kalerkantho


হার-জিত দুটোর অনুভূতিই আমি জানি

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



হার-জিত দুটোর অনুভূতিই আমি জানি

বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আমরা দুটো মুহূর্ত দেখেছি। যে দুটো মুহূর্তের সঙ্গেই পরিচয় আছে আমার। দুটো বিপরীতমুখী অনুভূতির আনন্দ এবং বেদনা আমি এখনো অনুভব করতে পারি। একটা হলো বিশ্বকাপের রানার্স-আপ হওয়ার কঠিন ও দুঃখজনক অনুভূতি। অন্যটি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ব্যাখ্যাতীত অনুভব। এই দুটো অনুভূতির ভেতর দিয়েই যেতে হয়েছে আমাকে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আমি ছিলাম বেদনাহত। আর ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর ভেসে গিয়েছিলাম আনন্দের জোয়ারে। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে আট গোল করে ব্রাজিলিয়ানদেরও আনন্দে ভাসাতে পেরেছিলাম। এবারের ফাইনাল খেলা ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়া, দুই দলকেই আমি অভিনন্দন জানাতে চাই। ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতার জন্য। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার জিতল তারা। শিরোপাটা ওদেরই প্রাপ্য ছিল। সেই সঙ্গে এটিও বলতে হয় যে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটিও লুকা মডরিচেরই প্রাপ্য ছিল। এই বিশ্বকাপে আমরা কিলিয়ান এমবাপ্পের উত্থানও দেখলাম। মডরিচের সঙ্গে সেও নিজ নিজ দলকে এত দূর নিয়ে আসার ক্ষেত্রে পার্থক্য গড়ে দিয়ে এসেছে।

ফ্রান্স এমন একটি দল নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিল, যেটির মধ্যে শিরোপা জেতার রসদ খুব ভালোভাবেই মজুদ ছিল। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তাদের সামর্থ্যের সেই ছাপ দেখাও গেছে। এক কথায় বলতে গেলে, বড় ট্রফি জেতার মতো একেবারে নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন একটি দল ছিল ওরা। ফ্রান্স অবশ্য বহুদিন থেকেই এমন একটি দল গড়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। আজ এর ফল ওরা হাতে পেল। ওরা মস্কোতে এসেছিলই শিরোপার শীর্ষ দাবিদার হিসেবে। দারুণ জমাট মিডফিল্ড ছিল এই দলটির সাফল্যের অন্যতম প্রভাবক। বল দখলের ভিত্তিতে যেমন ওরা আক্রমণ জোরদার করতে চেয়েছে, তেমনি দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের গতির ওপরও বাজি ধরেছে ওরা। গোলবারে অধিনায়ক হুগো লরিস হয়ে উঠেছিল নিরাপত্তার প্রতীক। সেই সঙ্গে ঈর্ষণীয় ডিফেন্স পেছন থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। এ সব কিছুরই যোগফলে ধরা দেওয়া দ্বিতীয় বিশ্ব শিরোপায় ফ্রান্স ছাড়িয়ে গেল স্পেন আর ইংল্যান্ডকে, যারা একবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। দুইবার করে জেতা আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়েকেও ছুঁয়ে ফেলল ফরাসিরা। যদিও চারবার করে জেতা ইতালি এবং জার্মানির পেছনেই আছে এখনো, আর পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের চেয়ে তো আরো পেছনে।

এই বিশ্বকাপ ধাক্কা খাওয়ার মতো অনেক মুহূর্তও দেখিয়েছে। এই যেমন প্রথম রাউন্ড থেকেই জার্মানির ছিটকে যাওয়া। তবে ওদের বিদায় নেওয়ার বিষয়টি বাদ দিলে এবারের আসর কিন্তু এটি আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে যে লাতিন আমেরিকার চেয়ে ইউরোপের ফুটবল এগিয়ে। লাতিন আমেরিকার ফুটবল এখনো রোমান্টিক ধারণা নিয়ে চলে। দলের সেরা খেলোয়াড় তাদের একেবারে শেষ মিনিটে বাঁচিয়ে দেওয়ার মতো অলৌকিক কিছু করবে, ওই অঞ্চলের ফুটবল এখনো এই বিশ্বাস নিয়েই আছে। কিন্তু এটা তো সঠিক পথ হতে পারে না। লাতিন আমেরিকান ফুটবলের এসব সীমাবদ্ধতা এবার প্রকাশিত হয়ে গেছে। যার মূল্য তারা ইউরোপের বিশ্বকাপে বেশি দূর এগোতে না পারা দিয়ে চুকিয়েছে।

এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত কিছু খেলোয়াড়কে দেখেছি আমরা। অনেকের মধ্যে এমবাপ্পে, গ্রিয়েজমান, মডরিচ ও হ্যাজার্ডের কথা আলাদাভাবেই বলতে হয়। বলতে হয় দ্রুতগতিতে খেলতে অভ্যস্ত দলগুলোর কথাও। যারা এবার বল দখলে রাখার ব্যাপারটি এক পাশে সরিয়ে রেখেই খেলেছে। বিশেষ করে ডিফেন্সকে প্রাধান্য দিয়ে খেলা দলগুলোই এবার ভালো করেছে। পুরো দলকে মাথায় রেখে কৌশল সাজিয়ে খেলেছে যে দলগুলো, তারাই আসরের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠতে পেরেছে। আর যে দলগুলো নিজ নিজ দলের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দ্যুতি ছড়াতে জানা খেলোয়াড়দের সামর্থ্যে আস্থা রেখে খেলেছে, তারা যেতে পারেনি বেশি দূর। প্রতিপক্ষের খেলার জায়গা কমিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকনির্ভর পরিকল্পনা সাজানো দলগুলোই বেশির ভাগ ম্যাচ বের করে নিয়েছে।

এই বিশ্বকাপের প্রায় অর্ধেক গোল হয়েছে ফ্রি কিক, কর্নার অথবা পেনাল্টি এবং এমনকি থ্রো-ইনের কোনো না কোনো একটি থেকে। ডেড বল সিচুয়েশন থেকে প্রয়োজনীয়তাও যেন দিন দিন বাড়ছে। যা গোল করার দারুণ সুযোগও হয়ে উঠছে। খেলাটার কৌশল উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে এর কার্যকারিতাও। এবার একটু মডরিচের কথায় আসি। যদিও বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় এই ক্রোয়াটের সৌভাগ্য যে ফাইনালে ওঠার জন্য তারা তুলনামূলক দুর্বল পথটিই পেয়েছিল। বেলজিয়ামের এডেন হ্যাজার্ডের ক্ষেত্রে যা ছিল একেবারেই বিপরীত। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে পড়ে ওদের বিদায় হয়ে যায়। আমার দৃষ্টিতে মডরিচের সঙ্গে হ্যাজার্ডও এই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়। আর সেরা দল? ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্স। বিশ্বকাপে তারাই সেরা ফুটবল খেলেছে। ইংল্যান্ডও তাদের চেয়ে খুব সামান্যই পিছিয়ে ছিল। এই বিশ্বকাপ বিশ্লেষণ করার মতো আরো অনেক খোরাকই দিয়েছে। এই যেমন বল বেশি দখলে রাখার ব্যাপারটি সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। কিংবা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ থাকার পরেও সেটি ফলাফলে অনূদিত হয়নি। প্রতিপক্ষ নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ এবং ডেড বলের কার্যকারিতাই এবার সাফল্যের মৌলিক শর্ত হয়ে উঠেছিল। নির্দিষ্ট কোনো একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে বিশ্বকাপ জেতার চিন্তাও এখন সময়োপযোগিতা হারিয়েছে। ব্যক্তিগত টেকনিকের চেয়ে সম্মিলিত ট্যাকটিকস বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভিএআর টেকনোলজিও এবার বিশ্বকাপে পরিচ্ছন্ন খেলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রেখেছে বড় ভূমিকা। পরিশেষে বলতে চাই, এই বিশ্বকাপ সেসব দলকে শাস্তি দিয়েছে, যারা ডেড বলে সুবিধা নিতে পারেনি। পুরস্কৃত করেছে তাদেরই, যারা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ডেড বল কাজে লাগিয়েছে।



মন্তব্য