kalerkantho


নেইমারের আনন্দ জাগাচ্ছে দলকেও

নোমান মোহাম্মদ, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



নেইমারের আনন্দ জাগাচ্ছে দলকেও

অপেক্ষা ছিল নায়কদের জন্য। মহানায়কদের জন্য। ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সির গর্বিত উত্তরাধিকারদের জন্য। ঘড়ির কাঁটায় মিনিট পেরোয়, ঘণ্টা পেরোয়। এক থেকে গড়িয়ে দুই ঘণ্টাও যায় চলে। অবশেষে সেন্ট পিটার্সবার্গের মিক্সড জোনে দেখা মেলে তাঁদের। নেইমারের। ফিলিপে কৌতিনিয়োর। গাব্রিয়েল জেসুসদের।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলন হয় নিয়ম মেনে। ঠিক তেমনি ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে হোটেলে যাওয়ার বাসে ওঠার পথে ফুটবলাররা একটি করিডর পেরিয়ে যান। এটিই মিক্সড জোন। সেখানে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে স্পর্শের দূরত্বে থেমে কথা বলেন। কোস্টারিকার বিপক্ষে রোমাঞ্চকর জয়ের পর ব্রাজিলের মহাতারকা নেইমার অবশ্য কাল কথা বললেন না। জেসুস দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, ম্যাচসেরা কৌতিনিয়ো অনেকক্ষণ, অধিনায়ক থিয়াগো সিলভার তো কথাই শেষ হয় না। শুধু নেইমার কিছু বলেন না। নিজের মতো করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন মিক্সড জোন থেকে।

তাঁর চোখের কোলটি কি তখনো খানিকটা ভেজা!

হয়তো চোখের ভুল। হয়তো কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচ শেষের কান্নাটাই মনে গেঁথে রয়েছে বলে মনে হয়েছে অমনটা। ওই অশ্রুবিন্দুতে সমালোচকরা কত কিছু খুঁজে পাবেন! তাঁর অপেশাদারের মতো আবেগে ভেসে যাওয়া; তাঁর মানসিক ভঙ্গুরতা। কিন্তু নেইমারের চোখের ওই চিকচিকে বিন্দুতে আনন্দ, স্বস্তি, উচ্ছ্বাসের বাঁধভাঙা প্রকাশও তো ছিল। দুঃসময়ের প্রহর পেরিয়ে আবার সুসময়ে ফেরার ঘোষণাও তো ছিল। তাঁর নিজের। ব্রাজিলেরও।

এই কান্না নিয়ে অনেক কথা। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে কোচ লিওনার্দো বাক্কি তিতেকে জবাব দিতে হয়েছে যার। এ খেলার অধিনায়ক থিয়াগো সিলভার কান্নার ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন ছিল সাংবাদিকের। কোচ সেটিকে আমলেই নিতে রাজি নন। কালও সেন্ট পিটার্সবার্গের সংবাদ সম্মেলনে নেইমারের কান্না নিয়ে প্রশ্নে বিচলিত নন তিতে। তিনি বরং এর ভিন্ন ব্যাখ্যাও খুঁজে পান, ‘আমি এটি নিয়ে মোটেও চিন্তিত নই। নেইমার যে ব্রাজিলকে প্রতিনিধিত্ব করার আনন্দ, তৃপ্তি ও গর্বের প্রকাশ সবার সামনে করতে পেরেছে, সে জন্য আমি বরং গর্বিত।’

মিক্সড জোনে অন্য ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা কথা বলছেন। বাংলা-ইংরেজি শোনায় অভ্যস্ত কানে তা ঠেকে পাখির কিচিরমিচিরের মতো। নেইমার ওখানে কিছু বলেননি। তবে টিম বাসে উঠতে না উঠতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পোস্ট দিয়েছেন। কোচের ব্যাখ্যার সঙ্গে যার কোনো অমিল নেই, ‘এ কান্না আনন্দের, কঠিন সময় পেরিয়ে আসার এবং জয়ের ইচ্ছে ও প্রতিজ্ঞার। আমার জীবনে কোনো কিছুই সহজ ছিল না। সামনেও সে অবস্থার পরিবর্তন আশা করি না। আমাদের স্বপ্ন তাই অব্যাহত আছে। না স্বপ্ন না, এটি লক্ষ্য।’

