kalerkantho


নির্জনেও নিঃসঙ্গ নন পুশকিন

১৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



নির্জনেও নিঃসঙ্গ নন পুশকিন

“মেস তো দুয়েলে

আলেকসান্দের পুশকিন

২৬ মে ১৭৯৯-২৯ জানুয়ারি ১৮৩৭”

নদীর নাম চরনেরিচকা। যার বাংলা অনুবাদ হতে পারে ‘কৃষ্ণনদী’। সেই নদীর পারে সবুজের সমারোহে বিশাল এক পার্ক। ক্লিয়ন, রিপা, লিবিনা, সিরেইন, বিরোজা—হরেক রকম গাছ। কোনো কোনোটি থেকে ঝরছে সাদা ফুল। কোথাও বা থোক হয়ে ফুটে আছে উজ্জ্বল হলুদ। পার্কের মাঝে বর্গাকার এক জায়গা। দুপাশে সবুজ রঙা দুটি করে ল্যাম্পপোস্ট দাঁড়িয়ে দ্বাররক্ষীর মতো। মধ্যিখানে সৌধ। আকারে ক্রমশ ছোট হতে থাকা পাঁচ ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে আকাশছোঁয়া উচ্চতার। এই সৌধের মাঝ বরাবর কালো রঙের গোলে মহান কবির খোদাই করা ছবি। নিচে রুশ ভাষায় ওপরের ওই লেখা। যার বঙ্গানুবাদ, ‘এই সেই ডুয়েলের জায়গা; আলেকসান্দের পুশকিন; ২৬ মে ১৭৯৯-২৯ জানুয়ারি ১৮৩৭’।

আধুনিক রুশ সাহিত্যের জনকের জীবনের শেষাঙ্কের মঞ্চ এটি। চিরপ্রেমিক, চিরদুঃখী, চিরবিপ্লবী কবি আলেকসান্দের পুশকিনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া শেষ ডুয়েল সেন্ট পিটার্সবার্গের কৃষ্ণনদীর পারের এ জায়গায়।

সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রথম দফায় গিয়ে পুশকিনকে খুঁজে পাইনি; বলা ভালো খোঁজার সময়টুকুন করে উঠতে পারিনি। প্রথম সেমিফাইনালের জন্য দ্বিতীয় দফায় যখন ওই শহরে যাওয়া, তখন কি আর তা মিস করা যায়! তবে পুশকিনের এই ডুয়েলের জায়গা খুঁজে পেতে ঘাম ঝরাতে হয় বিস্তর। মস্কো চলে আসার পরও সেটি ভাবলে কপালে জমে যায় বিন্দু বিন্দু ঘাম।

সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রাণকেন্দ্রেই নেভেস্কি প্রসপেক্ট মেট্রো স্টেশন। সেখানে নেমে এক ভলান্টিয়ারকে পুশকিনের কথা জিজ্ঞেস করতেই বলে, ‘এ আর এমন কী, রাস্তার ওই উল্টো দিকে চলে যাও। সিগন্যাল বাতির পর কিছুক্ষণ হাঁটলেই পেয়ে যাবে পুশকিনের মূর্তি।’ মিনিট দশেক হেঁটে সেখানে যাবার পর এই রুশ কবির দেখা মেলে ঠিকই। ভারী ওভারকোটে ঢাকা, উস্কোখুস্কো চুল-দাড়ির, ডান হাত ছড়ানো কালো রঙের ভাস্কর্যের। কিন্তু এটি তো সেই ডুয়েলের জায়গা নয়। আবার জনে জনে জিজ্ঞাসা করে মেট্রোতে তিন স্টেশন পেরিয়ে চরনেরিচকা। সাহায্যে সদাপ্রস্তুত রুশদের প্রতিনিধি হয়ে একজন দেখিয়ে দেন ওই স্টেশনের ভেতরে পুশকিনের আরেক মূর্তি। এটির রং সোনালি। হাত দুটি পেটের দিকে ভাঁজ; চোখের দৃষ্টি সুদূরে। সামনের ছোট্ট এক বোতলে সাদা-বেগুনি-হলুদ রঙের তাজা ফুল। হয়তো কোনো ভক্ত রেখে গেছেন। কিন্তু এ-ও তো প্রার্থিত জায়গা নয়। পৌনে দুই শ বছর আগে নিশ্চয়ই মাটির নিচে আত্মসম্মানের লড়াই করেননি পুশকিন।

ডুয়েল আত্মসম্মানেরই লড়াই। কারো দ্বারা নিজের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে মনে হলে এই দ্বৈরথে আহ্বানের রীতি ছিল আগের যুদ্ধে। একই রকম অস্ত্র নিয়ে দুজনের যুদ্ধ। বেশির ভাগ সময় যা হয় পিস্তল নিয়ে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকেন দুজন; চারপাশে সরকারি কর্মকর্তাসহ আমজনতা দর্শক। দুজনের কোমরে থাকে পিস্তল, হাত ঝোলানো। নির্দিষ্ট সময়ে ডুয়েল শুরুর সংকেত দিলে কোমর থেকে দ্রুত অস্ত্র বের করে পরস্পরের দিকে গুলি ছোড়া। এখানে একজন আরেকজনকে মেরে ফেলা মুখ্য নয়; বরং আত্মসম্মানের জন্য যে নিজের জীবন বাজি রাখছে—এটিই বড় ব্যাপার।

রোমান্টিক যুগের রুশ কবি পুশকিনের আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রখর। ডুয়েলের আহ্বান করতেন তাই প্রায়ই। ৩৮ বছরের জীবনে ২৯টি ডুয়েল লড়েছেন। শেষটি এমন এক ফরাসি অফিসারের সঙ্গে, যিনি পুশকিনের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় চেষ্টা করছিলেন। সে ডুয়েলে পশ্চাদেদশ ও অণ্ডকোষে গুলি লাগা এই কবি মারা যান দুদিন পর। কিন্তু সে মৃত্যুটাও কী আত্মসম্মানের! কতটা গৌরবের!

