kalerkantho


এই জয়ের আনন্দ দ্বিগুণ

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



এই জয়ের আনন্দ দ্বিগুণ

ছবি : মীর ফরিদ

পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ আর সব ম্যাচের মতো না। চেতনায় অন্য কিছু খেলা করে। গ্যালারিতে থাকে অন্য রকম আবেগ। একাত্তর ফিরে আসে। পশ্চিমাদের আবারও হারের স্বাদ দিতে রক্ত চনমনিয়ে ওঠে।

সাফে বাংলাদেশের দ্বিতীয় এ ম্যাচ স্রেফ ফুটবলীয় সমীকরণেও ছিল উত্তেজনায় ঠাসা। এশিয়াডের জ্বলা তারুণ্যের মশাল প্রথম ম্যাচেও ধরে রেখেছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তান সত্যিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে হাজির হয়। তাদের শারীরিক সামর্থ্য, ইউরোপীয় ফুটবলে খেলে তাদের স্কিলের উন্নতি জেমি ডের দলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়। কে না জানে বাঙালি নিজেদের প্রমাণে এমন কত আধিপত্য ছুড়ে ফেলেছে ইতিহাসে। শক্তির বিপক্ষে সাহস আর কৌশলের সেই লড়াইয়েই আরেকবার শরিক হতে কাল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে তাই দর্শকের ঢল। সম্প্রতি ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচ যেন এটি। এ ম্যাচ জিতে আরো বড় কিছুর পানে পা ফেলতে সবাই একাত্ম। মাঠের প্রতিটি অংশে লড়াই হলো সেভাবেই। শুরুতে পাকিস্তানিদের তীব্র আক্রমণ বুক চিতিয়ে ফিরিয়ে দিলেন তপু, টুটুল। প্রতিপক্ষ একটা সময় পিছু হটল। বল পজেশন নিয়ে খেলল বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে ফের আক্রমণাত্মক হতে প্রতি মুহূর্তে পড়তে হলো প্রতিরোধের মুখে। এই দল জাকার্তায় র্যাংকিংয়ে অনেক এগিয়ে থাকা থাইল্যান্ডকে এভাবে রুখে দিয়েছে। কাতারকে ফেরাতে ফেরাতে একটা সময়ে পাল্টা আঘাতে ছিনিয়ে নিয়েছে জয়। উত্তর কোরিয়ার মতো দলের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোলের নজিরও আছে সাদ উদ্দিনের। পুরো ম্যাচ তাই রুদ্ধশ্বাসে কাটল স্টেডিয়ামের ২০ হাজার দর্শকের। কখনো বাংলাদেশ,’ ‘বাংলাদেশ’ ধ্বনি তুলে তারা মাঠের যোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছে। কখনো চিত্কার করতেও ভুলে গেছে তুমুল উত্তেজনায়। প্রাণ খুলে পুরো স্টেডিয়াম সেই উল্লাস করেছে ম্যাচের ৮৬ মিনিটে। তপু বর্মণ তখন জার্সিটাকে পতাকা বানিয়ে ছুটছেন। পেছনে পুরো বাংলাদেশ। এই বুনো উদ্যাপনের শেষ হয় সেই একাত্তরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আবার। তপুর হাতে রাইফেল, সামনে হানাদার। বাঙালি যুবক একে একে সব কয়টাকে শেষ রক্ত-ঘামের শোধ নিলেন তুমুল। এমন উদ্যাপন তপুরা ঠিক করে রেখেছিলেন আগেই, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান বলেই। এই ম্যাচের আগে যে ভিন্ন আবেগ খেলা করে। জয়ের নেশায় আবার রক্ত চনমনিয়ে ওঠে।

