kalerkantho


ফ্রান্স জিতেছে ট্রফি ক্রোয়েশিয়া হৃদয়

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ফ্রান্স জিতেছে ট্রফি ক্রোয়েশিয়া হৃদয়

চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু। মস্কোর ঝিরঝিরে বৃষ্টি যেন ভর করেছে তাদের চোখেও। জাগরেবের রাস্তায় যেন হঠাৎ করেই নেমে এসেছে পাতালপুরীর নিস্তব্ধতা! রবিবার রাতে বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হার যেন উড়তে থাকা একটা দলকে হঠাৎ করেই নামিয়ে এনেছে মাটিতে। কিন্তু এই হারে লজ্জার কিছুই দেখছেন না ক্রোয়াটরা। লুকা মডরিচ আর তাঁর দল যে জয় করে নিয়েছে হৃদয়!

ঠিক এই কথাটাই বলছিলেন উৎসবের প্রস্তুতি নিয়ে জাগরেবের নগরকেন্দ্রে বড় পর্দায় খেলা দেখতে আসা দভরেন স্রিনিচ, ‘ফ্রান্স হয়তো ট্রফিটা জিতেছে, কিন্তু আমরা জিতেছি হৃদয়। ক্রোয়েশিয়াই আসল চ্যাম্পিয়ন এই বিশ্বকাপের।’ পেশায় ট্যাক্সিচালক স্রিনিচ মনে করেন, ফাইনালটাও জিততেই পারতেন মডরিচরা, যদি না রেফারির কিছু সিদ্ধান্ত অন্য রকম হতো, ‘ফাইনালের মতো ম্যাচে ওই রকম একটা পেনাল্টি! রেফারি তো নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না, অনেকটা সময় নিয়েছেন। সংশয়ের সুযোগটা দিতেই পারতেন তিনি। আর তাহলে ফলটা অন্য রকমও হতে পারত।’ দুই দল ১-১ সমতায়, সেই অবস্থায় প্রথমার্ধের শেষদিকে ভিডিও রিপ্লে দেখে দেওয়া পেনাল্টিটি তাঁর মতো অনেক ক্রোয়াট সমর্থকের বুকেই বিঁধেছে শেল হয়ে।

তবে রেফারির ওই সিদ্ধান্তটাই যেন গর্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ক্রোয়াটদের। মাত্র ৪২ লাখ লোকের ছোট্ট একটা দেশ, গৃহযুদ্ধের ধাক্কা সামলে স্বাধীনতার বয়স যার তিন দশকও হয়নি এখনো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে বাঘা বাঘা সব দলকে টপকে সেই পুঁচকে দেশের দলের ফাইনালে ওঠাটাই বা কম কি! দেশের ইতিহাসের সেরা এই সাফল্যকে মনে রাখতেই চান স্রিনিচের মতো ভক্তরা, ‘ওরা আমাদের জাতীয় নায়ক। কয়েকটা দিন আমাদের সব কিছু ভুলিয়ে যেন এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে গিয়েছিল ওরা, আজীবন মনে থাকবে এই কয়েকটা দিনের স্মৃতি। ফাইনালে হারলেও ওরা নায়ক হয়েই থাকবে সেই স্মৃতিতে।’

