kalerkantho


কনস্ট্যানটাইনের বাঁশিতেই উড়ছে ভারত

শাহজাহান কবির   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কনস্ট্যানটাইনের বাঁশিতেই উড়ছে ভারত

একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে এখন বিশ্বের আলোচিত কোচদের একজন স্টিফেন কনস্ট্যানটাইন। বিবিসির সাংবাদিক ওয়েন আমুস তাঁর আত্মজীবনী ‘ফ্রম দিল্লি টু দ্য ডেন’ লিখে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। যে বই এ বছরই ফুটবল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের বছরের সেরা বইয়ের মনোনয়ন পেয়েছে।

নামটা বড় খটমট। স্টিফেন কনস্ট্যানটাইন। মানুষটাও আর সবার মতো নন। দক্ষিণ আমেরিকা আর ওশেনিয়া বাদে আর সব কয়টা মহাদেশে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে তাঁর। জাতিগত দাঙ্গা ও গণহত্যার জন্য কুখ্যাত রুয়ান্ডা জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘দেশটা ভৌগোলিক সীমারেখায় কোথায়, তাদের কী ধর্ম, কী রাজনীতির ইতিহাস—কিছুই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না, আমার কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ হলো ফুটবল।’

সে কারণেই একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে এখন বিশ্বের আলোচিত কোচদের একজন তিনি। বিবিসির সাংবাদিক ওয়েন আমুস তাঁর আত্মজীবনী ‘ফ্রম দিল্লি টু দ্য ডেন’ লিখে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। যে বই এ বছরই ফুটবল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের বছরের সেরা বইয়ের মনোনয়ন পেয়েছে। আর্সেনালভক্ত কনস্ট্যানটাইন ইংলিশ ফুটবলেই কোচ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে চেয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন তিনি মা-বাবার দেশ সাইপ্রাস থেকে। মূল কোচ হিসেবে প্রথম চ্যালেঞ্জ নিতেই উড়ে আসেন তিনি নেপালে। সেখান থেকে ভারতের দায়িত্বে। ২০০২ থেকে ’০৫—তিন বছর ছিলেন সেবার। ফিরে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের ক্লাব মিলওয়ালের দায়িত্ব নেন। কিন্তু জাতীয় দল আবার তাঁকে ডাকে। কোচ হন মালাউয়ির, সেখান থেকে সুদানের। আবার সাইপ্রাসে ফেরেন তিনি নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে, যান গ্রিসেও, সেখান থেকেই রুয়ান্ডা। দেশটিকে ইতিহাসের সেরা র‌্যাংকিংয়ে তুলেই কনস্ট্যানটাইনের আবার দিল্লির মসনদে ফেরা। বিশ্ব পরিভ্রমণ শেষে যাবতীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা যেন ঢেলে দেন এখানে। সেটা ২০১৫ সাল, নেপাল, আফগানিস্তানের কাছে হেরে বাংলাদেশের সঙ্গে ড্র করে ভারতের র‌্যাংকিং গিয়ে ঠেকেছে ১৭৩-এ। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের তখন সরাসরি গ্রুপ পর্বে জায়গা হয়ে যায়, ভারতের হয় না। নেপালের বিপক্ষে প্লে-অফে নামতে হয় তাদের। দুই লেগের সেই প্লে-অফ জিতেই এক লাফে ১৪৭-এ উঠে আসে কনস্ট্যানটাইনের দল।

