kalerkantho



এখনো রহস্য হয়ে বেঁচে আছেন উলমার

সাইদুজ্জামান, জ্যামাইকা থেকে   

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



এখনো রহস্য হয়ে বেঁচে আছেন উলমার

এই এত দিন পরও জ্যামাইকা পেগাসাস হোটেলের ১২ তলার একটি কক্ষে এক ভোররাতে স্মৃতির পাতা ওল্টাতে গিয়ে উলমার মৃত্যুরহস্যের পুরোটাই মনে হচ্ছে হাইপোথেটিক্যাল, ধারণানির্ভর। নাকি বব উলমারের মৃত্যুই হয়নি?

 

পেগাসাস হোটেলের ১৩ তলার লিফট খুললেই সামনে লম্বা করিডর দিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটা দূরত্বে রুম নাম্বার ৩৭৪। সেই রাতে কার্পেটে মোড়ানো এই পথটুকু হেঁটে তিনি নিজের রুমে ঢুকেছিলেন, যে রুম থেকে আর বেরোনো হয়নি বব উলমারের। নাহ্, বেরিয়েছিলেন। জ্যামাইকার একটি হাসপাতালের ময়নাতদন্ত কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁর নিথর দেহ।

ডেটলাইন : ১৮ মার্চ ২০০৭। বাংলাদেশ দল তখন ত্রিনিদাদের হিলটন হোটেলে স্বপ্নের সবটুকু আবির মেখে নিদ্রামগ্ন। বিশ্বকাপের মঞ্চে শচীন-সৌরভের ভারতকে হারিয়ে যে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া গেছে ২৪ ঘণ্টা আগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রয়াত সাবেক সতীর্থ মাঞ্জারুল ইসলামকে। এক দিন বিরতি দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের আরেকটি ভোর কাঁপিয়ে দিয়েছিল বব উলমারের মৃত্যু সংবাদ। অবশ্য শুধু বাংলাদেশ দল কেন, ক্রীড়া ইতিহাসেরই সবচেয়ে রহস্যময় তৎকালীন পাকিস্তান দলের কোচের মৃত্যুর ঘটনাটি।

মনে আছে, ব্রেকফাস্টের পরপরই কে যেন হন্তদন্ত হয়ে খবরটা উপস্থাপন করেছিল ত্রিনিদাদে বাংলাদেশি সংবাদকর্মীদের হোটেলে। ততক্ষণে বিস্ময় আর আতঙ্কে কাঁপছে বিশ্বকাপ। একটা সুস্থ মানুষ নিজের রুমে ঘুমাতে গিয়ে বাথরুমে মরে পড়ে থাকবেন—অবিশ্বাস্য ঘটনা। সেই অবিশ্বাসে ভর করে খুন অথবা আত্মহত্যার দ্বিমুখী গুঞ্জনে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল ক্রিকেটীয় উন্মাদনা। হিলটন হোটেলের সেই দুপুরে বাংলাদেশি ক্রিকেটার-সাংবাদিকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বব উলমারের মৃত্যু। একই দিনে ত্রিনিদাদে বাংলাদেশের কাছে ভারত আর জ্যামাইকায় আয়ারল্যান্ডের হাতে পাকিস্তানের ঘায়েল হওয়ার ঘোর কাটিয়ে ওঠার জন্য নিয়তির কী নির্মম ‘ডাইভারসন’!

বব উলমার—ল্যাপটপ কোচ। আজকের আধুনিক ক্রিকেট বাজারে প্রতিপক্ষকে আগাম বুঝে নেওয়ার এবং নিজের স্কিল বাড়ানোর উপযোগী নানা সফটওয়্যার পাওয়া যায়—এ আইডিয়ার জনক ছিলেন উলমার। ক্রিকেটের মতো ব্যক্তিগত খেলায় দলবদ্ধ চিন্তা, প্রযুক্তির ব্যবহার আর কোচের কার্যকারিতার সূচনা তাঁর হাত ধরেই। এমন ভবিষ্যত্প্রবক্তার তো আশাবাদী মানুষ হওয়ারই কথা। তিনি কেন আয়ারল্যান্ডের কাছে একটি হারে এমন মুষড়ে পড়বেন? তাই শোকে স্তব্ধ উলমার আত্মহত্যা করেছেন—এমন গুঞ্জনের পালে হাওয়া লাগেনি আর। বরং ‘উলমার হত্যাকাণ্ড’ ঘিরেই শিরশিরানিতে আক্রান্ত হয়েছিল ২০০৭ বিশ্বকাপ।

ন্যায্য কি অন্যায্য সন্দেহ হোক, পাকিস্তানি ক্রিকেটার মহলে জুয়াড়িদের আনাগোনার খবর বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়ে যায় নিমেষে। আয়ারল্যান্ডের কাছে দলটির হারের পেছনে কলকাঠি নেড়েছে জুয়াড়িরা—এমন থিওরি তাই অবিশ্বাস্য মনে হয়নি কারোর। উলমারকে সম্ভবত জীবন দিতে হলো অন্ধকার জগতের বিষয়টি জেনে যাওয়ার জন্যই। নাকি পাকিস্তান দলের কোনো সদস্যই ব্যক্তিগত আক্রোশের বশে এই কাজটি করেছেন? কে, কেন এবং কিভাবে বব উলমারকে হত্যা করেছে—দম বন্ধ করা থ্রিলারকেও হার মানিয়ে দেওয়া কল্পকাহিনি প্রকাশিত হতে থাকে খবরের পাতায় পাতায়।