কিন্তু কৃষ্ণনদীর পারের সেই জায়গাটা কোথায়! রুশরা তো সাহায্য করতে সদাপ্রস্তুত, তবে ভাষার ব্যবধান ঘোচাবে কী করে! চরনেরিচকা মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে একে-ওকে জিজ্ঞেস করে শুরু করি এগোতে। অবশেষে সহায় হয়ে আসেন এক রুশ চিকিৎসক আলেক্সেই। তিনিই ডুয়েলের জায়গায় নিয়ে যান হাঁটিয়ে। হাঁটা বলতে হাঁটা। মেট্রো থেকে বেরিয়ে নদীর ওপরের ব্রিজ পেরিয়ে, রাস্তার ওপরের ওভারব্রিজের পাশ দিয়ে যেন অনন্ত যাত্রা। মাঝে নোভাইয়াদিরেভনা নামের এক রেললাইনও আছে দেখছি। তা ছাড়িয়ে পার্কের ভেতরে পুশকিনের ওই ভাস্কর্যের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে ২৮ মিনিট হাঁটা হয়ে গেছে।

তবু ওখানে গিয়ে মহান এই রুশ কবিকে কিভাবেই না আবিষ্কার করা গেল!

পুশকিনের প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৫ বছর বয়সে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে না করতে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। ওদিকে লেখালেখির পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েন। লেখায়, সাহিত্যসভার বক্তৃতায় জার প্রথম আলেকসান্দারের বিপক্ষে জানান নিজের স্পষ্ট অবস্থান। ‘ওডে টু লিবার্টি’ কবিতার জন্য সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে নির্বাসনে পাঠানো হয় পুশকিনকে। চলে যান ককেশাস, এরপর ক্রিমিয়া, এরপর কামিয়ানকা, চিসিনাউ। গোপন বিপ্লবী সংগঠন ‘ফিলিকি এতিরিয়া’য় যোগ দেন যারা গ্রিসে অটোমান সামাজ্যের পতনের আন্দোলন করছিল। নিজ দেশের অমন সংগঠন ‘ডিসেমব্রিস্ট’-এর সদস্য তো আগে থেকেই। সে কারণে গৃহবন্দি করে পর্যন্ত রাখা হয় তাঁকে। তবু তিনি লেখেন, ‘এই পৃথিবীতে কোনো আনন্দ নেই/ সবাই খোঁজে শুধু শান্তি ও স্বাধীনতা।’

পুশকিনের কাব্যখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছিল দাবানলের মতো। একই সঙ্গে দেনার অনলেও ডুবে যেতে থাকেন ক্রমশ। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো যোগ হয় সুন্দরী স্ত্রী নাতালিয়া পুশকিনার সঙ্গে ফরাসি অফিসার জর্জেস ডি’আন্দ্রেসের পরকীয়ার গুঞ্জন। এসব সহ্য করার লোক কি পুশকিন! ১৮৩৬ সালের ৪ নভেম্বর ডুয়েলের আহ্বান জানান ডি’আন্দ্রেসকে। কবির বন্ধুদের চেষ্টায় তা বাতিল হয়। ঘটনার নতুন মোড়ে ফরাসি অফিসার ১৭ নভেম্বর বিয়ের প্রস্তাব দেন পুশকিনের শ্যালিকা একাতেরিনা গনচারোভাকে। এটি আসলে ছিল তাঁর চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। সেটি বুঝতে পেরে ১৮৩৭ সালের ২৬ জানুয়ারি ডি’আন্দ্রেসকে ভীষণ অপমানজনক চিঠি পাঠান পুশকিন। কবি জানতেন, এই চিঠির একমাত্র জবাব ডুয়েল। ঠিকই তা হলো। 

১৮৩৭ সালের ২৭ জানুয়ারি সেন্ট পিটার্সবার্গের কৃষ্ণনদীর পারের সেই দ্বৈরথে আর পারেননি পুশকিন। আগের ২৮ ডুয়েলে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচেছেন; ২৯ নম্বরে এসে মরলেন আত্মসম্মান নিয়ে। চিরঘুমে শুয়ে পড়েন মায়ের কবরের পাশে।

সেই ঘটনার পর কত বছর পেরিয়ে গেছে! তবু পৌনে দুই শ বছর পরও রুশরা পুশকিনকে মনে রেখেছেন। ভালোবাসায়। প্রেমে। বিপ্লবে। সেন্ট পিটার্সবার্গের সেই দুপুরে সবুজ বনানীর মাঝে বাতাসে উড়ে আসা হলুদ-সাদা ফুলে তাঁদের শ্রদ্ধাঞ্জলিই অনুভব করলাম যেন! পার্কের নির্জনেও তাই নিঃসঙ্গ নন আলেকসান্দের পুশকিন!



মন্তব্য