kalerkantho


ওয়ালশের মন্ত্র

ভয় নেই হাতুরাসিংহের ব্ল্যাক ম্যাজিকের

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভয় নেই হাতুরাসিংহের ব্ল্যাক ম্যাজিকের

সিংহভাগের মতই এ রকম যে হাতুরাসিংহে ম্যাজিকই আসলে ২০১৫-র বিশ্বকাপ থেকে বদলে দিতে শুরু করেছিল বাংলাদেশকে। অবশ্য দেশের তারকা ক্রিকেটাররাও এক বাক্যে মানেন যে সবসময় জিততে মরিয়া হাতুরাসিংহে দলের মধ্যে সাফল্যের সঙ্গেই জেতার মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন।

ফেস্টিভাল সিটির হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের লবিতে বাংলাদেশি সাংবাদিককে দেখে নিজে থেকেই ‘হাই’ বলে এগিয়ে এলেন তিনি। চলে যাওয়ার আগেই চন্দিকা হাতুরাসিংহের কাছে অবধারিত জিজ্ঞাসা, ‘নিজের পুরনো দলের পারফরম্যান্স এখন কেমন দেখছেন?’ নিজের দেশের হাল ধরতে বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচের চাকরি ছেড়ে যাওয়া এই শ্রীলঙ্কান জবাবও দিলেন তবে কথা শেষ করলেন না, ‘ভালোই করছে। ভালো ওদের করতেই হবে। অন্যথায়...।’

শেষ না করা কথায় থাকতে পারে না বলা অনেক কথাই। যেমন এমনও তো হতে পারে যে বলতে চেয়েছিলেন এই কথাও, ‘আমি যেখানে রেখে গেছি, সেখান থেকে ভালো না খেলাই তো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।’ অনেকের কাছে তর্কযোগ্য হলেও সিংহভাগের মতই এ রকম যে হাতুরাসিংহে ম্যাজিকই আসলে ২০১৫-র বিশ্বকাপ থেকে বদলে দিতে শুরু করেছিল বাংলাদেশকে। অবশ্য দেশের তারকা ক্রিকেটাররাও এক বাক্যে মানেন যে সবসময় জিততে মরিয়া হাতুরাসিংহে দলের মধ্যে সাফল্যের সঙ্গেই জেতার মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন।

তবে যেকোনো মূল্যে জেতার জন্য তাঁর নানা রকম তৎপরতা নিয়েও আছে না বলা অনেক কথা। ম্যাজিকের পাশাপাশি তাই হাতুরাসিংহের ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ও তাঁর পুরনো শিষ্যদের আলোচনায় উঠে আসে প্রায়ই। বিশেষ করে জেতার জন্য নিয়মের মধ্যে থেকে অনিয়মে যেমন তাঁর বিপুল উৎসাহ আছে, তেমনি সম্ভব হলে অনিয়মেও না নেই কোনো। যদিও সেসব নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের প্রকাশ্য আলোচনায় টেনে নেওয়া কঠিন। সাবেক কোচ প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁরা হালকা আলাপেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান নিজেদের। তামিম ইকবালও তাই রাখলেন, ‘আজ সকালেও দেখা হয়েছিল। উইশ করলাম। ওনার জন্মদিন তো।’

একই হোটেলে শ্রীলঙ্কা দলও থাকছে বলে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাতে পারস্পরিক কুশল বিনিময়ই চলছে তাঁর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে। সেটি সম্ভবত আরো বেগবানও হচ্ছে এবার আর তাঁর ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ দেখানোর তেমন কোনো সুযোগ নেই বলেই। একেই এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) টুর্নামেন্টে খেলা হচ্ছে দুবাই ও আবুধাবিতে। তার ওপর এটা শ্রীলঙ্কার হোম ভেন্যুও নয় যে নিজেদের চাহিদামতো উইকেটও তৈরি করা যাবে। এসব কিছুর পরও ১৫ সেপ্টেম্বর দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে হাতুরাসিংহের অন্য রকম কিছু করার সুযোগ মাশরাফি বিন মর্তুজা আরো কম দেখছেন এ কারণে, ‘খেলা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। তার ওপর এটা ওয়ানডে ম্যাচ। দুই দিক থেকে খেলা হবে দুই বলে। মনে হয় না এখানে অন্তত অন্য রকম কিছু করার সুযোগ তেমন একটা আছে। টেস্ট ম্যাচ হলে ভিন্ন কথা ছিল।’

