kalerkantho


বিশ্বকাপের ভাবনা আছে প্রস্তুতি নেই

২৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বকাপের ভাবনা আছে প্রস্তুতি নেই

আবারও মাশরাফি : গায়ানায় গতকাল রাতে নির্ধারিত সময়েই শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে। এই ম্যাচ জিতলে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জয়ও নিশ্চিত করবে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। সেই স্বপ্ন পূরণের মিশনে টস জিতে ফিল্ডিং নেন মাশরাফি। টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে সর্বশেষ ১১ ওভারে ১ উইকেটে ৪২ রান করেছিল ক্যারিবীয়রা। ক্রিস গেইল ২৯ বলে ২৭ এবং শাই হোপ ব্যাট করছিলেন তখন ১৯ বলে ৩ রান নিয়ে। একটি করে ছক্কা এবং বাউন্ডারিতে ১৮ বলে ১২ রান করা এভিন লুইসকে এলবিডাব্লিউ আউট করে বাংলাদেশকে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন অধিনায়ক মাশরাফিই। ছবি : এএফপি

বিশ্বকাপের আগে যত বেশি সুযোগ তত বেশি মূল আসরের স্কোয়াড থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি। বরং আড়ালে-আবডালে থাকলেই ফাঁকতালে মিলে যেতে পারে টিকিট, কেউ না কেউ তো ব্যর্থ হবেই হবে! আন্তর্জাতিকমানের ক্রিকেটার দেশে এতটাই কম যে ঘুরেফিরে এই ১৫ থেকে ২০ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নির্বাচকদের ভাবনা। আর সে সুযোগে দলে নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করেন তাঁরা।

 

২০১৯ বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ উঠলেই অধিনায়কের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে! অথচ আসর শুরুর আর বাকি মাত্র ১১ মাস। সময়ের হিসাবে এ সময়টায় বিশ্বকাপের একটা দল মোটামুটি দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা, যে দলটির পরবর্তী গোটা বিশেক ওয়ানডে খেলে মহারণের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুত হয়ে ওঠার কথা। সেখানে মাশরাফি বিন মর্তুজার বিশ্বকাপ ভাবনায় এমন কয়েকজন তরুণ ক্রিকেটার আছেন, যাঁদের ফর্মে ফেরার কোনো লক্ষণই নেই।

টপ অর্ডার দিয়েই শুরু করা যাক। এনামুল হককে একরকম জবরদস্তি করেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এনেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। বোর্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর এই দেনদরবারের কারণ একটাই—বিশ্বকাপে তামিম ইকবালের জন্য একজন উপযুক্ত ওপেনারকে তৈরি করা। ক্রিকেটে অধিনায়কের আস্থা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই পরম পাওয়া। আর সে পাওয়া থেকে খেলোয়াড়ের জ্বলে ওঠার অগুনতি উদাহরণ রয়েছে ক্রিকেটে। কিন্তু গত রাতের ম্যাচের আগেও আস্থার প্রতিদানের কোনো ইঙ্গিত নেই এনামুলের ব্যাটে। জ্যামাইকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে ১৭ রান করে আসা এ ওপেনার প্রস্তুতি আর প্রথম ওয়ানডেতে রানেরই দেখা পাননি।

অবশ্য এনামুল নয়, ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে তামিমের সঙ্গী হিসেবে এমন একজনকে অধিনায়কের সবচেয়ে পছন্দ, যাঁর অবস্থা আরো করুণ—সৌম্য সরকার। গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ব্যাটিংকে চাপমুক্ত করে রাখা বাঁহাতি এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান অনেক দিন হলো নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। তবু সৌম্যকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে মাশরাফি চেয়েছেন ২০১৯ বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করতেই। অথচ টানা ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাওয়া সৌম্য সরকার শেষ কবে ফিফটি করেছেন, মনে করা দুষ্কর। অন্তত যেকোনো পর্যায়ে তাঁর খেলা শেষ ১০ ইনিংসে একজন ব্যাটসম্যানের সাদামাটা একটা অলংকারও নেই। এপ্রিলে ফার্স্ট ক্লাস আসর বিসিএলে (বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ) পূর্বাঞ্চলের বিপক্ষে ৩৫ রানই সৌম্যর সর্বোচ্চ ইনিংস, যাঁর ওয়ানডে গড়ই কিনা ৩৪.৫৩।

