kalerkantho


সফল বিশ্বকাপের ‘প্রাণ’ স্বেচ্ছাসেবক দল

সামীউর রহমান   

১৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



সফল বিশ্বকাপের ‘প্রাণ’ স্বেচ্ছাসেবক দল

ঘুমন্ত আর মৃত মানুষের তফাৎ কোথায়? প্রাণস্পন্দনে। প্রাণ, যা দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না; তবু প্রাণের অভাবেই অচল হয়ে যায় দেহঘড়ি। তেমনি বিশ্বকাপেরও প্রাণ হচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী; সবাই সবার পেশাদারি কাজটাই করছেন। স্বেচ্ছাসেবকরা এসেছেন নিজে থেকে, কাঁধে তুলে নিয়েছেন নানা খুঁটিনাটি দায়িত্ব। তাঁরা কাজটা বিনা প্রশ্নে করে গেছেন বলেই না সম্ভব হয়েছে সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ আয়োজন।

৩২ দেশ থেকে এসেছেন ফুটবলাররা। আর বিশ্বকাপে স্বেচ্ছাসেবক এসেছেন ১১২টি দেশ থেকে! মোট আবেদন জমা পড়েছিল এক লাখ ছিয়াত্তর হাজার ৮৭০ জনের। সেখান থেকে ২০টি ভিন্ন ভিন্ন সামর্থ্যের ১৭ হাজার ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়োগ দিয়েছিল ফিফা, যাঁদের ভেতর ৬৪ শতাংশ মহিলা আর ৩৪ শতাংশ হচ্ছে পুরুষ। ৯৩ শতাংশ স্বেচ্ছাসেবকই রুশ, বাকিদের নেওয়া হয়েছে অনলাইন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। নানা পেশার লোকজন স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছেন রাশিয়া বিশ্বকাপে। তেলবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেন, সাবেক ফুটবলার, ড্রাগন বোট রেসিংয়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন যেমন আছেন, তেমনি আছেন ৮৩ বছর বয়সী এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী মহিলাও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হ্যাকিং নিয়ে রুশ-মার্কিন সম্পর্কও উত্তপ্ত, অথচ মার্কিন মুল্লুক থেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বেশ কয়েকজন চলে এসেছেন রাশিয়াতে। তাঁদেরই একজন জুলিয়া ইভানোভা। মার্কিন এই কলেজছাত্রী নিজেও ফুটবল খেলতেন, চোট পেয়ে খেলা ছেড়ে দিয়েছেন। মস্কোর স্পার্টাক স্টেডিয়ামে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা জুলিয়া জানালেন, তাঁর ধারণার চেয়ে রাশিয়া একেবারেই আলাদা, ‘স্পার্টাক স্টেডিয়ামে আমি ভলান্টিয়ারদের সঙ্গে কাজ করেছি। আমার কাজ ছিল সবাইকে তৈরি করে দেওয়া। প্রত্যেকেই যাঁর যাঁর পোশাক পেয়েছে কি না, তাঁদের কাজের সূচি ও কাজটা জানে কি না। ম্যাচ শুরুর তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে, দর্শকরা মাঠে ঢুকতে শুরু করে। তাদের পথনির্দেশনা দেওয়া। আমাদের কাজ ছিল খেলা শুরুর সময় কোনো স্বেচ্ছাসেবক যেন মাঠে না থাকে সেটা নিশ্চিত করা।’ ১১ বছর আগে মস্কো বেড়াতে এসেছিলেন জুলিয়া, এবার স্বেচ্ছাসেবক হয়ে এসে দেখলেন বদলে গেছে অনেক কিছুই, ‘আমি বন্ধুদের বলব, টাকা বাঁচিয়ে ঘুরতে চাইলে রাশিয়ায় আসো।’ ভারতীয় যুবক জয়দীপ সেন মাঠে ছিলেন জাপান-পোল্যান্ড ম্যাচে, শোনা যাক তাঁর অভিজ্ঞতা, ‘টিভিতে যা দেখি, তার চেয়ে একদমই অন্য রকম অভিজ্ঞতা, সব কিছু এত সহজ মনে হলেও আসলে তা নয়। আমার কাজ ছিল মাঠে পানির বোতল বিতরণ করা। আমি কয়েকজনের চেহারা চিনতাম। আমি চাইছিলাম রবার্ট লেভানদোস্কির সঙ্গে দেখা করতে। গা গরমের সময় তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করি, অমন বিশ্বখ্যাত তারকাকে সেটাই আমার সামনে থেকে দেখার প্রথম অভিজ্ঞতা। জাপানের সমর্থকদের দেখেছি স্টেডিয়াম পরিষ্কার করতে। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা!’

স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও বাছাই পর্বের চেয়ে কম নয় কোনো অংশে। আবেদনপত্র নেওয়া শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের নভেম্বরে। এরপর সংক্ষিপ্ত তালিকা, স্কাইপে সাক্ষাৎকার এবং সবশেষে ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে এসে চূড়ান্ত মনোনয়ন। প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবককে ২০০ পাতার বিশাল এক ম্যানুয়াল মুখস্থ করতে হয়েছে। ছিল কঠোর আচরণবিধিও। কোনো ফুটবলারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যাবে না, সেলফি তোলা যাবে না; এমন অনেক কিছু।

সেমিফাইনাল শুরুর আগের দিন, লুঝনিকি স্টেডিয়ামের স্বেচ্ছাসেবক কেন্দ্রে এসেছিলেন ফিফার মহাসচিব ফাতেমা সামোরা। সঙ্গে ছিলেন দুই সাবেক ফুটবলার মাইকেল সালগাদো ও হুলিও বাপ্তিস্তা। তাঁরা আনন্দ উৎসবে মেতেছেন স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে, শুনেছেন তাঁদের অসাধারণ সব অভিজ্ঞতার কথা। স্পেনের সালগাদো ও ব্রাজিলের বাপ্তিস্তা, দুজনেই খেলেছেন রিয়াল মাদ্রিদে। দুজনেই খেলেছেন বিশ্বকাপে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সালগাদো বললেন, ‘স্বেচ্ছাসেবকদের প্রাণশক্তি অসাধারণ। যেকোনো রকম সহযোগিতায় তারা সব সময়ই অগ্রণী। তাদের ছাড়া এই বিশ্বকাপ এত সফল হতে পারত না। সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।’ বাপ্তিস্তাও জানিয়েছেন, ‘তোমাদের এই বন্ধুত্ব আর হাসির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। এই বিশ্বকাপটাকে তোমরাই সবচেয়ে সেরা আয়োজনে বদলে দিয়েছ।’

বিশ্বকাপ শেষে জয়ী দল দেশে ফিরবে ট্রফি নিয়ে আর সব স্বেচ্ছাসেবক ঘরে ফিরবেন অসাধারণ সব অভিজ্ঞতা নিয়ে। তাঁদের কাছে সেটা বিশ্বকাপের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়! ফিফা ডটকম



মন্তব্য