kalerkantho


প্রস্তুতির জয়ে আত্মবিশ্বাসের সুবাতাস

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



প্রস্তুতির জয়ে আত্মবিশ্বাসের সুবাতাস

জ্যামাইকা থেকে প্রতিনিধি : ক্রিস গেইল, আন্দ্রে রাসেল আর রোভম্যান পাওয়েলকে বাদ দিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভাইস চ্যান্সেলর একাদশের বাকিরা কে বা কারা! সেই দলের বিপক্ষে বৃহস্পতিবার স্যাবাইনা পার্কে এক দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ৪ উইকেটের জয়ে উচ্ছ্বাসের কোনো সুযোগ নেই। উচ্ছ্বাসের ঢেউও নেই মাশরাফি বিন মর্তুজার কণ্ঠে। তবে বাংলাদেশ অধিনায়ক পুরনো একটা বিশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন ম্যাচ শেষে হোটেলে ফেরার পরও, ‘বাজে সময়ে যেকোনো জয়ই আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।’ আর পুরো ম্যাচের দৃশ্যপট ঘাঁটাঘাঁটি করলেও বাড়তি কিছু অনুপ্রেরণা যোগ করে দেওয়া যায় বাংলাদেশের ভাগে।

প্রথমে টিম নিউজ দেওয়া যাক। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এ ম্যাচে মাশরাফি, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল খেলেননি। তবে তিন দফায় মাঠে নেমেছিলেন অধিনায়ক। বোলিং করেননি, নেমেছিলেন ম্যাচ পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য। এর মধ্যে ছোটখাটো কিছু মাস্টারস্ট্রোকও খেলেছেন। যেমন, সাব্বির রহমানকে দিয়ে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজে যাঁকে ডেঞ্জারম্যান ভাবছে বাংলাদেশ সেই রাসেলকে তুলে নেওয়ার ফন্দি। ক্যারিবীয় এই অলরাউন্ডারের বিধ্বংসী সোজা ব্যাটের ড্রাইভ আটকাতে লং অন আর লং অফ রেখে মাশরাফি নিজে দাঁড়িয়ে পড়েন একেবারে আম্পায়ার বরাবর। তাতে ব্যাটের মুখ খুলে সাইড শট খেলতে গিয়ে কাভারে ক্যাচ দিয়েছেন রাসেল। ক্রিস গেইলকে ধন্দে রাখতে ম্যাচের আনুষ্ঠানিক অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহকে মাঠের বাইরে থেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন মেহেদী হাসানকে বোলিং না করানো হয়। এই অফস্পিনার পরে বোলিং করেছেন। তবে তার আগেই মোসাদ্দেক হোসেনের খণ্ডকালীন অফস্পিনে স্টাম্প ভেঙেছে গেইলের। ২০১৫ সালের পর ওয়ানডেতে ফেরা রাসেলের প্রস্তুতি তাতে কিছুটা হলেও বিঘ্ন ঘটাতে পেরেছে বাংলাদেশ। তেমনি গেইলঝড়ও ওঠেনি স্যাবাইনা পার্কে। বরং আউট হওয়ার আগে কখনোই খুব স্বচ্ছন্দ মনে হয়নি ক্যারিবীয় এ ওপেনারকে।

নিজেদের প্রাপ্তির ভাণ্ডারে আরো কিছু জমা পড়েছে এ ম্যাচে। ১৪ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচের সফলতম বোলার মোসাদ্দেকের খণ্ডকালীন অফস্পিনে নিঃসংকোচে বাজি ধরতে পারবেন মাশরাফি। বিকল্প হিসেবে সাব্বিরের লেগস্পিন নিয়েও স্বস্তিতে রয়েছেন তিনি। নতুন এবং পুরনো বলে রুবেল হোসেনকে দেখে বোঝা গেছে তিনি কেন অধিনায়কের পছন্দ। তবে মুস্তাফিজুর রহমানের কাছে পাওনা প্রত্যাশা পূরণের দাবিটা অপূর্ণই থেকে গেছে এ ম্যাচে। এরই ফাঁকতালে ২০০ রানেরও নিচে গুটিয়ে যাওয়ার হুমকি উপেক্ষা করে স্থানীয় দল করে ৯ উইকেটে ২২৭ রান। শুরুতেই এনামুল হক এলবিডাব্লিউ হয়ে ফিরে আসার পরও জিততে অসুবিধা হয়নি বাংলাদেশ দলের। তবে মাশরাফির আক্ষেপ, ‘আরো সহজে জেতা উচিত ছিল আমাদের। যেভাবে খেলছিলাম তাতে ৬ উইকেটে জেতা উচিত ছিল।’

