kalerkantho


অফুরন্ত স্ট্যামিনার ছবি আঁকবে ফুটবলাররা

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দিনশেষে ম্যাচের ফলটাই আসল সব খেলাতেই। ফুটবল ম্যাচের ব্যবধান গড়ে গোল। কাঙ্ক্ষিত সেই গোলের দায়ভার মূলত স্ট্রাইকারের। কিন্তু বাংলাদেশ দলে এমন কেউ নেই যাঁর কাঁধে এ দায়িত্ব দেওয়া যায় নিঃসংকোচে। তাতে আসন্ন সাফ ফুটবলেও গোলদাতার খোঁজে বাংলাদেশ। এ মহাসংকট নিয়েই সনৎ বাবলার তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয়টি ছাপা হলো আজ

 

এক সাংবাদিক খুব হাহাকার করে উঠলেন, ‘দেখলেন! ছেলেগুলোকে কিছু খেতে দিলেন না কোচ।’ বসুন্ধরা কিংস-বিএসপিএ ফুটবল স্টারস সম্মাননা শেষে চা-চক্রে কিছুই মুখে তুলতে পারেননি সাফের এবারের দলের ফুটবলাররা। কারণ জাতীয় দলের ইংলিশ কোচ জেমি ডের দুই সহকারীর চোখ খেলোয়াড়দের দিকে। তাঁরা কী খাচ্ছেন, সেদিকে নজর রাখছেন। এ খেলোয়াড়দের মসলাদার খাবার এবং মিষ্টি নিষিদ্ধ। দু-একজনের একটু লোভ হলেও উপায় নেই, কোচের চোখে চোখ পড়তেই আপেলখানা হাতে নিয়ে তাঁরা বিরষ বদনে উঠে গেলেন হোটেলের লিফটে।

এটা শুধু একটি ঘটনা। গত ১২ সপ্তাহ ধরে খেলোয়াড়দের দিনকাল চলছে এভাবে। খাওয়া-দাওয়ার বিধিনিষেধ এবং নির্দিষ্ট ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে। এমন নিয়ম-কানুনের মধ্যে চলায় তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা বেড়েছে বলে দাবি করেছেন দলের ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস রূপু, ‘আমাদের খেলোয়াড়রা এখন দুর্দান্ত ফিট। কারণ তাদের দিন কাটছে এখন নিয়মতান্ত্রিক রুটিনের মধ্য দিয়ে। খাওয়া, ট্রেনিং, জিম ও বিশ্রাম—সবই চলছে নিয়মের মধ্যে। মসলাদার খাবার এবং মিষ্টি তালিকা থেকে বাদ। ভাত খেলেও কতটুকু খেতে পারবে সেটা তারা জানে।’ তাই জেমির ১২ সপ্তাহে ফুটবলারদের চেহারা বদলে গেছে। মুটিয়ে যাওয়া মামুনুল ইসলামও হয়ে গেছেন মেদহীন, লিকলিকে। তরুণদের খেলায় সেই শারীরিক সামর্থ্যের স্পষ্ট প্রভাব। এশিয়ান গেমসে অনূর্ধ্ব-২৩ দল প্রতিটি ম্যাচ দাপিয়েছে অফুরন্ত স্ট্যামিনায়। ম্যাচে পিছিয়ে কিংবা এগিয়ে, শেষ বাঁশির আগ পর্যন্ত লড়েছেন সুফিল-বিপলুরা। বাংলাদেশ ফুটবলের এই লড়াইয়ের ছবিটা দেখার মতো। 

আসলে এমন ছবি তো সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। মানুষ দেখেছে ৭০ মিনিটে নুইয়ে পড়া ফুটবল। এখন লাল-সবুজের ফুটবল হয়েছে পুরো ৯০ মিনিটের ছবি। না, এশিয়ান গেমস দলের অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়া বলছেন ৯৩ মিনিটের নতুন এক প্যাকেজের কথা, ‘আমাদের মানসিকতা ও শারীরিক পরিবর্তনটা বেশি হয়েছে। ফিটনেস একদম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেখে আমরা খেলতে নামি। মাঠে নামি ৯৩ মিনিট লড়াই করার জন্য। কোচের কথা অনুযায়ী, ইনজুরি টাইমকেও বাদ দেওয়া যাবে না।’ সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান গেমসটা তাই গৌরবের লড়াইয়ের গল্প হয়ে আছে। দুর্ভাবনা নিয়ে ইন্দোনেশিয়া গিয়ে ফিরেছে ইতিহাস গড়ে। শক্তিতে এবং র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে ছিল গ্রুপের বাকি তিনটি দলই। যাওয়ার সময় ড্রয়ের চিন্তা করতেও কষ্ট হয়েছিল নতুন ইংলিশ কোচের। কিন্তু ফুটবলারদের অফুরন্ত স্ট্যামিনায় সব দুশ্চিন্তা উধাও। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে হারে শুরু হলেও পরের ম্যাচে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে কাতারকে ১-০ গোলে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ে লাল-সবুজের ফুটবল। এশিয়ান গেমস ফুটবলে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশ। সেখানে প্রতিপক্ষ আগেরবারের রানার্স-আপ উত্তর কোরিয়া গুণে-মানে অনেক এগিয়ে। তাতে কী, মাঠে লড়াই করতে তো দোষ নেই। শেষমেশ কোরিয়ার ফুটবল মানের জয় হলেও কিন্তু লড়াকু বাংলাদেশের ছবিটা ধরে রাখে তরুণরা। এই ছবির অন্তর্গত ভাব হলো, হারার আগে হারে না বাংলাদেশ।

