kalerkantho



এশিয়ান গেমস যেন ‘অলিম্পিক প্লাস’

১৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



এশিয়ান গেমস যেন ‘অলিম্পিক প্লাস’

৪০ খেলায় পদকের লড়াই ৪৬৫ ইভেন্টে। গত এশিয়ান গেমসে ৩৬ খেলার ইভেন্ট ৪৩৯টি আর অলিম্পিকের ইভেন্ট ছিল ৩০৬টি। এ জন্যই এটা ‘অলিম্পিক প্লাস’! জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে এর আনুষ্ঠানিক পর্দা উঠছে আজ।

অলিম্পিক প্লাস! জাকার্তা, পালেমবাং এশিয়ান গেমসের পরিচিতি এমনই। অলিম্পিকের ইভেন্টের সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ ক্রীড়া আসরে আছে ব্রিজ, পেনকাক সিলাত, সামবো, কুরাশের মতো অপ্রচলিত আর মজার খেলা। ৪০ খেলায় পদকের লড়াই ৪৬৫ ইভেন্টে। গত এশিয়ান গেমসে ৩৬ খেলার ইভেন্ট ৪৩৯টি আর অলিম্পিকের ইভেন্ট ছিল ৩০৬টি। এ জন্যই এটা ‘অলিম্পিক প্লাস’! জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে এর আনুষ্ঠানিক পর্দা উঠছে আজ।

মর্যাদার এমন আসরে সবার নজর থাকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে। জাকার্তার উদ্বোধন নিয়েও আছে। এশিয়ান গেমসের আগের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মান ধরে রাখতে বা ছাড়িয়ে যেতে প্রত্যয়ী ইন্দোনেশিয়া। তাই উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানের বাজেট ৫৫ মিলিয়ন ডলার। শুধু উদ্বোধনেই থাকছে মোট বাজেটের ১০ শতাংশ। জিবিকের মূল মঞ্চ তৈরি হয়েছে ১২০ মিটার লম্বা, ৩০ মিটার প্রস্থ আর ২৬ মিটার উঁচু। পেছনে ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী দ্বীপ, ফুল আর পাহাড়ের প্রতীকী চিত্র। প্রতিটি গেমসেই এ ধরনের অনুষ্ঠানে পারফরমাররা ফুটিয়ে তোলেন স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। ইন্দোনেশিয়াও ব্যতিক্রম নয়। দ্বীপ, পাহাড়, সমুদ্র, আদিবাসীদের জীবন, সংস্কৃতি—এসবই মুখ্য আজকের অনুষ্ঠানে। থাকছেন ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত সংগীতশিল্পী আনগুন, রাইসা, তুলুস, কনডোলোগিটরা। আছেন সংগীত পরিচালক আডি এমএস ও রোনাল্ড ইউনার্ডি। নৃত্য পরিচালনায় ড্যানি মালিক, ইকো সুপ্রিয়ান্তো আর ফ্যাশন ডিজাইনার ডাইনাড ফারিজ, রিনাল্ডি ইউনার্ডিরা থাকায় পুরো অনুষ্ঠান মনোমুগ্ধকর হবে বলে বিশ্বাস আয়োজক কমিটির মুখপাত্র ফ্রান্সিস ওয়ানান্দির।

৪৫ দেশের ১৪ হাজারের বেশি অ্যাথলেট অংশ নিচ্ছেন এবারের এশিয়ান গেমসে। রয়েছেন ১৪ ইভেন্টে বাংলাদেশের ১১৭ জনও। তাঁদের সঙ্গে পুরো বিশ্ব এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা মনে রাখবে বলে জানালেন আয়োজক কমিটির প্রধান এরিক তোহির। তাঁর বিশ্বাস আগের সব অনুষ্ঠান ছাড়িয়ে যাবে জাকার্তা, ‘বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন মানুষ দেখবে এ অনুষ্ঠান। আগ বাড়িয়ে বলতে পারি, আগের সব অনুষ্ঠানকে ছাড়িয়ে যাবে এটা।’ উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানের পরিচালক হার্টি পুরবা। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর উইশুনুতামা একসময় ছিলেন ম্যাডোনার কোরিওগ্রাফার। এটা আকর্ষণীয় না হয়ে পারেই না!