টেস্ট ম্যাচ হলেও এখন আর সেভাবে অন্য রকম কিছুর চেষ্টা না করারই কথা হাতুরাসিংহের। কারণ কথায় আছে না গৃহস্থেরও দিন আসে। সেই দিন এসে গিয়েছিল গত জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের সেন্ট লুসিয়া টেস্টে, যেখানে বল টেম্পারিং কাণ্ডের সূত্র ধরে অধিনায়ক দীনেশ চান্ডিমাল এবং ম্যানেজার আশাঙ্কা গুরুসিনহার সঙ্গে হাতুরাসিংহেও দুই টেস্ট আর চার ওয়ানডের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন। ওই ঘটনার পর জেতার জন্য হাতুরাসিংহের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারটিও প্রমাণিত। অনিয়ম ধরার ক্ষেত্রে তাঁর নিজেরও যে বেশ উৎসাহ ছিল, সেটি তো প্রধান কোচ থাকাকালীন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররাও দেখেছেন। সবশেষ নিউজিল্যান্ড সফরের ওয়েলিংটন টেস্টের উইকেটে নিয়ম বহির্ভূতভাবে পানি দেওয়ার ছবি নিজের মোবাইলেই ধরেছিলেন হাতুরাসিংহে। সেই সময় জানিয়েছিলেন অভিযোগও।

তাতে তেমন কাজ না হলেও কাজ হওয়ার মতো কিছু ব্যাপার রপ্ত করাতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদেরও। বল ঘষার সুবিধার্থে ট্রাউজারে স্পন্সরের লোগো তাঁর চাহিদামতো জায়গায় বসানোর নজিরও আছে বাংলাদেশ দলের কোচ থাকার সময়। ট্রাউজারের তুলনায় এর লোগোর এমব্রয়ডারি করা সুতায় বল ঘষলে কারিকুরি বাড়ার ব্যাপারটি নিয়ে ভীষণ তৎপরও ছিলেন। সেই সঙ্গে এমন নিয়মও চালু করেছিলেন যে বল ডেড হওয়ার পর সেটিকে যথাসম্ভব ধুলোবালির সংস্পর্শে আনার জন্য থ্রো না করে কয়েক ড্রপে বোলারের কাছে পাঠানোর। এসব কাজে কারো কারো উদাসীনতায় বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে হাতুরাসিংহের ক্ষোভ ঝাড়ার নজিরও কম দেখা নেই ক্রিকেটারদের।

এ জন্যই তাঁর অন্য রকম তৎপরতার আশঙ্কা তিনি চলে যাওয়ার পর থেকে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হলেই। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে দেশের মাটিতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে লঙ্কানদের কাছে হারের পর উইকেট নিয়ে শ্রীলঙ্কান কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার ষড়যন্ত্র তত্ত্বও এরই ফল। কারণ দেশের মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট সাফল্যে হাতুরাসিংহে-গামিনি রসায়ন তো নিজেদের চোখেই দেখা ক্রিকেটারদের। যদিও সেসময় ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমরা হাতুরাসিংহে ইস্যুটা মাথায় একটু বেশিই নিয়ে ফেলেছিলাম।’ ভিসা প্রাপ্তির বিলম্বে গতকাল সকালেই এসে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া এই সাবেক অধিনায়ক পুরনো কথাই পুনর্ব্যক্ত করলেন, ‘ত্রিদেশীয় সিরিজে খামোখাই ওরা চাপ নিয়ে ফেলেছিল। তবে নিদাহাস ট্রফির পর সেই চাপ আর নেই।’ সেখানে লঙ্কানদের দর্শক বানিয়ে ফাইনালে যাওয়া বাংলাদেশ এবার যখন আবার মুখোমুখি হচ্ছে শ্রীলঙ্কার, তখন মাহমুদও এই ভেবে আশ্বস্ত যে, ‘এবার এমন ভেন্যুতে খেলা হচ্ছে যেখানে হাতুরাসিংহের আসলে অন্য রকম কিছু করার সুযোগ নেই।’

বাংলাদেশের কোচ হিসেবে ম্যাজিক দেখিয়ে যাওয়া হাতুরাসিংহের ব্ল্যাক ম্যাজিকের শিকার হওয়ার ভয়ও তাই আর নেই!



মন্তব্য