নতুন এই স্বভাবে দলের ভেতর দুর্দান্ত এক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে শেষ মুহূর্তে গোল খাওয়ার যে বদ অভ্যাস তৈরি হয়েছিল সেটি আর নেই। এখন শেষ মুহূর্তে উল্টো গোল দিচ্ছে। কোরিয়ার ম্যাচেও সে রকম এক গোল দিয়েছেন সাদ, এর আগে কাতারের বিপক্ষে জামালের গোলটিও শেষ সময়ের উপহার। ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস রূপু এটাকে দৃশ্যমান বদল হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, ‘শুধু ইন্দোনেশিয়ায় নয়, কোরিয়ায় প্র্যাকটিস ম্যাচেও আমাদের খেলোয়াড়রা শেষদিকে গোল বের করেছে। এটা হয়েছে তাদের লড়াকু স্বভাব এবং ম্যাচ ছেড়ে না দেওয়ার জন্য।’ তবে জামাল ভুঁইয়ার আক্ষেপ, ‘এখন শেষ মুহূর্তে গোল খাচ্ছি না, ডিফেন্সের ভুলগুলোও কমে এসেছে। তবে খামখেয়ালিপনায় গোল খাচ্ছি।’

সাফের আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে সে রকম এক গোলেই নাক কাটা গেছে সিনিয়র দলের। এ কারণে সাফ শুরুর আগে সিনিয়ররা একটু চাপে। তবে শুরু থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং অফুরন্ত স্ট্যামিনায় শেষ পর্যন্ত খেলে যাওয়ার ছবিটার বদল হয়নি। কারণ জেমির ১২ সপ্তাহের গল্পের মূল উপাদানই ফিটনেস, ‘ফুটবলে ফিটনেসটা খুব লাগে। তাই প্রথমে আমার খেলোয়াড়দের ফিটনেস ফেরানোর দিকে নজর দিয়েছিলাম। এটা হলে অন্তত প্রতিপক্ষের স্বাভাবিক খেলাটা আটকে দেওয়া যায়। তাদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে যাওয়া যায়। একটা ডিফেন্সিভ কৌশল ঠিক করা যায়।’ ১২ সপ্তাহে আসলে এর চেয়ে বেশি করাও যায় না। ২৩/২৫ বছর বয়সীদের মৌলিক ফুটবল শেখানো যায় না, মানের উন্নতি করা যায় না। ছোটবেলা থেকে যেটা শিখেছে সেটাই খেলবে। বদলটা আনলে আনা যায় শুধু ফিটনেসে। শারীরিকভাবে খেলোয়াড়দের ফিটনেসের চূড়ান্তে পৌঁছে দিতে পারলে তারা নেতিয়ে পড়বে না মাঠে, দম দেওয়া ঘড়িটির মতো চলতে থাকবে। এই চলনটাই ভালোভাবে শিখেছে বাংলাদেশ দলের ফুটবলাররা। জামাল ভুঁইয়ার বিশ্বাস, ‘সাফের খেলায়ও খুব হেরফের হবে না, ইন্দোনেশিয়ার মতোই খেলবে সবাই। সিনিয়র খেলোয়াড়রাও এশিয়ান গেমসের সঙ্গে প্র্যাকটিস করেছে। তারা জানে কিভাবে খেলতে হয়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ দিয়ে বিচার করলে বোধ হয় ঠিক হবে না। টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্স অন্য রকম হবে, আমার বিশ্বাস।’

প্রস্তুতি ম্যাচ আর টুর্নামেন্ট ভিন্ন জিনিস। টুর্নামেন্টে হার-জিত যাই হোক, আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দল অফুরন্ত স্ট্যামিনার ছবি এঁকে দেবে দেবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে।



মন্তব্য