সেটি হয়নি মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে জুটি বেঁধে দলকে জয়ের ঠিকানা বাতলে দেওয়া লিটন কুমার দাস আউট হওয়ায়। তবে যাওয়ার আগে ছয় বাউন্ডারি আর দুই ছক্কায় ৭৯ বলে ৭০ রান করেছেন তিনি। ম্যাচ শেষ করে মুশফিক ফিরে আসার সময় তাঁর নামের পাশে ৭০ বলে অপরাজিত ৭৫। এনামুলের সঙ্গে ইনিংসের সূচনায় নেমে ৪৩ রানের ইনিংস খেলেছেন নাজমুল হোসেন। তাতে এনামুল, লিটন আর নাজমুলের মধ্য থেকে কাউকে দিয়ে টপ অর্ডারের ফাঁকা জায়গা ভরাট করতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে। এনামুলের যেভাবে ‘এন্ট্রি’ এই সিরিজে, তাতে তাঁকেই মনে হচ্ছে ওয়ানডে সিরিজের তামিম ইকবালের উদ্বোধনী সঙ্গী। হাবেভাবে মনে হচ্ছে গায়ানায় সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে লিটন ও নাজমুলের খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবু শেষমেশ এনামুলকে সরিয়ে একাদশে ঢুকতে পারেন লিটন। প্রস্তুতি ম্যাচে দুজনের পারফরম্যান্স আর এখানকার কন্ডিশনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে এ রেস জিততেও পারেন লিটন। তবে নাজমুলের খেলার কোনো সুযোগ নেই। অন্তত প্রথম ওয়ানডেতে।

ম্যাচ ফলের বাইরেও কিছু পয়েন্ট পাওনা আছে বাংলাদেশ দলের, সেটা মানসিকতার কারণে। নিজেদের চেনা কন্ডিশন বলেই কিনা, স্যাবাইনা পার্কে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি ম্যাচে হৃতশক্তির দল নিয়েও নির্ভার দেখিয়েছে বাংলাদেশকে। সিনিয়ররা ‘ইগো’ নিয়ে পড়ে থাকেননি। নেট অনুশীলনের পাশাপাশি তরুণদের জন্য একটু পরপরই পানি বয়েছেন সাকিব-তামিমরা। একে অন্যের পিঠে ভরসার হাত রেখেছেন, সাফল্যে পিঠও চাপড়ে দিয়েছেন। সাদা পোশাকের টেস্ট সিরিজের শবযাত্রার মতো শোকাবহ পরিবেশ জাপটে ধরেনি এক দিনের প্রস্তুতি ম্যাচের বাংলাদেশকে।

তবে এটা তো নিছকই প্রস্তুতি ম্যাচ। ওয়ানডে সিরিজ শুরু হবে ভিন্ন কন্ডিশনে, পূর্ণ শক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে। কোত্থেকে যেন মাশরাফিরা শুনেছেন গায়ানার উইকেট আগের মতো নেই। আপাতত এটাকে ‘উড়ো খবর’ বলে উড়িয়ে দিতে পারলেও মাশরাফিরা নিশ্চিত যে উইকেটে ঘাস থাকবেই। অধিনায়কসহ বাকিরা ধরেই নিয়েছেন, স্বাগতিকরা নির্ঘাত টার্গেট করবে ব্যাটসম্যানদের। তাতে অবশ্য আতঙ্কিত নয় বাংলাদেশ। বরং উইকেটের ঘাস না আবার বুমেরাং হয়ে আঘাত করে স্বাগতিকদেরই—এমন ভাবনার চাপা উল্লাস মাশরাফিদের অনেকের চোখে-মুখে।

অবশ্য গায়ানায় ঘাস গজালেও ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানদের জন্য করা বাংলাদেশের ছকে স্পিনের অপরিসীম গুরুত্ব থাকছে। সাকিব অবধারিত। তাঁর সঙ্গে স্পিন জুটি হবে মেহেদী হাসানের। মোসাদ্দেক ব্যাট ধরবেন লোয়ার অর্ডারে, সঙ্গে তাঁর হাতে প্রয়োজনে বলও তুলে দিতে পারবেন মাশরাফি। সাব্বিরের সঙ্গে মাহমুদ উল্লাহর উপস্থিতি নানাবিধ বিকল্প দিচ্ছে বাংলাদেশ অধিনায়ককে। ব্যাটিংয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা মূলত একটি ব্যাটিং পজিশন নিয়েই। তামিমের সঙ্গে ইনিংসের সূচনায় কে নামবেন? লিটন নাকি এনামুল?

২২ জুলাই গায়ানায় অনুষ্ঠেয় সিরিজের প্রথম ওয়ানডের আগে এটাই সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের সামনে।



মন্তব্য