শুধু কি রাস্তায় নেমে আসা ভক্তদের চোখেই তাঁরা নায়ক? না, সেই আসনটা আসলে পুরো দেশই দিচ্ছে তাদের। লাল-সাদা চৌখুপি জার্সি পরে গ্যালারিতে হাজির হওয়া প্রেসিডেন্ট কলিন্দা গ্র্যাবার তো আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, ফাইনালের ফল যা-ই হোক মডরিচ-রাকিটিচ-পেরিসিচরা নায়কের মর্যাদাই পাবেন। ফাইনালে হারের পর সে দেশের পত্র-পত্রিকার শিরোনামেও তারই প্রতিফলন। ‘ধন্যবাদ, নায়কেরা। তোমরা আমাদের সব কিছু দিয়েছ’—এই ছিল দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক স্পোর্তস্কি নোভস্তির শিরোনাম। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল হাতে মডরিচের একটি ছবি দিয়ে তারা লিখেছে, ‘ভাত্রেনি (ক্রোয়াট ভাষায় যার অর্থ আগুনের গোলা), তোমরা আমাদের গর্ব, তোমাদের নাম চিরদিন লেখা থাকবে সোনার অক্ষরে।’ আরেক দৈনিক ইয়ুতারনি লিস্ত-এর শিরোনাম ‘সাহসী হৃদয়ের নায়কেরা, তোমরা আমাদের গর্বিত করেছ’। ভিসারনি লিস্ত লিখেছে, ‘ক্রোয়েশিয়া তোমাদের সাফল্য উদ্‌যাপন করছে, তোমরা যেন সোনা।’

গতকালই দেশে ফিরেছে এই সোনার ছেলেরা। তাদের বরণ করতে ক্রোয়াটরা ফ্রেঞ্চদেরও যেন পাল্লা দিয়েছে। লুকা মডরিচদের বিমান দেশটির আকাশসীমায় ঢুকতেই দুটি জেট এসকোর্ট দিয়ে নিয়ে গেছে তাঁদের জাগরেবে। বিমানবন্দরের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারে টানানো বিশাল পতাকা। বিমানবন্দরের সামনে হাজার হাজার মানুষ। খেলোয়াড়রা বিমান থেকে নেমেই পেয়েছেন গার্ড অব অনার। রানার্স-আপ মেডেল সবার গলায়। কারো গায়ে জড়িয়ে ক্রোয়েশিয়ার পতাকা, কারো গায়ে লাল-সাদা সেই জার্সি। বুক খোলা জ্যাকেটে সেই জার্সি পরা মডরিচই বিমান থেকে নেমেছেন সবার আগে। হাত উঁচু করে সমর্থকদের অভিনন্দনের জবাব দিয়েছেন। এই দৃশ্য সারা দিনের।

বিমানবন্দর থেকে খোলা বাসে চেপে শহরের প্রাণকেন্দ্র বেন জেলাচিচ স্কয়ারে গেছেন খেলোয়াড়রা। পথে পথে ক্রোয়াটদের অভিনন্দনে সিক্ত হয়েছেন আরেক দফা। বেন জেলাচিচ স্কয়ারে লাখো জনতা সকাল থেকে অপেক্ষায়, সেদিনের ফাইনালের সময় থেকেই হয়তো বা। বিশাল স্কয়ারে লাল-সাদার সেই উচ্ছ্বাসের শুধু তুলনা চলে চ্যাম্পিয়নদের উদ্‌যাপনের সঙ্গেই। ক্রোয়াটরা যে সেই ‘চ্যাম্পিয়ন’ই ভাবছেন মডরিচ, রাকিটিচদের। ফাইনাল স্রেফ একটা স্কোরলাইন হয়ে থাকছে তাদের কাছে, মডরিচরা সোনার কাপ না নিয়ে ফিরলেও ফিরছেন ফুটবলবিশ্বের শীর্ষাকাশ ছুঁয়ে। ৪০ লাখ জনসংখ্যার দেশটির জন্য এই গর্ব যে কতটা তা কাল তাঁদের বীরবরণেই ফুটেছে সবচেয়ে বেশি করে। একদিকে পল পগবা, আন্তোয়ান গ্রিয়েজমানরা কাপ সঙ্গী করে প্যারিসের পথে। শার্ল দ্য গলে ফ্রেঞ্চদের উৎসবের প্রস্তুতি। সেসবকে থোড়াই পরোয়া করে ক্রোয়াটরা বিশাল হৃদয় নিয়ে অপেক্ষায় ছিল তাঁদের বীরবরণে। রাকিটিচরা দেশের মাটি ছুঁতেই সেই অপেক্ষার বাঁধ ভেঙেছে। পুরো জাগরেব, পুরো দেশ হয়ে উঠেছে উৎসবের নগরী। এএফপি



মন্তব্য