kalerkantho



‘হোম অ্যাডভান্টেজ’ চলে যাচ্ছে কেলেঙ্কারির জায়গায়

২৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



‘হোম অ্যাডভান্টেজ’ চলে যাচ্ছে কেলেঙ্কারির জায়গায়

গায়ানা থেকে প্রতিনিধি : ‘হোম অ্যাডভান্টেজ’। ঘরের মাঠের সুবিধার বিষয়টি যেন ক্রমশই বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারির পর্যায়ে নেমে আসছে! এত দিন ঘরের মাঠের সুবিধা সীমাবদ্ধ ছিল তিনটি ক্ষেত্রে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় পেসারদের দাপট আর উপমহাদেশে স্পিনারদের রাজত্ব—এ নিয়ে গাঁইগুঁই করে লাভ নেই। নিজেদের অভ্যস্ত আবহাওয়ার সুবিধা তো সব স্বাগতিকের জন্য ঈশ্বরপ্রদত্ত সুবিধা। গ্যালারি থেকে সমর্থনের ব্যাপারটি নিয়েও কিছু বলার নেই। এত দিন এসবেই হোম অ্যাডভান্টেজের চিরায়ত বৃত্ত ভেঙে এখন স্বাগতিকরা আরেকটি বিষয়েও যথেষ্ট মনোযোগী—সফরকারী দলকে যেন ‘নিয়মে’র মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ সমস্যার মুখে ঠেলে দেওয়া যায়! ওয়েস্ট ইন্ডিজে এসে যেমন পদে পদে সেরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের।

ক্রিকেটের অনেক উপাধি আছে। একসময়ের ভদ্রলোকের খেলা বরাবরই অনিশ্চয়তার চাদরে মোড়ানো। অগুনতি পরিসংখ্যানের কারণে সে খেলাটাই আবার রেকর্ডের আধার। আর ক্রিকেটই সম্ভবত একমাত্র খেলা, যে খেলায় ব্যবহৃত বল নিয়ে গবেষণা হয় সবচেয়ে বেশি। সব খেলার সরঞ্জামেরই ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ড আছে। আছে আন্তর্জাতিক ম্যাচে ব্যবহার্য সরঞ্জামের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড। ক্রিকেট বলেরও আছে। তবে একটা শুভঙ্করের ফাঁক আছে এখানে। এই যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্ট সিরিজে ব্যবহৃত বল নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগেছে বাংলাদেশ। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে এসে ইংল্যান্ডে তৈরি ডিউক বলে টেস্ট খেলতে হবে, এটা আগেই জানতেন সাকিব আল হাসানরা। দিন আটেক আগে এখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি ডিউক বলেই সেরেছিলেন তাঁরা। কিন্তু ম্যাচে নেমে দেখেন ডিউক টেস্ট বলেই খেলা হচ্ছে, তবে সেটির রং আর সিমের আকারের সঙ্গে তাঁদের প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত বলের অমিলটা পরিষ্কার। ক্যারিবীয় বোর্ড ডিউকের যে টেস্ট বলটি বাছাই করেছে, সেটির রং অপেক্ষাকৃত কালো এবং সিমও অপেক্ষাকৃত ভারী। ক্রিকেটে বলের রকমফের ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করে। অবশ্য এর প্রভাবেই ৪৩ আর ১৪৪—এমন শিশুতোষ দাবি তোলেনি বাংলাদেশ দল, তোলার সুযোগও নেই! তাতে যদিও ওই প্রশ্নটি বাতিল হয় না যে, আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান কেন দুই ধরনের বল তৈরি করবে?

উত্তর একটাই—হোম অ্যাডভান্টেজ। ইয়ান পন্ট কিছুদিন বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচ ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের শোনা যে নিজেদের মাঠে ইংল্যান্ড এখন টেস্ট খেলে জেমস এন্ডারসনের বাছাই করা বলে! হোম সিরিজের আগে তিনি নাকি সোজা চলে যান ডিউকের ফ্যাক্টরিতে। সেখান থেকে নিজের হাতে বাছাই করে নেন ম্যাচ বল। ভারতে খেলা হয় এসজি টেস্ট বলে। তবে এখানেও রকমফের আছে। হোম সিরিজে নাকি এসজির বিশেষ ক্যাটাগরির বল ব্যবহার করে বিরাট কোহলির দল। বল নিয়ে কারিকুরি বাংলাদেশও করে। তবে সেটা নিজের সুবিধার চেয়ে অন্যের অসুবিধার জন্যই বেশি! কখনো এসজি, কখনো বা কুকাবুরায় খেলার অন্যতম কারণ প্রতিপক্ষকে অনভ্যস্ত বলের সামনে ফেলে দেওয়ার জন্য।