টিম ম্যানেজমেন্টের বিশ্বকাপ ভাবনায় আছেন মোসাদ্দেক হোসেনও। ব্যাটসম্যান হিসেবেই তাঁর দৃশ্যপটে আবির্ভাব। কিন্তু ইদানীং অফস্পিনার মোসাদ্দেকের গুরুত্বই বেশি জাতীয় দলে। তাঁর ব্যাটসম্যানশিপের ওপর খুব একটা আস্থাশীল মনে হয় না দলকে। এর কারণও আছে। ইংলিশ কন্ডিশনে ভালো একটা পেস আক্রমণ জরুরি। মাশরাফি আর মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে কোনো প্রশ্ন নেই। রুবেল হোসেন তৃতীয় পছন্দ। তবে তাঁর নৈপুণ্য ধারাবাহিক নয়। সে কারণে বিশ্বকাপের আলোচনায় ফিরে এসেছে গত বছরের অক্টোবরের পর থেকে ওয়ানডেতে ব্রাত্য তাসকিন আহমেদের নাম। লোয়ার মিডল অর্ডারে সাব্বির রহমানের ওপর বাজি ধরেছেন অধিনায়ক। তবে সে বাজিতে তিনি জিতবেনই—সে রকম কোনো নিশ্চয়তা এখনো দিতে পারেননি সাব্বির। বিশ্ব আসরে ভালো দলের অন্যতম শর্ত একজন লেগস্পিনারের উপস্থিতি। জুবায়ের হোসেনকে তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনতে মরিয়া বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট। সে চিন্তা থেকে এই লেগস্পিনারকে ‘এ’ দলে অন্তর্ভুক্তও করেছিলেন নির্বাচকরা। কিন্তু জুবায়েরকে যে খেলায়ইনি ‘এ’ দলের ম্যানেজমেন্ট!

তো, এই হলো বাংলাদেশের ২০১৯ বিশ্বকাপ স্কোয়াডের অর্ধেকটা, যা এখনো অপ্রস্তুত। এটা দেখে দেশের ক্রিকেট অনুরাগীরা আঁতকে উঠতে পারেন। আর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন লিটন কুমার দাস কিংবা ইমরুল কায়েস। অবশ্য এ বিষণ্নতায় অনেকটা দায়ই তাঁদের। এনামুল কিংবা সৌম্যর সঙ্গে তুলনায় রানের অঙ্কে পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে লিটন। তবু একটা অনুযোগই তাঁকে দূরে রাখছে একাদশ থেকে। উইকেটে সেট হয়ে বাজে শট খেলে আউট হন লিটন, যা বিপদ ডেকে আনে দলের। অবশ্য আশার কথা, নেটে বিস্তর খাটছেন তিনি, যা দেখে কোচিং স্টাফরা বেশ আশাবাদীও। আর ঠিক ততটাই তাঁরা হতাশ ইমরুল কায়েসের ব্যাপারে। বিশ্বকাপ নাকের ডগায়, নিজেকে প্রমাণেরও উপযুক্ত সময় এটা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি থেকে বাদ পড়ার পর ক্রিকেটের সঙ্গে থাকার জন্য বাঁহাতি ওপেনারকে ‘এ’ দলের হয়ে আয়ারল্যান্ডে পাঠাতে চেয়েছিলেন নির্বাচকরা; কিন্তু সন্তানসম্ভাবনা স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য ওই সফর থেকে ছুটি চেয়ে নেন ইমরুল। তাতেও কোনো সমস্যা ছিল না, যদি তিনি দেশে ফেরার পথে ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ দেখার নামে নিউ ইয়র্কে ঘোরাঘুরি না করে স্ত্রীর কাছে ছুটে যেতেন। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি কেউই, নেওয়ার কথাও নয়।

অবশ্য এ আর নতুন কী! বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমনটাই হয়। একজনের ব্যর্থতা আরেকজনের সামনে পথ খুলে দেয়। নইলে এক দশকের ওপেনার জীবনে তামিমকে ১৪ জনের সঙ্গে জুটি বাঁধতে হবে কেন? তাই ফর্ম আর স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে গিয়ে ইমরুল যতই বিরক্তির উদ্রেক করে থাকুন না কেন ম্যানেজমেন্টের মনে, বিশ্বকাপের দলে দেখা যেতে পারে তাঁকেও। কেননা মূল আসরের দল ঘোষণার আগে এমন কিছু ঘটনা ঘটবে যে তাতে অধিনায়কেরও আর নিজের চিন্তার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে না। বিশ্বকাপের আগে যত বেশি সুযোগ তত বেশি মূল আসরের স্কোয়াড থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি। বরং আড়ালে-আবডালে থাকলেই ফাঁকতালে মিলে যেতে পারে টিকিট, কেউ না কেউ তো ব্যর্থ হবেই হবে! আন্তর্জাতিকমানের ক্রিকেটার দেশে এতটাই কম যে ঘুরেফিরে এই ১৫ থেকে ২০ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নির্বাচকদের ভাবনা। আর সে সুযোগে দলে নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করেন তাঁরা।

বিশ্বকাপের সম্ভাব্য স্কোয়াড নিয়ে সম্ভবত আর কোনো দেশ এতটা অপ্রস্তুত নয়, দ্বিধায়ও নেই। তবে যাবতীয় সংশয় মুছে দিতে পারেন এ তরুণরাই। দুর্ভাবনার ব্যাপার হলো, তাঁদের ক্রিকেটে সে দায় মেটানোর কোনো চেষ্টা দৃশ্যমান নয়। ইচ্ছা আছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়!



মন্তব্য