‘সল্ট বে’র মহাতারকা গ্রাহকদের কথাও একটু শুনে নেওয়া যাক। দুবাইয়ের জুমেইরাতে তাঁর রেস্টুরেন্ট নুসারাতে এসে টার্কিশ এই শেফের মতো করেই মাংসে লবণ ছিটিয়ে গেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। গত মাসে আসা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোও করেছেন তাই। শুধু খেলার ভুবনই নয়, রুপালি পর্দার মহানায়ক আল পাচিনো এবং লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওরাও নিয়ে গেছেন নুসারাতের স্টেকের স্বাদ।

সেই তুলনায় এমন কোনো তারকাই নন মাশরাফি বিন মর্তুজা, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম কিংবা মাহমুদ উল্লাহরা। কিন্তু নুসারাতের স্টেক চেখে দেখতে তো আর দোষের কিছু নেই। পরশু রাতে আরো জনা ছয়েক তরুণ ক্রিকেটারকে নিয়ে এই চার সিনিয়র হানা দিলেন সেখানেই। যাওয়ার পর নুসারাতের ইনস্টাগ্রাম পেজে ঢুকে মাহমুদ উল্লাহ জানতে পারলেন যে ওই দিন দুপুরেই রেস্টুরেন্টে ছিলেন ‘সল্ট বে’। তাই এই আফসোসও উঠল যে তাঁর সঙ্গে লবণ ছিটানোর ভিডিওটা করা গেল না। করা গেলে আর কোথাও না হোক, বাংলাদেশেও নিশ্চিতভাবেই তা ভাইরাল হতো। যা নিয়মিতই হয় অন্য বৈশ্বিক তারকাদের ক্ষেত্রে।

যা হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা মার্সেলো কিংবা স্পেনের সের্হিয়ো রামোসদের ক্ষেত্রেও। এই দলের অনেকেই বিশেষ করে তামিম অন্তর্জালের দুনিয়ায় সেসব নিয়মিতই অনুসরণ করে এসেছেন। তাই ফ্লোরিডায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ দুটি টি-টোয়েন্টি খেলার পর বাড়তি কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়ই একবার ঢুঁ মেরেছিলেন নুসারাতের রেস্টুরেন্টে। এই টার্কিশ শেফের ছয়-ছয়টি রেস্টুরেন্টের একটি তো নিউ ইয়র্কেও। বলা বাহুল্য সেই অভিজ্ঞতায় এবার দুবাইতে দলেবলে স্টেক খেতে যাওয়ার উদ্যোক্তা তামিমই।

যাঁর পরিচয়টা এখন দুইভাবেই দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ দলের ওপেনার কাম ফুড ম্যানেজার। বিদেশে যেকোনো সফরে সতীর্থদের খাবারের সমস্যার সমাধান যেন তিনিই। কাউকে সস্তায় খাবার খুঁজে দেওয়া থেকে শুরু করে ব্যয়বহুল রেস্টুরেন্টের সন্ধান, সবই তাঁর হাতের মুঠোয়। তবে সবাই মিলে একটু ব্যয়বহুল কিন্তু ভালো মানের রেস্টুরেন্টে যাওয়ার এমন উদ্যোগ আগেও অনেক নিয়েছেন তামিম। তবে সেসবের বেশির ভাগই গত পরশুর মতো এতটা খেলোয়াড়বহুল হয়ে ওঠেনি। এবার যে উঠেছে, তাতেও দল হিসেবে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের অন্য বদলের ইঙ্গিত আছে। সেটি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সংস্কৃতিতে বদলের।

একসময় যে সংস্কৃতি নিয়ে দুর্নাম ছিল অনেক। ২০১৪-র ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ব্যর্থতার পর তো বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের সভায় সিংহভাগ ক্রিকেটারের সস্তায় খাবার খোঁজার ব্যাপারটি সমালোচিত হয়েছিল খুব। হওয়ারই কথা। কারণ সফরে দৈনিক ভাতা তাদের পর্যাপ্তই দেওয়া হয়। বিভিন্ন সময় এটির পাশাপাশি সমালোচিত হয়েছে খেলোয়াড়দের হোটেলরুমেই বন্দি হয়ে থাকার ব্যাপারটিও। ২০১১-র জিম্বাবুয়ে সফরে হেড কোচ স্টুয়ার্ট লয়ের দলবল নিয়ে সাফারিতে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাও ভেস্তে গিয়েছিল এ কারণেই। তখন ভীষণ নাখোশ হয়ে তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নিজের ক্ষোভের কথাও অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছিলেন তিনি। ২০১৩-র জিম্বাবুয়ে সফরে স্পিন বোলিং কোচ সাকলায়েন মুশতাককেও বাংলাদেশ দলের সিংহভাগ ক্রিকেটারের অ্যাডভেঞ্চারে অনাগ্রহ নিয়ে দু-এক কথা বলতে শোনা গিয়েছিল। যাঁদের দিকে সেসব অভিযোগের তীর ছিল, তাঁরাই এখন বদলাতে শুরু করেছেন। হোটেল ছেড়ে বেরোচ্ছেন, ঘুরতেও যাচ্ছেন, আবার দামি রেস্টুরেন্টে বিস্তর খরচ করে খাওয়ার উদ্যোগকে সানন্দে সফলও করছেন।

না হলে কি আর পরশু রাতের অ্যাডভেঞ্চারে ক্রিকেটারের সংখ্যা জনাচারেক না হয়ে জনাদশেক হয়! তরুণ মেহেদী হাসান মিরাজ থেকে শুরু করে আরো অনেকেই মাশরাফি-তামিমদের সঙ্গী। বিপুল ব্যয়েও কারো পিছিয়ে না যাওয়ার নজিরও এটি। নুসারাতে অনেক আগে থেকেই রোনালদোর রিজার্ভ করে রাখা ‘এইজেড বিফ’-এর (বহুদিন ধরে সংরক্ষণ করে রাখা গরুর মাংসপিণ্ড) ছবি ইনস্টাগ্রামে শোভা পেয়েছে। গত মাসে এই পর্তুগিজ মহাতারকা সেটি খেতেই এসেছিলেন, ছবিও পোস্ট করেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কেউ কেউও পরশু রাতের ছবি পোস্ট করেছেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। যা দেখে বোঝা যায় বদলাচ্ছে অন্য সংস্কৃতিও। অন্তত নুসারাতে খাওয়ার খরচ যেকোনো বিচারেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু তাতেও এখন অরুচি নেই!



মন্তব্য