kalerkantho



ওয়ানডেতে কি ভাগ্য বদলাবে?

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ওয়ানডেতে কি ভাগ্য বদলাবে?

মাশরাফির আগেই দলে যোগ দিয়েছে পাঁচজনের ওয়ানডে ব্রিগেড। মাশরাফি-তামিমদের জ্যামাইকা নিবাস পেগাসাস হোটেলের ১৫ তলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা, ঝিমিয়ে পড়া ‘টাইগার’দের নাকি আবার জাগিয়ে তুলেছে।

 

 

 

গরিবের ভাগ্য—এটাই বাংলাদেশের টেস্ট বিপর্যয়ের সম্ভাব্য সেরা ‘ট্যাগলাইন’। টি-টোয়েন্টির হুল্লোড়ের যুগেও টেস্ট ক্রিকেট এলিট শ্রেণির, যেখানে এখনো অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে বাংলাদেশের। সমাজের এই গোত্রের জীবনে আবার দুর্ভাগ্যও হানা দেয় নিয়ম করে। অপরূপ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে এসেও যে দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। তাতে টেস্ট দীনতা আরো প্রকাশিত; ৪৩ আর ১৪৪ তার কিছু নমুনা মাত্র।

প্রায় ৪০ ঘণ্টা বিমানযাত্রা শেষে মাশরাফি বিন মর্তুজা জ্যামাইকায় এসে পৌঁছেছেন বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টায়। লবিতে তাঁকে স্বাগত জানাতে বসে ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার রাবীদ ইমাম। ঘটনাচক্রে সে সময় সেখানে সপরিবারে উপস্থিত বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও। সতীর্থকে দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি, সে হাসিতে সম্ভবত স্বস্তিই মিশে। সেই স্বস্তি টেস্ট বিপর্যয় থেকে মুক্তির, দুটো বিশাল হারের বোঝা যদি এবার কাঁধ থেকে সরে! মাশরাফির আগেই দলে যোগ দিয়েছে পাঁচজনের ওয়ানডে ব্রিগেড, দীর্ঘকাল ধরে পূর্ণাঙ্গ সিরিজে যে ফরম্যাট এলেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচে বাংলাদেশ। মাশরাফি-তামিমদের জ্যামাইকা নিবাস পেগাসাস হোটেলের ১৫ তলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা, ঝিমিয়ে পড়া ‘টাইগার’দের নাকি আবার জাগিয়ে তুলেছে। রাতের দলীয় ডিনারে ক্লান্ত মাশরাফি ঘুমিয়ে পড়ায়ও সেই চাঙ্গাভাব কাটেনি বলেই খবর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট বিপর্যস্ত বাংলাদেশ দলের জন্য আপাতত সুখবর এটাই। তবে সেই সুখবরেও মিশে হাজারটা দুর্ভাবনা; দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাওয়ার নিশ্চয়তা তো আর নেই বল মাঠে গড়ানোর আগে!

মাশরাফির কথাই ধরুন। ডানে মুস্তাফিজুর রহমান আর বাঁয়ে রুবেল হোসেনকে নিয়ে ২২ জুলাই গায়ানায় প্রথম ওয়ানডে খেলতে নামবেন অধিনায়ক। তবে তিনি কি প্রস্তুত ক্যারিবীয় সফরে মহা গুরুত্বপূর্ণ ঝকমকে প্রথম স্পেলের জন্য? সেই জানুয়ারিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালের প্রায় পাঁচ মাস পর তিনি নামবেন কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে। মাঝে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন বটে, তবে শরীর টিকিয়ে রাখতে সেসব ম্যাচে বোলিং করেছেন ছোট রান আপে। এমনিতেই নড়াইল এক্সপ্রেসের সেই গতি ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে বেশ আগে। তার ওপর রান আপ কমিয়ে বোলিং করলে গতি হ্রাস পাবে আরো, যা ক্রিস গেইল-আন্দ্রে রাসেলদের পেশিশক্তিকে আরো উজ্জীবিত করারই কথা। তাহলে কী করবেন অধিনায়ক? ছোট রান আপ, নাকি দীর্ঘ বিরতির পর ম্যাচে লম্বা রান আপেই ফিরবেন? বিমানভ্রমণকালে ঘুরেফিরে এজাতীয় প্রশ্নে স্থির উত্তর মেলেনি মাশরাফির কাছ থেকে। লাইন আর লেন্থটাই তাঁর অবলম্বন। সেটা ঠিক রাখতে গেলে ছোট রান আপে যাওয়াই ভালো। আবার প্রথম স্পেলে উইকেট নিয়ে গেইলঝড় থামাতে চিরায়ত লম্বা রান আপে কি যাওয়াই উচিত নয়—দোটানায় স্বয়ং মাশরাফি। একটা সুযোগ ছিল এই দোদুল্যমানতা থেকে মুক্তির, বৃহষ্পতিবারের প্রস্তুতি ম্যাচ। কিন্তু ক্লান্তিকর বিমানযাত্রার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে মাশরাফিকে প্রস্তুতি ম্যাচে নামিয়ে বড় কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি কোচ স্টিভ রোডস। হোটেলের লবিতে পৌঁছেই খবরটা পেয়ে যান মাশরাফি, প্র্যাকটিসের পর টিম মিটিংয়ে কোচ জানিয়ে দিয়েছেন যে অধিনায়ক খেলছেন না প্র্যাকটিস ম্যাচে। সাকিব আর তামিম ইকবালেরও মিলেছে ছুটি।

