kalerkantho


রক্ষণেই ফ্রান্সের শক্তি

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



রক্ষণেই ফ্রান্সের শক্তি

আন্তোয়ান গ্রিয়েজমান, কিলিয়ান এমবাপ্পে, অলিভিয়ের জিরদ। তাঁদের পিছনে পল পগবা, ব্লেইস মাতুইদি। দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স দলের শক্তির জায়গা কোনটি, এই নামগুলোই বলে দিচ্ছে সেটা। এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা আক্রমণ, মধ্যমাঠ থেকে তাঁদের জোগান দেওয়ার জায়গাটাও রীতিমতো ঈর্ষণীয়।

কিন্তু বাস্তবে হচ্ছেটা কী?

নক আউট পর্বের টানা তিন ম্যাচেই যে লা ব্লুজদের আসল নায়ক রক্ষণদুর্গের প্রহরীরা! লিওনেল মেসি-লুইস সুয়ারেসদের পর মঙ্গলবার এডেন হ্যাজার্ড-রোমেলু লুকাকুদেরও সামলে তো রেখেছেনই, সঙ্গে গোল করার কাজটাও নিয়েছেন নিজেদের কাঁধেই! টানা পাঁচ ম্যাচ খেলেও কোনো গোল পাননি স্ট্রাইকার জিরদ। কিন্তু বেনজামিন পাভার্দ, রাফায়েল ভারান আর স্যামুয়েল উমতিতিরা সেটা বুঝতেই দিচ্ছেন না। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো পিছিয়ে পড়া ফ্রান্সকে ২-২ সমতায় ফিরিয়েছিল রাইট ব্যাক পাভার্দের মন-ভোলানো গোল। পরে এমবাপ্পের জোড়া গোলের আড়ালে খানিকটা হারিয়ে গেছে সেটা। তবে এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে জ্বলে উঠলেন ভারান, ২-০ জয়ের প্রথম গোলটা এই সেন্টার ব্যাকেরই। আর মঙ্গলবার সেই কাজটাই করলেন তাঁর রক্ষণসঙ্গী উমতিতি। সেমিফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণী গোলটা এলো এই স্টপারের মাথা ছুঁয়ে। কোচ দিদিয়ের দেশম অবশ্য বেশি খুশি আসল কাজটা নিয়ে, ‘রক্ষণটা দারুণ হচ্ছে আমাদের। বিশেষ করে আজ তো আমাদের রক্ষণদুর্গকে অনেকটা গভীর পর্যন্ত সামাল দিতে হয়েছে; কারণ বেলজিয়াম দলটা খুবই দক্ষ। পরিকল্পনাটা ছিল, ওদেরকে কোনো জায়গা না ছাড়ার, কারণ ওরা সবাইকেই ভুগিয়েছে, এমনকি ব্রাজিলকেও।’

দুই বছর আগে নিজেদের মাঠে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপেরও ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। কিন্তু সেবার ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। পর্তুগালের কাছে একমাত্র গোলের হারটা রক্ষণের ক্ষণিকের ভুলেই হয়েছিল। এবারও যে সে রকম ভুল হয়নি তা নয়। তবে মাঝেমধ্যে যে দুয়েকটা ভুল হচ্ছে, সেগুলো আবার শুধরে দিচ্ছেন অধিনায়ক হুগো লরি। গোলবারের নিচে যেন দেয়াল হয়ে উঠেছেন তিনি।

তবে ফরাসি রক্ষণদুর্গের চেহারাটা বদলে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত ভারানের। ঊরুর পেশিতে চোট পাওয়ায় ইউরো-২০১৬ খেলা হয়নি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী এই স্টপারের। সেবার তাঁর বিকল্প হিসেবে নীল জার্সিতে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন স্যামুয়েল উমতিতি। ক্লাব ফুটবলের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার এ ডিফেন্ডারের সঙ্গে এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত একটা জুটি গড়েছেন সেই ভারান। কোচ দেশম আবার রীতিমতো একটা জুয়া খেলে তাঁদের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন পাভার্দ আর লুকাস হার্নান্দেসকে। তাঁরা দুজনও আসলে সেন্টার ব্যাক, কিন্তু নিয়মিত দুই উইং ব্যাক বেনজামিন মেন্দি আর জিব্রিল সিদিবেকে না খেলিয়ে দুই উইংয়ে তাঁদের জুড়ে দিয়ে রক্ষণটাকে আরো জমাট করেছেন ফ্রান্সের কোচ। কৌশলটা কাজে দিচ্ছে, আর ফরাসি ডিফেন্স অকেজো করে রাখতে পেরেছে মেসি-সুয়ারেস-লুকাকু-হ্যাজার্ডদের, ফ্রান্সও পেয়েছে জয়। ২৫ বছ বয়সী ভারান নিজে অবশ্য মনে করেন, রহস্যটা অভিজ্ঞতায়, ‘২০১৬-র মতোই গতি আছে আমাদের দলে। তবে দলটা এখন অনেক পরিণত, খেলোয়াড়দের সবার অভিজ্ঞতা বেড়েছে।’ নিজের গুরুত্বটা কোনোভাবেই আলাদা করে দেখাতে চান না তিনি, ‘আমি মোটেই সৌভাগ্যের প্রতীক নই। সেবার খেলতে পারিনি, তাই এবার ফাইনালে ওঠাটা খুব জরুরি আমার কাছে, আর আশা করি এবার আমরা অন্য গল্প লিখতে পারব, ফ্রান্সকে বিজয়ীর বেশে বের করে আনতে পারব।’

কিন্তু লা ব্লুজের এই রক্ষণ-নির্ভরতা ভালো লাগছে না সবার। কেউ কেউ তো ভাবছেন, এর ফলে খেলার সৌন্দর্যটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!

বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়া যেমন বলছিলেন, ‘আজকের (মঙ্গলবার) ম্যাচের ফলটা ফুটবলের জন্যই এক লজ্জা! আমি তো মোটেই বলব না যে আজ যারা জিতেছে তারাই সেরা দল ছিল। ঘটনা হলো, ওরা রক্ষণে খুব ভালো ছিল, পোস্টের সামনের ৩৫ গজে ভালো করেছে বলেই জিতেছে।’ গোলের খেলা ফুটবলে হ্যাজার্ড-লুকাকু-মেসি-সুয়ারেস-গ্রিয়েজমান-এমবাপ্পেদের শিল্পকর্মই দেখতে চান দর্শকরা।  উমতিতি-ভারানরা একদিকে সেই শিল্পকে গড়ে উঠতে দিচ্ছেন না নিজেদের সীমানায়, অন্যদিকে আবার প্রতিপক্ষের সীমানায় নিজেদের দলের শিল্পীদের কাজটাও মাথা পেতে নিচ্ছেন! এটা কারই বা ভালো লাগে! রয়টার্স, এএফপি



মন্তব্য