স্বপ্নই বলুন বা লক্ষ্য—সেটি তো ওই বিশ্বকাপ জয়ই।

অথচ তা কী গোলমেলে অবস্থার মধ্যেই না পড়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল! কোস্টারিকার বিপক্ষে গোল যে কিছুতেই আদায় করতে পারছিল না ব্রাজিল! দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ঢেউয়ে কোস্টারিকার গোলপোস্টে বন্যা বইয়ে দেওয়ার পরও। শেষ পর্যন্ত ইনজুরি সময়ে কৌতিনিয়ো ও নেইমারের গোলে চেপে রাখা দম ফেলার ফুরসত পায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। প্রথম গোলের পর তো উল্লাস উদ্যাপন করতে গিয়ে মাঠেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন তিতে। তবু দ্বিতীয়ার্ধের ওই শাণিত ব্রাজিল নিয়ে বড্ড খুশি কোচ, “বিরতির সময় আমি ছেলেদের সঙ্গে কৌতুক করে বলছিলাম, ‘আমার দিকে দেখো। আমি ৫৭ বছরের বৃদ্ধ। এর পরও বল পাস দিতে পারি। এভাবে প্রেস করতে পারি। তোমরাও তাই কোরো।’ সত্যি, দ্বিতীয়ার্ধে অসাধারণ সুন্দর ফুটবল খেলেছি আমরা।”

গোলের জন্য অবশ্য ইনজুরি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না ব্রাজিলকে; যদি না ৭৮তম মিনিটে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দিয়েও তা ভিএআরের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতেন রেফারি। এ নিয়ে অভিযোগ নেই তিতের, তবে অভিমতটা জোরালো, ‘আমি যদি রেফারি হতাম, তাহলে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বদলাতাম না। কিন্তু এটি একেকজন একেকভাবে দেখেন। আমাদের ম্যাচ জয়ের জন্য রেফারির প্রয়োজন নেই। আমরা কেবল চাই, পুরো ব্যাপারটি যেন ন্যায্য হয়। আবারও বলছি, আমরা রেফারির সাহায্য চাই না। আমাদের খেলোয়াড়দের কারোই সাহায্য প্রয়োজন নেই। আমরা বরং নিজেদের খেলায় আরো দক্ষ হতে চাই।’

সেই দক্ষতার প্রাণভোমরা নিঃসন্দেহে নেইমার। নিজের সেরাতে ফেরার ইঙ্গিত তাঁর কালকের খেলায়। ম্যান অব দ্য ম্যাচ কৌতিনিয়োও সংবাদ সম্মেলনে বলে যান সে কথা, ‘বাজে এক ইনজুরিতে পড়েছিল নেইমার; এরপর খুব কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে গেছে। এখন খেলার মাঠে ওর আনন্দ ফিরে এসেছে। সেটি দলের মাঝেও সংক্রমিত হচ্ছে। নেইমারকে ফিরতে দেখে, গোল করতে দেখে আমরা সবাই খুব আনন্দিত।’ আনন্দের রেশ কোচ তিতের কণ্ঠেও, ‘নেইমারের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ঝলক তখনই দেখা যাবে যদি পুরো দল ভালো খেলে। একজন খেলোয়াড়ের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যায় না। নেইমার সাড়ে তিন মাস খেলার বাইরে ছিল। এর পরও পুরো ম্যাচ খেলেছে। ও তো মানুষ। নিজের সেরাতে পৌঁছানোর জন্য ওর কিছু সময় লাগবে। নেইমার সে পর্যায়ে পৌঁছার আগে আমাদের দলের আরো শক্তিশালী হতে হবে এবং ওর ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না।’ এরপর কথার তোড়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে সবাইকে জবাবটা শুনিয়ে দিয়েছেন তিতে, ‘নেইমার কি এ বিশ্বকাপে নিজের সেরাতে পৌঁছতে পারবে? হ্যাঁ পারবে।’

অন্য দলগুলোর জন্য সেটি অশনিসংকেতই বটে!



মন্তব্য