সংবাদকর্মীদের দোষ কী? স্টকল্যান্ড ইয়ার্ড ঘুরে জ্যামাইকা পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার মার্ক শিল্ডসই সরকারিভাবে মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন, ‘বল প্রয়োগ কিংবা খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বব উলমারের।’ বল প্রয়োগ কারা করল? জ্যামাইকার অপরাধজগতের কোনো প্রতিনিধি? না, ক্যারিবীয় এই দ্বীপে শ্বাসরোধ কিংবা বিষ প্রয়োগে হত্যার ‘রীতি’ নেই, গুলি করে উড়িয়ে দেয় তারা। এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের জুয়াড়িরা তাদের অপারেটদের দিয়ে কি খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল? সে রাতে রুম সার্ভিস অর্ডার করিয়ে ডিনার সেরেছিলেন উলমার। হতে পারে। সেই সন্দেহ আরো উসকে দেয় হোটেল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা। রুম সার্ভিসের কাছে ‘লাস্ট সাপারে’ কী চেয়ে নিয়েছিলেন উলমার, সেটি তারা নাকি জানেই না!

এর মধ্যে ময়নাতদন্ত মোড় ঘুরিয়ে দেয় বিষক্রীড়া ত্বত্ত্বের। উলমারের নাকে রক্ত আর ঘাড়ে আঘাতের চিহ্ন দেখে মার্ক শিল্ডসের সন্দেহ আরো ঘনীভূত—জবরদস্তিতে মৃত্যু হয়েছে উলমারের। পাকিস্তান দলের কোচিং স্টাফদের এক সদস্যের মুখে আঁচড়ের দাগ আর ম্যানেজার তালাত আলীর নিজের নাম ভারিয়ে হোটেল রিজার্ভেশন সন্দেহের তীর ঘুরিয়ে দেয় পাকিস্তান দলের দিকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যা ঘটে, তা নজিরবিহীন। ২৪ মার্চ মন্টেগো বে বিমানবন্দরে দেশে ফেরার বিমানে ওঠার পথে পাকিস্তান অধিনায়ক ইনজামাম উল হকসহ তিনজনকে আটকে দেওয়া হয়। অবশ্য ওই ফ্লাইটেই তাঁরা দেশে ফিরেছেন, তবে জন্ম দিয়ে গেছেন আরো অনেক প্রশ্নের এবং সন্দেহের।

দিন যায় আর সন্দেহের দিকবদল হয়। তত দিনে বিশ্বকাপ নিয়ে দেশে ফিরে গেছে রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়া। ক্রিকেটের হাওয়ার সঙ্গে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে সরে যায় উলমারের মৃত্যুরহস্যও। জ্যামাইকার ময়নাতদন্তকারী দল নতুন করে জানায় যে উলমারের ঘাড়ে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল না। অ্যাজমার রোগী উলমারের মৃত্যু হয়েছে প্রবল কাশির তোড়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু দক্ষিণ আফ্রিকার নামি ক্রীড়া সাংবাদিক নিল ম্যানথ্রপের বক্তব্যে এই দাবির পক্ষে ইঙ্গিতও রয়েছে। থাই খাবারের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল উলমারের। কে না জানে যে সে দেশীয় খাবারে বাড়তি একটা ঝাঁজ আছে। কাশির দমক উঠতেই পারে, অ্যাজমার রোগীদের জন্য যা বিপজ্জনক। কক্ষে একা উলমার হয়তো সে রকম একটা মুহূর্তেরই নিষ্ঠুর শিকার!

এই এত দিন পরও জ্যামাইকা পেগাসাস হোটেলের ১২ তলার একটি কক্ষে এক ভোররাতে স্মৃতির পাতা ওল্টাতে গিয়ে উলমার মৃত্যুরহস্যের পুরোটাই মনে হচ্ছে হাইপোথেটিক্যাল, ধারণানির্ভর। নাকি বব উলমারের মৃত্যুই হয়নি? তদন্ত কর্মকর্তার দুই রকম ভাষ্য : রুম সার্ভিস থেকে তাঁর খাবারের অর্ডার গায়েব হয়ে যাওয়া, তাঁর অ্যাজমা, থাই ফুডপ্রীতি এখনো রহস্য হয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে বব উলমারকে।

ওহ্, বলা হয়নি, চেক ইনের সময় অনুচ্চে অনুরোধ করেছিলাম যদি ১৩ তলার ৩৭৪ নাম্বার রুমটা যদি খালি থাকে। তরুণ ফ্রন্টডেস্ককর্মী কী বুঝল কে জানে, বলল—ওটা খালি নেই। পেগাসাসের সব ফ্লোরেই একই নাম্বারের রুম আছে। যেমন—৩৭৪ নম্বর রুম আমার ফ্লোরেও আছে। ওটা দেখেছি, কিন্তু এক ফ্লোর ওপরের অভিশপ্ত রুমটা দেখা হয়নি, যে রুমে শেষবার তালা খুলেছিলেন বব অ্যান্ড্রু উলমার।



মন্তব্য