এতে ক্যারিবীয় ক্রিকেট বোর্ডের আচমকা মহা আয়োজন কিছুটা হলেও রং হারিয়েছে। ক্রিকেটে বেনিফিট ম্যাচ নতুন কিছু নয়। তবে সফরের প্রস্তুতি ম্যাচ সাবেকদের নামে ‘উৎসর্গ’ করাটা অবশ্যই নতুন। স্যাবাইনা পার্কে ক্যারিবীয় একাদশ বনাম বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতি ম্যাচে কোর্টনি ওয়ালশ ও প্যাট্রিক প্যাটারসনের অবদানকে স্মরণ করছে ডাব্লিউআইসিবি। আর সে ম্যাচেই কিনা ‘থ্রি স্টার’হীন বাংলাদেশ! অবশ্য এতে ক্যারিবীয়দের আড়ম্বরে ঘাটতি নেই। ক্রিস গেইল-আন্দ্রে রাসেলরা যে নেমে পড়েছেন প্রস্তুতিতে।

স্থানীয়দের প্রস্তুতি ম্যাচের একাদশ দেখে মনে হলো একটু চমকে গেছে বাংলাদেশ। যাঁকে ধরেবেঁধে আনতে হয়, সেই গেইল কিনা নেমে পড়ছেন প্রস্তুতি ম্যাচে! শুরু তাঁর আর শেষটা রাসেলের ধরে নিয়ে বাংলাদেশের গেম প্ল্যানে মাশরাফি অপরিহার্য অস্ত্র। এখন সিরিজ শুরুর আগেই যদি সেই অস্ত্রের নিশানা ‘পড়ে ফেলেন’ গেইল-রাসেল, তাহলে তো সর্বনাশ! বোঝা গেল, ক্লান্তির পাশাপাশি আসল লড়াইয়ের আগে আড়ালে রেখে মাশরাফিকে আরো তৈরি হতেই কোচের এ সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তে ওয়ানডে অধিনায়কের নিজেরও আপত্তি নেই, তা যতই ম্যাচ প্র্যাকটিসের ঘাটতি থাকুক না কেন। গরিবের দুর্ভাগ্য তো একেই বলে, অধিনায়ককে মাঠে নামতে হচ্ছে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই!

