kalerkantho


শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায়

সামীউর রহমান   

১১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায়

চেন্নাইয়ে একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় আফজালুর রহমান সিনহার। দেশে ফিরিয়ে আনার পর বিমানবন্দর থেকে সরাসরি মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটেই নিয়ে আসা হয় তাঁর মৃতদেহ। যেখানে তাঁকে শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় অনেক সাবেক ক্রিকেটার, সংগঠক, সাংবাদিক। একাডেমি মাঠে গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকার নাগরিকসমাজে কুলীনত্ব আর আভিজাত্যের শেষ কথা হচ্ছে ঢাকা ক্লাব। শতবর্ষ প্রাচীন যে সংগঠনের সদস্য হতে অনেকে কোটি টাকা খরচ করেন এবং হয়ে আপ্লুত হন, সেই সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন আফজালুর রহমান সিনহা। হালে রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে পাতি নেতা থেকে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা অনেক নব্য ধনীই খানিকটা খ্যাতির লোভে সম্পৃক্ত হতে চান খেলাধুলার জগতে, বিশেষ করে ক্রিকেটের সঙ্গে। সেখানে একমি গ্রুপ অব কম্পানিজের মতো বৈশ্বিক কম্পানি, যার বার্ষিক আয় কোটি কোটি টাকা; এ রকম প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হয়েও তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। সামাজিক প্রতিপত্তি ও ব্যবসায়ী পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে তিনি ছিলেন ‘কায়সার ভাই’। আবাহনী ক্লাবের হকি দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, সূর্যতরুণের সূর্য। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের গভর্নিং বডির প্রধান। না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পরও ব্যবসায়ী ও ঢাকা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট পরিচয় ছাপিয়ে তাঁর ক্রীড়া সংগঠক পরিচয়টাই  বড় হয়ে রইল। চেন্নাইয়ে একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় আফজালুর রহমান সিনহার। দেশে ফিরিয়ে আনার পর বিমানবন্দর থেকে সরাসরি মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটেই নিয়ে আসা হয় তাঁর মৃতদেহ। যেখানে তাঁকে শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় অনেক সাবেক ক্রিকেটার, সংগঠক, সাংবাদিক। একাডেমি মাঠে গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বিক্রমপুরে পারিবারিক কবরস্থানেই তাঁকে সমাহিত করা হবে।
 

বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, মরহুমের জানাজা হবে বিকেল সাড়ে ৫টায়। বিমান দেরিতে অবতরণের কারণে সময় খানিকটা পিছিয়ে যায়। তবে খবর পেয়ে বিকেল থেকেই বিসিবি কার্যালয়ে একে একে আসতে শুরু করেছিলেন অনেক ক্রীড়া সংগঠক, হালের নব্য ক্রীড়াপ্রেমীদের উল্লম্ফনে যাঁরা হারিয়েই গেছেন দৃশ্যপট থেকে। ভিক্টোরিয়া ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং, বিশেষ করে হকিতে এখনো দল গড়ে যে ক্লাবগুলো; সেই ক্লাবের অনেক পুরনো দিনের সংগঠকরাই এসেছিলেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। সাকিব আল হাসানও এসেছিলেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে, যদিও জানাজা পর্যন্ত থাকা হয়নি আঙুলের ব্যথায় ভুগতে থাকা টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়কের। বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান ও আবাহনী ক্লাব সূত্রে দীর্ঘদিনের সুহূদ জালাল ইউনুস বলেন, ‘সিনহা ভাইয়ের মতো আরেকজন ভালো মানুষকে আমরা হয়তো আর আমাদের মধ্যে পাব না। অত্যন্ত নিরহংকার, সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে কেউ কখনো খালি হাতে ফেরত আসত না।’  ক্লাব রাজনীতির মারপ্যাঁচে মোহামেডানের লোকমান হোসেন ভুঁইয়া তো ছিলেন আফজালুর রহমান সিনহার প্রতিপক্ষ। তিনিও অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেন প্রয়াত এই সংগঠকের, ‘আবাহনীর হকি দলটাকে তো বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সিনহা ভাই-ই। উনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন, অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ ছিলেন।’

সাবেক বোর্ড পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির একসময়ের চেয়ারম্যান, ব্যক্তিগত জীবনে সফল ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন আল মামুনও এসেছিলেন আফজালুর রহমান সিনহাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। তিনি মনে করেন, ব্যবসায়ী হিসেবেও তাঁর চলে যাওয়াটা অপূরণীয় ক্ষতি, ‘বাংলাদেশে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নৈতিকতা মেনে ব্যবসা করে, একমি তার মধ্যে একটি। তাঁর চলে যাওয়াতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আমাদের দেশে নৈতিকতা মেনে চলা ব্যবসায়ীর সংখ্যা এমনিতেই কম। তিনি চলে যাওয়াতে সংখ্যাটা আরো কমে গেল।’

জানাজা শুরুর আগে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান তাঁর বক্তব্যে জানিয়েছেন আফজালুর রহমান সিনহার বোর্ড সদস্য হিসেবে দক্ষতা ও কার্যকারিতার কথা, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক কঠিন কাজ দেওয়া হয়েছিল সিনহা ভাইকে। তিনি ছিলেন আমাদের ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখলাম, বিপিএলটা একটা মাথাব্যথা। তিনি সেই বিপিএলকে দুই বছরের ভেতর সুন্দরভাবে গুছিয়ে এনেছিলেন। আমরা তাঁর জায়গায় অন্য একজনকে বসাতে পারব, কিন্তু তাঁর কোনো বিকল্প আমরা পাব না।’

আফজালুর রহমান সিনহার যে সামাজিক পরিচয় তাতে একমি কোর্ট কিংবা ঢাকা ক্লাব, যেকোনো জায়গাতেই হতে পারত তাঁর শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মঞ্চ। কিন্তু তা না করে হোম অব ক্রিকেটেই তাঁকে শেষবারের মতো নিয়ে আসার মাধ্যমে সম্মান জানানো হলো তাঁর ক্রীড়া সংগঠক পরিচয়টাকেই। যে জায়গাটায় তিনি অর্জন করেছেন সবার শ্রদ্ধামাখা ভালোবাসা।



মন্তব্য