এই জয়ের আনন্দ তাই দ্বিগুণ। এ যে ফুটবলের সাম্প্রতিক সময়ের ভরাডুবির উল্টো স্রোতে নাও বাওয়া, তিন আসর পর সাফের সেমিফাইনালে উঠে যাওয়ার হাতছানি। এই জয় এবং মাঠভাঙা দর্শকের ছবি কাল তাই নতুন দিগন্তছোঁয়া। বাড়তি পাওয়া একাত্তরের শত্রুকে আবার হারের স্বাদ দেওয়া, বাঙালির শক্তি, সাহসের আবার জানান দেওয়া। স্কিলফুল নেপালিদের বিপক্ষে পাকিস্তানিদের দেখে তাদের ২০৩ র্যাংকিং স্রেফ অবান্তর মনে হয়েছিল কোচের কাছে। তাই কঠিন লড়াইয়ের প্রস্তুতি ছিল আগে থেকেই। কাল ম্যাচ শেষ করে এসে অদ্ভুতভাবে শান্ত থাকলেন এই ইংরেজ, ‘খুব কঠিন ম্যাচ ছিল। ছেলেরা কঠোর পরিশ্রম করেছে। তারই ফল পেয়েছি আমরা। অবশ্যই আমরা এ জয় উদ্যাপন করব। তবে কাল থেকেই আবার নেমে পড়তে হবে নেপাল ম্যাচের প্রস্তুতিতে।’ পাকিস্তানের ব্রাজিলিয়ান কোচ জোসে আন্তোনিও নগুয়েরা ম্যাচ শেষ করে এসে হারের চেয়ে ৯০ মিনিটজুড়ে দুই দলের লড়াইয়ের কথাই বললেন বেশি করে, ‘৫০-৫০ হয়েছে এই ম্যাচে। প্রতিটা পজিশনে হয়েছে ঠোকাঠুকি। বিশেষ করে মাঝমাঠে।’ একটা সময় মনে হচ্ছিল অন্তত হারতে চায় না কোনো দলই সেই প্রশ্নও তাঁকে করা হলো, তিনি স্রেফ উড়িয়ে দিলেন তা, ‘মাঝমাঠের তীব্র লড়াইয়ের কারণেই ম্যাচে গোলের সুযোগ হয়েছে কম। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি ছাড় দিতে চায়নি।’ নেপাল ম্যাচের প্রসঙ্গ টেনেও বললেন, ‘নেপাল ছিল মোর অর্গানাইজড, বাংলাদেশ বেশি আক্রমণাত্মক।’ জেমির দলের খেলার ধরনই যে তাই প্রতিরোধ এবং পাল্টা আঘাত। এর মাঝামাঝি কিছুর সুযোগ নেই। পাকিস্তানের বিপক্ষেও তা ছিল না, শুধুই আক্রমণাত্মক হলে নগুয়েরার দল সুবিধা পেয়ে যেত। তপু বর্মণ, শহীদুল আল সোহেলরা তাই খেললেন ক্যারিয়ার সেরা ম্যাচে। মাঝমাঠে জামাল ভূঁইয়া আর মামুনুল ইসলাম ছিলেন লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁরা হাল ছাড়েননি। এর মাঝেই বিপলু, সাদউদ্দিন, মাহবুবুর রহমানরা যখনই পেরেছেন আতঙ্ক ছড়িয়েছেন জেস রহমানদের মধ্যে। পাকিস্তানি ডিফেন্স অন্তত এই ম্যাচে নড়াচড়ার সুযোগ পায়নি। এ জয় তাই পরিপূর্ণ, প্রতিপক্ষ চিন্তায় তার আনন্দ আরো দ্বিগুণ। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে গোল করা তপু বর্মণও বলেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমাদের লড়াই-ই আমাদের জিতিয়েছে। মাঝবিরতিতে জেমিও তাই বলেছিলেন স্রেফ লড়াইটা চালিয়ে যাও, প্রতিপক্ষ একসময় ক্লান্ত হবেই। আমরা সেই কঠিন কাজটাই করে গেছি।’ জেমিও বলেছেন, ‘এই ম্যাচে হয়েছে খেলোয়াড়দের ফিটনেসের চূড়ান্ত পরীক্ষা। কয়েক মাস ধরে এ জায়গাটাতেই উন্নতি আনতে চেয়েছি আমি। এ জয় সেই পরিশ্রমেরই ফসল।’ ওয়ালি, তপুদের উল্লাসেও ছিল সেই ছবি, নিজেদের সঙ্গে নিজেদের জেতার আনন্দ। প্রতিপক্ষও সেই উদ্যমের কাছেই হার মেনে গেছে শেষ পর্যন্ত। ঢাকার মাঠে পাকিস্তানের তো পারার কথাই না।



মন্তব্য