তাঁর আসল ম্যাজিক এরপর শুরু। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন যে ‘স্পট’ নিয়ে গর্ব করেছিলেন সেখানে ভারতীয়দেরও জায়গা হয় না বলে। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের হয়ে এই কনস্ট্যানটাইনই যেন পাল্টা জবাবটা দিয়ে দেন। এখন আসলে তা কনস্ট্যানটাইনের জবাব বলতেও বাধবে। ভারত যে এখন ফিফা র‌্যাংকিংয়ের ১০০- এর ভেতরে, ৯৬তম, কোথায় বাংলাদেশ! ২০১৭-১৮ মিলিয়ে টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত ছিল তারা। নেপালকে হারিয়ে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের যে গ্রুপ পর্বে ঢুকে গিয়েছিল তারা, সেই গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে কনস্ট্যানটাইনের দল আগামী বছর আরব আমিরাতে এশিয়ান কাপের মূল পর্ব খেলবে। ভারতের ইতিহাসেই যা মাত্র চতুর্থবারের মতো। ২০১১-তে ২৭ বছর পর তারা এই সুযোগ পেয়েছিল আরেক ব্রিটিশ বব হাটনের অধীনে। কনস্ট্যানটাইন দ্বিতীয়বার ব্লু টাইগারদের দায়িত্বে এসেই তাদের সেই মর্যাদায় ফেরালেন। পরশু পাকিস্তানকে হারিয়ে তাঁর অনূর্ধ্ব-২৩ দল সাফের ফাইনালে উঠে যাওয়ার পর জানতে চাওয়া হয়েছিল, কী এই দলের অনুপ্রেরণা? ৫৫ বছর বয়সী কোচ উত্তর দিয়েছেন এশিয়ান কাপ, ‘আগামী বছরের এশিয়ান কাপে খেলার সুযোগ পেতে এই দলের প্রত্যেক খেলোয়াড় মুখিয়ে। তাদের সামনে সাফ শিরোপা জেতার জন্য এর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর হয় না।’ ৩ ম্যাচে ৩ গোল করা মানভির সিংকে পাশে নিয়ে এ জবাব দেওয়ার সময় এটাও জানিয়ে রাখলেন যে, ‘কয়েকটি পজিশনে বেশ কয়েকজন এমনই পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে যে তারা এশিয়ান কাপের স্কোয়াডে থাকতে পারে।’

তবু এ সব কিছুর পেছনে কনস্ট্যানটাইন নিজের জাদু মানেন না, তাঁর কথা, ‘এআইএফএফের কাছে কখনো আমার নিজের জন্য কিছু চাইনি। আমার সব দাবি-দাওয়া এই দলের জন্য। আমি এ পর্যন্ত যতগুলো দলে কাজ করেছি তাদের চেয়ে কোনো দিক দিয়েই কম নয় তাদের সমর্থন। বিশ্বের নামকরা স্পোর্টস সায়েন্স এক্সপার্ট আছে, ডিনে জোন্সের মতো খ্যাতনামা ফিজিও আছেন। ২০ হাজার ডলারের চেয়ে বেশি খরচ করে জিএসপি সিস্টেম চালু করেছি আমরা। এখন আমরা সব খেলোয়াড়ের উন্নতি-অবনতির প্রতিটা ধাপ আরো সূক্ষ্মভাবে ধরতে পারি। ভারতীয় ফুটবল সামগ্রিকভাবেই দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে। লিগের মান বাড়ছে প্রতি মৌসুমে। সাফল্যের রহস্য এসবেই লুকিয়ে।’ বব হাটন দায়িত্বে থাকতেই ফিফার সহায়তায় একেকটা রাজ্যে রিজিওনাল একাডেমি গড়ে তোলে ভারত। সেখান থেকে খেলোয়াড়দের ছেঁকে নিয়ে তোলা হয় কেন্দ্রীয় এলিট একাডেমিতে। মানভীর সিং, অনিরুদ্ধ থাপা, বিনিত রায়, ফারুক চৌধুরীরা সেই এলিট একাডেমিরই সেরা প্রতিভা একেকজন। তরুণদের জন্য আরো একটা প্ল্যাটফর্ম ‘ইন্ডিয়ান অ্যারোস’। ফেডারেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় যে দলটি খেলার সুযোগ পায় আই লিগে। গত অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ খেলা দলটিই এখন যেমন ইন্ডিয়ান অ্যারোসের হয়ে খেলেছে। কনস্ট্যানটাইনের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের প্রাথমিক দলেও ছিলেন তাঁদের চারজন। অর্থাৎ ভারতীয় তরুণদের ব্যাকগ্রাউন্ডও সমৃদ্ধ। আমাদের দেশে এখনো যেখানে অনূর্ধ্ব-১৯ দল গড়া হয় উন্মুক্ত ট্রায়াল ডেকে, তার সঙ্গে কনস্ট্যানটাইনের এই ভারতকে মেলানো যায় তাই কী করে! সাফেও তাঁরা মেলে না। ভারতীয় তরুণদের একেকটা মুভ তাই ঈর্ষা হয়ে ঝরে পড়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায়।



মন্তব্য