অবশ্য এই সফরের প্রস্তুতিও তো হয়েছে নামকাওয়াস্তে। আফগানিস্তান সিরিজের আগে লম্বা ক্যাম্প হয়েছে। টি-টোয়েন্টির ওই সিরিজের পর দুই সপ্তাহের ট্রেনিং হয়েছে। ৪ জুন প্রথম টেস্টের আট দিন আগে বাংলাদেশ অ্যান্টিগায় পৌঁছে কন্ডিশন মানিয়ে নিতে। সাফল্যের ‘রোডম্যাপ’ ত্রুটিমুক্তই ছিল। কিন্তু ওই যে দুর্ভাগ্যের গাঢ় ছায়া নিয়েই ঘুরেছে বাংলাদেশ। হঠাৎই চন্দিকা হাতুরাসিংহের বিদায়ের পর হেড কোচহীন বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের শুরু থেকে দলের সঙ্গে আছেন বটে রোডস, তবে এসেই ঝটিতি তিনি সব ধরে ফেলবেন—এতটা আশা করা বাড়াবাড়ি। কোর্টনি ওয়ালশ ছিলেন এবং আছেন। তবে তিনি পরম পূজনীয় কিন্তু কড়া হেডমাস্টার নন, নিখাদ বন্ধুপ্রতিম। মূল পরিচয়ে ওয়ালশ বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ। তবে পেসারদের তিনি কী শেখাচ্ছেন কিংবা রুবেল হোসেনরা তাঁর কাছ থেকে কী শিখছেন—সে প্রতিবেদন তৈরিতে আর বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য ওয়ালশকে ‘টার্গেট’ করে লাভ কী, স্পিন বোলিং কোচ সুনীল যোশীর দ্বারা সাকিব-মিরাজদের বেজায় উপকৃত হওয়ার খবরও তো শোনা যায় না!

বেচারা সোহেল রহমান! ক্যারিবীয় সফরে দলের সঙ্গে এসেছেন ফিল্ডিং কোচের তকমা গায়ে করে। অথচ এখানে আসার পর থেকেই বিরামহীন থ্রো ডাউন করে যাচ্ছেন তিনি ব্যাটসম্যানদের। ব্যাটিং কোচ নেই যে! নিল ম্যাকেঞ্জির দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল ৭ জুন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা করাতে করাতে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক এই ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং পরামর্শক হিসেবে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা ২৪ জুলাই, প্রথম ওয়ানডের এক দিন পর। সিরিজের মাঝপথে এসে তিনি কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন ব্যাটসম্যানদের নৈপুণ্যে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে প্রবল।

ফিল্ডিং পরামর্শক রায়ান কুক অবশ্য এসে পড়েন টেস্ট সিরিজের সময়ই। খেলোয়াড়দের হাবেভাবে বোঝা যায় যে বিস্তর খাটাচ্ছেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। এর মূল ‘মন্ত্রণাদাতা’ হেড কোচ স্টিভ রোডস। একটা আন্তর্জাতিক দলের ফিল্ডিং মান কেন এতটা খারাপ হবে—বাংলাদেশকে দেখে নতুন কোচের প্রাথমিক অসন্তোষ নাকি এটাই। তাই উত্তরসূরিদের মতো রোডসও নজর দিয়েছেন ফিল্ডিংয়ে। কারিগর হিসেবে তিনি পেয়েও গেছেন কুককে, যাঁর বন্ধুসুলভ অবয়বটা নাকি হারিয়ে যায় ফিল্ডিং অনুশীলন শুরু হতেই!

অবশ্য কুক নিযুক্ত হয়েছেন পরামর্শক হিসেবে, সিরিজ বাই সিরিজ কাজ করবেন জাতীয় দলের সঙ্গে। কিন্তু সফরে সফরে এই খাটাখাটনি করিয়ে কতটা সুফল তিনি এনে দিতে পারবেন বাংলাদেশ দলকে? উল্টো ফিল্ডিং ড্রিল করতে গিয়ে গোঁড়ালিতে চোট পেয়েছেন শফিউল ইসলাম। আর ফিল্ডিং শেখানোর পরিবেশ তো সিরিজের মাঝপথে থাকে না। বরং দীর্ঘ সময়ের ক্যাম্পে কুককে বেশি দরকার বাংলাদেশ ক্রিকেটের। অবশ্য এমন উপলব্ধির চর্চা বাংলাদেশ ক্রিকেটের বোর্ডরুমে হয় বলে খুব একটা শোনা যায় না। কোচিং স্টাফে নামি-দামি অলংকার যোগ করতে পারলেই তো দায়সারা বোর্ডের!

এভাবেই মহাসমারোহে কোচ আসেন বাংলাদেশে এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চলে গিয়ে একটা শূন্যতা তৈরি করেন। সেই শূন্যতা ভরাট হয় লোক-দেখানো নিয়োগে, যা ক্রিকেটারদের সীমাবদ্ধতা আরো সংকুচিত করে চলেছে নিয়মিত।

গরিবের আসলেই কেউ নেই। ভাগ্যও নয়! তাতে আরো প্রকট ক্রিকেটারদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা।



মন্তব্য