একটা সময় সফর শুরুর আগে বিস্তর প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়া হতো সফরকারী দলকে। ২০০৫ সালের ইংল্যান্ড সফরে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে তিনটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশও। ব্যস্ত সফরসূচির কারণে ইদানীং প্রস্তুতি ম্যাচের সংখ্যা কমেছে। টেস্ট সিরিজের আগে একটি, তিন দিনের আর ওয়ানডের আগে আরেকটি প্রস্তুতি ম্যাচের বেশি থাকে না সাধারণত। বাংলাদেশের জন্যও ছিল। তাই বলে এক দ্বীপে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে আরেক দেশে গিয়ে মূল ম্যাচে নামার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম হলো মাশরাফি বিন মর্তুজাদের। আর সেটা করতে গিয়ে ক্লান্তিকর বিমানযাত্রার পর বাংলাদেশ দলকে গায়ানায় পৌঁছাতে হয়েছে ম্যাচের ৩৬ ঘণ্টা আগে। এর পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। বোধগম্য কারণ একটাই যে, পছন্দের ফরম্যাটে নামার আগে বাংলাদেশকে যতটা সম্ভব অপ্রস্তুত রাখা। যেখানে ক্যারিবীয়রা চার দিন অনুশীলন করেছে গায়ানার প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামে। অবশ্য ঘরের মাঠে আইসিসির নিয়ম অমান্য করে অজস্রবার সেন্টার উইকেটে অনুশীলন করেছে বাংলাদেশ। প্রতি সিরিজের আগে এক-দুদিন মিডিয়া ব্ল্যাকআউট ছিল নিয়মিত ব্যাপার—ম্যাচ উইকেটের পাশে অনুশীলনের বিষয়টি প্রচারিত হলেই যে বিপদ!

অতিথি দলকে ‘অস্বস্তি’ যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও দেয় না, সে দাবি জোর গলায় করার উপায় নেই। স্পিনে অতিথিদের অনভ্যস্ত রাখার উদ্দেশ্যে নিম্নমানের নেট বোলার পাঠানো কিংবা প্রস্তুতি ম্যাচে কোনো স্পিনারই না রাখার ‘দুরভিসন্ধি’ মহামারি আকার নেয় চন্দিকা হাতুরাসিংহের আমলে। চলে গেলেও এ শ্রীলঙ্কানের মাথায়ই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সফলতম এবং সবচেয়ে ধুরন্ধর কোচের মুকুট রেখে দিয়েছেন তাঁর সাবেক শিষ্যরা! তো, হাতুরাসিংহের ইঙ্গিতেই সফরকারী দলের নেটে বাঁহাতি স্পিনার না পাঠানো...আর পাঠালেও এমন কাউকে পাঠানো হতো যার বল খেলে নেট থেকে ক্ষোভে অতিথি ক্রিকেটারের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। অবশ্য গায়ানায় প্রথম ওয়ানডের আগে একমাত্র প্রস্তুতি পর্বে স্থানীয় নেট বোলারদের সিংহভাগ সময় আড্ডায় ব্যস্ত থাকার কারণও হয়তো একই। মোটকথা ভিনদেশে গিয়ে নেট বোলারের ওপর আর আস্থার জায়গাটিই নেই সফরকারী দলের। সে বাংলাদেশ দল ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাক কিংবা ক্যারিবীয়রা আসুক বাংলাদেশে। নভেম্বরেই জেসন হোল্ডারদের সফর রয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ক্যাম্পের যে ভাবগতিক, তাতে মনে হচ্ছে অতিথি সৎকারের বিশেষ ‘গাইডলাইন’ জমা পড়বে বিসিবির দপ্তরে!

ঘরের মাঠের উইকেট তৈরিতেও হাতুরাসিংহের দূরদর্শিতা অনস্বীকার্য। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে কী ধরনের উইকেটে ফেলতে হবে; বিসিবির প্রধান মাঠকর্মী গামিনি ডি সিলভাকে সে ‘ডিজাইন’ দিতেন হাতুরাসিংহে। তাঁর আমলে সর্বকালের সর্বোচ্চ হোম অ্যাডভান্টেজ নিয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আউটফিল্ড সামান্য ভেজা রেখে বলকে রিভার্স সুইংয়ের উপযুক্ত চেহারা পেতে না দেওয়ার ‘বুদ্ধি’টা যে হাতুরাসিংহেরই—এ নিয়ে সামান্যতম সংশয় নেই তাঁর পুরনো শিষ্য, বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের। সবশেষ নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়েলিংটন টেস্টে ম্যাচের অনেক পরেও দলকে নিয়ে স্টেডিয়ামে তাঁর ওত পেতে থাকার একটাই কারণ ছিল—ওরা যদি সবার অগোচরে উইকেটের চরিত্র বদলের চেষ্টা করে! সে ‘সবুরে মেওয়া ফলেছিল’ হাতুরাসিংহের। ম্যাচের রিভার্জ আম্পায়ারের (স্থানীয়) নজরদারিতে ম্যাচ উইকেটের পাশেরটিতে পানি দিচ্ছিলেন কিউরেটর, যা আইসিসির আইনে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এতে করে যে ম্যাচ উইকেটের চরিত্র বদলায়! এ নিয়ে ম্যাচ রেফারিকে অভিযোগ করেও সুফল পায়নি বাংলাদেশ।

তাতে কী, হোম টিমের কারসাজি যে বাংলাদেশের অজানা নয়— সেটি তো জেনেছিল নিউজিল্যান্ড! বড় ক্যানভাসে অবশ্য ফুটে উঠছে অন্য ছবি—ঘরের সুবিধা নিতে কেলেংকারির কাদায় নামতেও রাজি ক্রিকেটের সব দেশ। তাহলে আর বল টেম্পারিং নিয়ে অযথা এত হৈচৈ যে কেন হয়। ‘স্পিরিট অব ক্রিকেটে’ আর সেই মাদকতা নেই!



মন্তব্য