kalerkantho


বীরের বেশে দেশে

উন্মাতাল প্যারিস উন্মাতাল ফ্রান্স

১৭ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



উন্মাতাল প্যারিস উন্মাতাল ফ্রান্স

‘উন্মাতাল প্যারিস, উন্মাতাল পুরো ফ্রান্স’। প্যারিসের একটি দৈনিক পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠার শিরোনাম এটা। বিশ্বকাপ জয়ের পর আমোদপ্রিয় ফরাসিরা যেভাবে উদ্‌যাপন করেছে এবং করে চলেছে এই সাফল্য, এই একটা বাক্যে তার খানিকটা আভাস আছে বলা যায়। লুঝনিকি স্টেডিয়ামের বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় রেফারির শেষ বাঁশিটি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আসলে আক্ষরিক অর্থেই যেন ‘মাতাল’ হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। ২০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবলের বিশ্ব শিরোপা জয়ের উৎসব এমনই মাতাল করা ছিল যে তার বলিও দিতে হয়েছে। উৎসব করতে গিয়ে ঝরে গেছে অন্তত দুটি তাজা প্রাণ, পুলিশকে নামতে হয়েছে জলকামান আর টিয়ার শেল নিয়ে, গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় তিন শ সমর্থক!

উৎসবের প্রস্তুতি আসলে চলছিল রবিবার বিকেল থেকেই। ফাইনালের প্রতিপক্ষ অনভিজ্ঞ ক্রোয়েশিয়া; কোচ দিদিয়ের দেশম আর তারকা খেলোয়াড় আন্তোয়ান গ্রিয়েজমানরা আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিলেন, দুই বছর আগে প্যারিসে যে ভুল করেছিলেন এবার সেটা করবেন না। প্যারিসের রাস্তায় তাই ঢল নেমেছিল বিকেল থেকেই। লা ব্লুদের নীল জার্সি পরে, ফ্রান্সের লাল-সাদা-নীল পতাকায় সেজে লক্ষাধিক লোক নেমে এসেছিলেন রাস্তায়। নগরীর প্রতীক আইফেল টাওয়ারের নিচে বিশাল পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটা উপভোগ করতে পাশের রাস্তায়ই হাজির ছিলেন প্রায় এক লাখ ভক্ত। একই দৃশ্য ছিল শম্পস এলিজির আশপাশেও, কিংবা তুলোঁ, লিওঁ আর মার্সেইয়ের মতো অন্য বড় শহরগুলোর নগরকেন্দ্রেও। লুঝনিকি স্টেডিয়ামে গ্রিয়েজমান-পগবা-এমবাপ্পেদের এক একটি গোল এক একবার করে কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে।

সবচেয়ে বড় ঝাঁকুনিটা শুরু হয়েছে মস্কোয় শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে। লুঝনিকির গ্যালারিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর নাচ দেখেই অনুমান করে নেওয়া যায় প্যারিসে তখন কী চলছিল! পাগলামিতে মাখোঁকে ছাড়িয়ে গেছেন ফরাসি ভক্তরা। শম্পস এলিজির আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফের গায়ে তখন ফ্রান্সের পতাকার রং, আর তার ওপরে এক এক করে ভেসে উঠছিল মস্কোর নায়কদের নাম, সঙ্গে তাঁরা যে শহরের বাসিন্দা সেই শহরেরও। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না প্যারিসের রাস্তায়, এতক্ষণ যাঁরা ঘরের ভেতরে বা কোনো রেস্তোরাঁর বড় পর্দায় খেলা দেখছিলেন, এবার তাঁরাও নেমে এসেছেন রাস্তায়। জোর গতিতে গাড়ি ছুটিয়েছেন, কেউ সে গাড়ির জানালা দিয়ে বিপজ্জনকভাবে শরীর বের করে দিয়ে, কেউ ছাদে বসে কেউ বা আবার পেছনের বুটে পর্যন্ত বসে চিৎকার করে গাইছিলেন বিজয়সংগীত। কেউ চড়ে বসেছেন আইফেল টাওয়ারের লোহার কাঠামো বেয়ে, কেউ বা আবার ল্যাম্পপোস্টে।

মার্সেই শহরে তো একদল পুরনো বন্দরের জেটি থেকে লোক ঝাঁপিয়ে পড়েছে পানিতে। ঠিক এ রকমই একটা কীর্তি করতে গিয়ে ছোট্ট শহর এনিসির ৫০ বছর বয়সী এক ভক্তের মৃত্যু হয়েছে, অগভীর একটি খালে ঝাঁপ দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে সময়মতো মাথা তুলতে পারেননি! উত্তরের ওইসে অঞ্চলের এক লোক আবার গাড়ির গতি তোলার পর সামলাতে পারেননি, একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে খুইয়েছেন প্রাণটাই। ফ্রুয়ার শহরে এক বেপরোয়া মোটরবাইক আরোহীর ধাক্কায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে তিন থেকে ছয় বছর বয়সের তিনটি শিশু। নরক গুলজার হয়েছিল শম্পস এলিজিতেও, রাস্তার পাশের একটি ওষুধের দোকানে ভাঙচুর শুরু হলে বাধ্য হয়ে তৎপর হতে হয়েছে পুলিশকে, ব্যবহার করতে হয়েছে জলকামান। দেশের প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, উৎসবে মাত্রা ছাড়ানোর অপরাধে সারা দেশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মোট ২৯২ জনকে! তাতেও কি আর বিশ্বকাপ জয়েল উচ্ছাসে ভাটা পড়ে!

যাদের ঘিরে এত উল্লাস, সেই খেলোয়াড়রা কি কম আনন্দ করেছেন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ভেসে আসছে বেঞ্জামিন মেন্দির ম্যাটাডোর হ্যাট পড়া ছবি, হোটেলে ফিরে ডাইনিং টেবিলে উঠে গোটা ফরাসি দলের গান গাওয়ার ছবি, টিম বাসে তাদের বাঁধন হারা উল্লাস এমনকি সংবাদ সম্মেলন কেন্দ্রেও টেবিলের উপর উঠে উল্লাসের বিরল মুহূর্তগুলোও।

এয়ার ফ্রান্সের বিমানে চড়ে গতকাল স্থানীয় সময় বিকেলে  প্যারিসের প্রধান বিমানবন্দরে অবতরণ করেন বিশ্বকাপজয়ী বীরেরা। দমকল বাহিনী জলকামানের রংধনু বানিয়ে গার্ড অব অনার দিয়ে বরণ করে নেয় বিশ্বকাপজয়ী বীরদের। তাঁদের সংবর্ধনা দিতে বাইরে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে লাখো সমর্থক। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ জানিয়েছেন, বিশ্বকাপজয়ী দলের সব খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান লিজিওন অব অনারে ভূষিত করা হবে। এএফপি, রয়টার্স



মন্তব্য