kalerkantho


কিন্তু দেশের ফুটবলের কী হবে

সনৎ বাবলা   

১৮ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



কিন্তু দেশের ফুটবলের কী হবে

লুজনিকি থেকে ফুটবল ফিরছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। রঙিন ফুটবল দুনিয়া হঠাৎ সাদাকালো হয়ে যাবে। অনুরাগীদের জন্য এটা যুগপৎ ধাক্কা এবং কষ্টের। ধাক্কা, কারণ ফুটবলের আনন্দ সাগরে ডুবে থাকার মাস ফুরিয়েছে। এখন গরল ফুটবল গিলতে হবে। এটা আবার নিজের দেশে, এই দুর্ভাগ্যই তাদের কষ্টের কারণ।

এ দেশের মানুষের ফুটবল ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। বিশ্বকাপের মৌসুমই এর প্রমাণ। নিজেদের রাঙিয়ে নেয় তারা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জাসির্তে, এমনকি নিজের বাড়িটিও সাজিয়ে তোলে সেই রঙে। দক্ষিণ আমেরিকার দুই দেশের মানুষও তাদের ফুটবল নিয়ে এমন পাগলামি করে না। অথচ এ দেশের মানুষ সঁপে দিয়েছে নিজেদের ওই দূরদেশের মোহনীয় ফুটবলে। দুর্ভাগ্য, এই সুন্দর ফুটবলের পূজারিদের ভালোবাসা-ভালো লাগার জায়গা থেকে সরে গেছে দেশের ফুটবল। বিশ্বকাপ শেষে তাই এই দুশ্চিন্তায় তারা উতলা হয়। সংবাদমাধ্যমে জানতে চায় দেশের ফুটবলের অবস্থা। বাংলাদেশের ফুটবল কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে এখন? সদুত্তর দিতে পারবেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, যিনি দিনেদুপুরে ২০২২ বিশ্বকাপের খোয়াব দেখেছিলেন। বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপ থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ছন্নছাড়া ফুটবলে তার বেঁচে থাকা এবং ফিফার মানচিত্রে কোনো রকমে টিকে থাকা।

সত্যি বললে, ফিফা-এএফসিই আমাদের ফুটবলের নষ্টের গোড়া। দেশের ফুটবল যখন সেভাবে ফিফা চিনত না তখন কর্মকর্তাদের সব মনোযোগ ছিল দেশের ফুটবলে। যখন ভালোভাবে চিনতে শুরু করেছে তখন মনোযোগ সরে গেছে ফুটবল থেকে। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত মাঠের ফুটবলের সুদিন। বাফুফের আগ্রহ আর ক্লাবগুলোর উৎসাহে রমরমা ছিল ঢাকার মাঠ। ঢাকার বাইরেও ছিল সেই উচ্ছলতা। আমুদে বাঙালির জীবনে আমোদের বড় অনুষঙ্গ হয়ে ছিল ফুটবল। জেলার মাঠে জন্ম নেওয়া ফুটবলার ঢাকার মাঠ মাতিয়ে তারকা হতেন। তাঁদের মাথায় তুলে রাখত দর্শকরা। এখন যেমন ইউরোপে হয়। রমরমা ঘরোয়া ফুটবলের সংস্কৃতিটা আস্তে আস্তে থিতিয়ে যায় নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ থেকে। কর্মকর্তাদের উপেক্ষা-অবহেলায় মূল চারণভূমি জেলার ফুটবল ঝিমিয়ে পড়ে। তারকাশূন্য হয়ে পড়ে মাঠ এবং খাঁ খাঁ করা গ্যালারি যেন হালের ফুটবলের সামগ্রিক শূন্যতার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু কর্মকর্তাদের ফিফা-এএফসি সফর বেড়েছে কয়েক গুণ। বেড়েছে আর্থিক অনুদানও। তবে দেশের ফুটবলের মান বাড়েনি এক ফোঁটাও। বরং দিনে দিনে অধঃপাতে গেছে।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের বছর শেষ করে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ১৫৯তম হয়ে। পরের চার বছরে পিছিয়েছে মাত্র ছয় ধাপ। অত খারাপ ছিল না ব্রাজিল বিশ্বকাপের সময়ও। কিন্তু গত চার বছরে সর্বহারা হয়েছে দেশের ফুটবল। সর্বনিম্ন ১৯৭তম অবস্থানে নেমে এখন আছে ১৯৪-এ। তাহলে অত অনুদান আর ঘন ঘন ফিফা-এএফসি ভ্রমণ! বিস্ময়কর লাগে। স্কুলের খারাপ ছাত্রটিও বকুনির ভয়ে শিক্ষককে এড়িয়ে চলে। সেখানে দেশের কর্তারা নিত্য যাচ্ছেন ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থায়, অথচ ফুটবলকে ডোবানোর জন্য তাঁদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না!

