kalerkantho


মাশরাফির ‘এনামুল’ চ্যালেঞ্জ

২৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মাশরাফির ‘এনামুল’ চ্যালেঞ্জ

তাঁর শুরু দেখে মনে হয়েছিল তামিম ইকবালের দীর্ঘমেয়াদি উদ্বোধনী সঙ্গী বুঝি পেয়েই গেল বাংলাদেশ! বাঁহাতি তারকা ওপেনার নিজে আরো এক ধাপ এগিয়ে নবাগতকে ভূষিত করেন অনন্য এক খেতাবে, ‘আমার চেয়ে ওর হাতে স্ট্রোক অনেক বেশি।’ তবে বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যা হয় আর কি, প্রশংসা-সমুদ্রে ভারসাম্য হারিয়ে হাবুডুবু খেলেন এনামুল হক। চূড়ান্ত বিজয়ের স্বাদ পাব-পাচ্ছি করে করে এখনো পাওয়ার আশায় তিনি। আর এনামুলের নিজেকে ফিরে পাওয়ার পথ করে দিতে গিয়ে সম্ভবত নতুন আরেকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজে সফররত বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের দৃশ্যপটে অনেক দিন ধরেই এক চ্যালেঞ্জের নাম এনামুল হক। জাতীয় দলে নিজের জায়গা ফিরে পেতে তিনি নিজে কতটা লড়াই করেছেন কে জানে, তবে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে দুই দফায় বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এবারের ক্যারিবীয় সফরে এনামুলের অন্তর্ভুক্তির ঘোর বিরোধী ছিলেন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান। তবু মাশরাফির পীড়াপীড়িতে শেষমেশ ওয়ানডে দলের সঙ্গে যুক্ত হন এনামুল। যদিও এ অন্তর্ভুক্তির ব্যাকগ্রাউন্ডে কোথাও তাঁর বিশেষ কোনো নৈপুণ্য নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজে উড়াল দেওয়ার আগে প্রস্তুতির জন্য দুটি ম্যাচেও অবস্থার উন্নতি নেই। দেশে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে ১৭ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভাইস চ্যান্সেলর একাদশের বিপক্ষে ০, একই পরিণতি গতকাল গায়ানার ওয়ানডেতেও। বাংলাদেশের ‘ক্রিকেট-পালস’ বলছে, এনামুলের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন করে শোরগোল উঠবেই দেশে। একে তিনি ফর্মে নেই, তার ওপর ক্যারিবীয় কন্ডিশনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা লিটন দাশ প্রস্তুতি ম্যাচেও যে ৭০ রানের একটি ইনিংস খেলেছেন। তাঁকে বসিয়ে রেখে তাহলে এনামুলকে খেলানো কেন?

কিন্তু ঝুঁকিটা নিয়েছেন মাশরাফি। এটা আর গোপন নেই যে ২০১৫ বিশ্বকাপের পর এনামুলকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ‘নির্বাসনে’ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা ছিল ওয়ানডে অধিনায়কের। দলের চেয়ে স্কোরবোর্ডে নিজের রানেই নাকি বেশি নজর ছিল এনামুলের। এ ধারণার সংক্রমণ পরবর্তী সময়ে পুরো দলেই ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর তিনেক রানে ফেরার পাশাপাশি এ দুর্নাম থেকে মুক্তির জন্যও লড়াই করতে হয়েছে। সে লড়াইয়ে আপাতত তাঁকে জয়ীই মনে হচ্ছে। নইলে বাংলাদেশ দলের ২০১৯ বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় ঢুকে পড়লেন কী করে এনামুল? প্র্যাকটিসে, টিম হোটেলে পুরনো এনামুলের দেখা মিলছে না, যিনি কিনা কারণে অকারণে উচ্ছলতা প্রকাশ করতেন। বরং অনুশীলনে আরো বেশি মনোযোগী। যদিও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এখনো রানের খাতা খোলা হয়নি তাঁর। জ্যামাইকায় প্রস্তুতি ম্যাচে শুরুতেই আন্দ্রে রাসেলের বলে এলবিডাব্লিউ, কাল জেসন হোল্ডারের বলে ক্যাচ দিয়েছেন স্লিপে।