এমন প্রত্যাশার মধ্যেও শঙ্কা, জাকার্তা আর পালেমবার্গ পুরো প্রস্তুত তো? কারণ জাকার্তার বায়ুদূষণ ভয়াবহ। প্রতি কিউবিক মিটারে এর মাত্রা ১৫৪ মাইক্রোগ্রাম। ২০১০ গুয়াংজু এশিয়ান গেমসের সময় চীন কমিয়ে এনেছিল বায়ুদূষণের মাত্রা। জাকার্তায় সেটা না হওয়ায় হতাশ ক্লিন এয়ার এশিয়ার ইন্দোনেশিয়ান সরকারের সমন্বয়ক আহমেদ সফ্রুদ্দিন, ‘আট বছর আগে চীন যা করেছিল আমরা এর কিছুই করিনি।’ অলিম্পিক ভিলেজের রুম নিয়েও আপত্তি তুলেছেন অ্যাথলেটরা। দুই বেডের রুমে কারো হাঁটাই দায়। টাওয়েল রাখার ব্যবস্থা নেই! আজ মার্চপাস্টে বাংলাদেশের পতাকা বইতে যাওয়া মাবিয়া আক্তার বিরক্ত, ‘খুবই খারাপ অবস্থা। অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ছিল কমনওয়েলথ গেমসে।’

এ ছাড়া উদ্বোধনের তিন মাস আগে ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে ইন্দোনেশিয়ায়। তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়াতে আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা গেছে ১৩ জন। গত ১০ বছরে এত বড় হামলা হয়নি ইন্দোনেশিয়ায়। গেমস ঘিরে তাই নিরাপত্তার কড়াকড়ি। জিবিকের গেট দিয়ে ঢুকতেই কড়া তল্লাশি। ইন্দোনেশিয়ানরা এমনিতে আন্তরিক, খটমট করে তাকিয়েও হেসে ফেলে। তল্লাশির পর সব ঠিকঠাক থাকলে স্বাগত জানায় বিনীতভাবে। সন্ত্রাসীদের হামলার হুমকি থাকায় এই বাড়তি তৎপরতা।

জাকার্তাজুড়ে নিরাপত্তার জন্য থাকছে এক লাখ পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আরো এক লাখ। এর পরও গা ছমছমে ব্যাপারটা নেই। উৎসবের আমেজ সবখানে। ক্লাস বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীরা হাসিমুখে যাচ্ছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেতে উঠছে মাসকট বিনবিন, অতুন আর কাকাদের সঙ্গে। গগনচুম্বী অট্টালিকা আর মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে জায়ান্ট স্ক্রিন। গতকাল ছিল ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দিবস। ন্যাশনাল মনুমেন্টালের সামনে উৎসবে মেতেছিল জাকার্তার মানুষ। তবে নিরাপত্তার কড়াকড়িতে পুরো শহর থমকে ছিল অনেকটা সময়। আজ এশিয়ান গেমস শুরুর পরও কি এমন কিছু হবে? এটাই শঙ্কার।

এশিয়ান গেমসের একটা মহড়া হয়ে গেছে ২০১১ সালে জাকার্তা ও পালেমবাংয়ে হওয়া সাউথইস্ট এশিয়ান গেমসে। দুর্নীতির জন্য বিষফোড়া হয়ে গেছে সেটা। আছে ইভেন্ট দেরিতে শুরুর বদনামও। ফুটবল ফাইনালে মারা গিয়েছিল দুজন। এগুলো শোধরানোর চ্যালেঞ্জ এশিয়ান গেমসে। চ্যালেঞ্জ আছে জাকার্তার বিশ্রী ট্রাফিক জ্যাম নিয়েও। দেড় কোটি মানুষের এই শহরের যানজট কখনো কখনো ঢাকার চেয়ে বিরক্তিকর। তাই গেমস উপলক্ষে কিছুটা সীমিত করা হয়েছে যান চলাচল।

এশিয়ান গেমসে চীনের দাপট সব সময়। গত আসরে ১৫১ সোনা জিতে শীর্ষে ছিল তারা। দক্ষিণ কোরিয়া ৭৯ আর জাপানের সোনা ৪৭টি। চীন এবারও এসেছে রাজত্ব ধরে রাখতে। ৮৪৫ অ্যাথলেটের দল তাদের। এই অ্যাথলেটদের ৬৩১ জন কখনো অংশ নেননি অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসে। এমন তরুণ দল নিয়ে আসার ব্যাখ্যাটা চাইনিজ ডেলিগেশন জেনারেল সেক্রেটারি লিই গিয়ুং দিলেন এভাবে, ‘টোকিও অলিম্পিকে আরো বেশি পদক জিততে চায়। এ জন্য সুযোগ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে তরুণদের।’

আগামী অলিম্পিক যেহেতু টোকিওতে তাই জাপানেরও লক্ষ্য পদক বাড়ানো। দক্ষিণ কোরিয়া এবার চিরশত্রু উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মিলে মার্চপাস্ট করবে। একসঙ্গে মিলে অংশ নিচ্ছে মেয়েদের বাস্কেটবল, কেনোয়িং ও রোয়িংয়ে। তাদের হাতে হাত রেখে চলাটাও অন্যতম আকর্ষণ এশিয়ান গেমসের।



মন্তব্য