একটা সময় দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে একটা সম্মানজনক অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। সেটা খুইয়ে এখন নিচের সারির দল হয়েছে। ভুটানের বিপক্ষে অপরাজেয় থাকার গৌরবও খুইয়েছে। ২০১৬ সালে এশিয়া কাপের প্রাক-বাছাইয়ে তাদেরকে ৩-১ গোলে হারায় ভুটান। সুতরাং সাত দেশের কারো সঙ্গে জিতবে, এ কথা বলার সুযোগ নেই। সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের গত তিন আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া বাংলাদেশ আগামী সেপ্টেম্বরে এই টুর্নামেন্ট খেলবে ঢাকায়। খুব কঠিন সময়। তবে নতুন ইংলিশ কোচিং স্টাফ দিয়ে জাতীয় দলকে এই গরমের মধ্যে কাতার পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানে গরমের কারণে রাতে ছাড়া দিনে প্র্যাকটিসেরও সুযোগ নেই। দেশে প্র্যাকটিস করলে কী সমস্যা আর কাতারে করলে কী লাভ, সেটা বাফুফেই জানে। সাফের পরীক্ষায় লাভ-ক্ষতির অঙ্ক পরিষ্কার হবে। ভুটান, নেপাল, পাকিস্তানের গ্রুপ থেকে উতরে সেমিফাইনালে ওঠার কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।

যেকোনো ম্যাচই আসলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য কঠিন। কারণ খেলোয়াড়দের গুণগত কোনো উন্নতি নেই। দেশে গোল করে ম্যাচ জেতানোর খেলোয়াড় নেই। পেশাদার লিগে দেশিরা দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আর খেলে আফ্রিকানরা, ম্যাচ জেতায়ও তারা। আসল গলদ দেশের ফুটবল অবকাঠামোয়। সর্বোচ্চ পেশাদার লিগের বয়স ১০ বছর হয়ে গেল অথচ এর কোনো কাঠামো দাঁড়ায়নি এখনো। একবার পাঁচ ভেন্যুতে হয় তো পরের বছর বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে স্থাণু হয়ে যায়। তা ছাড়া কখন শুরু হবে, কখন শেষ হবে তা কেউ জানে না। কখনো ভরা বর্ষায়, কখনো কাঠফাটা রোদে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শেখেনি। ভালো খেলোয়াড়ের সংকট তো লেগেই আছে। এখন লিগে পাঁচ-ছয়টি বড় দল এলেও মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের অভাবে তারা পারছে না ভালো দল গড়তে। ঢাকার বাইরের ফুটবল ঝিমিয়ে পড়ায় নতুন খেলোয়াড়ও আসছে না সে রকম। খেলোয়াড় তৈরিরও চেষ্টা নেই কারো। ক্লাবগুলোতেও নেই যুব ফুটবলের চর্চা আর বাফুফে একাডেমি করে এক দফা লোক হাসিয়েছে। তা ছাড়া খেলোয়াড় তৈরি হবেই বা কী করে, নিচের সারির লিগগুলোতে পাতানো খেলার মহোৎসব চলে সমানে। ক্যারিয়ারের শুরুতে একজন খেলোয়াড় দেখে তাকে খেলতে হয় না, খেলার ভান করলেই হয়! এভাবে শুরুর পর কেউ আর পারফরম্যান্সের কথা ভাববে না।

একটা দুষ্টচক্রের মধ্যেই ঢুকে গেছে দেশের ফুটবল। ফুটবলকে সামনে রেখে সবাই ভণিতা করে চলে। কেউ খেলার ভান করে, কেউ ফুটবল উন্নয়নের নামে অন্য কিছু করে। তাই ফুটবলও প্রতিশোধ নিচ্ছে।



মন্তব্য