এই দৃশ্যটা অপ্রত্যাশিত নয়। প্রথমত, এনামুলের অজানা থাকার কথা নয় যে বোর্ডের কর্তাব্যক্তিদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজে। দ্বিতীয়ত, নিজে রানে নেই কিন্তু ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন প্রস্তুতি ম্যাচে ফিফটি করা এক সতীর্থ। এমন পরিস্থিতিতে শূন্য রানে আউট হলে ঝড় বইবে দেশজুড়ে, এ যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব থেকে তো আর কেউই মুক্ত নন! সর্বোপরি, ইনিংসের শুরুতে অফস্টাম্প লাইনে পিচ করে বেরিয়ে যাওয়া বলে আউট হওয়ার এটাই প্রথম ঘটনা নয়, আর এনামুল তো আত্মবিশ্বাস তলানিতে পড়ে থাকা একজন ব্যাটসম্যান। এক ম্যাচ খেলিয়েই তাঁকে আবার ছুড়ে ফেলা অবিচার হবে। যেমনটা, বাংলাদেশ দল এখনো মনে করে এনামুলকে বাদ না দিলে জানুয়ারির ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল জেতা খুবই সম্ভব ছিল।

ওপরের ব্যাখ্যাটা অবশ্য কাল্পনিক! ধরেই নেওয়া যায়, ম্যাচশেষে এমন কিছুই বলা হবে এনামুলের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে। সে ব্যাখ্যা অবশ্য মেনে নেবে কি টিম ম্যানেজমেন্টের চেয়েও বরাবরই ‘ক্ষমতাধর’ বোর্ডের শীর্ষমহল? মনে হয় না। তাতে গায়ানার প্রথম ওভারেই দ্বিতীয় ওয়ানডের একাদশে অন্তত একটি পরিবর্তন অনিবার্য—এনামুলের জায়গা নিচ্ছেন লিটন। এটাও কল্পিত এবং বাস্তবায়ন না-ও হতে পারে। অবশ্য এ জন্য আজ ও কাল টানা ‘ভালো খেলতে’ হবে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে। কেননা, বোর্ড কর্মকর্তা ও দলের ভেতরে গোপন ব্যালটে ভোটাভুটি হলে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে লিটন ঢুকে পড়বেন শেষ দুটি ওয়ানডেতে। প্রথম ওয়ানডের আগেও তো এনামুল নাকি লিটন নিয়ে কম আলোচনা হয়নি দলে। শেষমেশ অধিনায়কের জয় হয়েছে তিনি মাশরাফি বলেই। অবশ্য এতে যুক্তিনির্ভরতাও দেখেন দলের অনেকে। লিটনের সামর্থ্য আছে। তবে হঠকারী শট খেলে উইকেট বিলিয়ে আসার অভিযোগ থেকে মুক্ত নন তিনি। অন্যদিকে উইকেটে সেট হয়ে গেলে লম্বা ইনিংস খেলার প্রশংসাপত্রের কারণে এত বিপত্তির পর এনামুল খেললেন প্রথম ওয়ানডে।

কিন্তু দিনশেষে মাঠের পারফরম্যান্সই অগ্রগণ্য। বাংলাদেশের ক্রিকেট পরিমণ্ডলে আবার যাবতীয় মিডিয়ার প্রবণতা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস আছে ক্রিকেটের ‘করপোরেট’ কর্মকর্তাদের। তাতে এনামুলের ষষ্ঠ ওয়ানডে ‘ডাক’ (টানা দ্বিতীয় শূন্য) দেখার পর আরো সোচ্চার হওয়ার তাদের নীরব বসে থাকার কথা নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, দলের ভেতরেও লিটনের পক্ষে জোর যুক্তি উপস্থাপন হবে দলের ‘কোর গ্রুপে’র সভায়ও।

তিনি মাশরাফি আবার কাউকে একটা সুযোগ দিয়েই ছুড়ে ফেলার মানুষ নন। তার ওপর যে বিশ্বাস থেকে এনামুলের ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তার যথার্থতা প্রমাণের দায়ও তো আছে। এমন অবস্থায় মাশরাফি কোন পথ বেছে নেবেন—এনামুলকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া নাকি জনতার পক্ষাবলম্বন?

খুব কঠিন চ্যালেঞ্জ কিন্তু!



মন্তব্য