kalerkantho


নেইমার খেলবেন নেইমারের মতোই

নোমান মোহাম্মদ সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২২ জুন, ২০১৮ ০০:০০



নেইমার খেলবেন নেইমারের মতোই

তিন গোলরক্ষক নেই শুধু। মাঠের সবুজের মাঝে সাদা বৃত্তে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বাকি ২০ জন। এর মধ্যেও তাঁকে চেনা যায় আলাদা করে। অমন ব্লন্ড চুল যে নেই আর কারো! নেইমারের মতো অমন জাদুকরই বা কে আছেন ব্রাজিলে!

তাঁর একপাশে মার্সেলো, অন্যপাশে পাউলিনিয়ো। মার্সেলো দৌড়ে চলে গেলেন আরেক দিকে; সে জায়গা নিলেন ফ্রেদ। সতীর্থদের সঙ্গে শুরু ওয়ার্মআপ। ডান হাত পেছনের দিক দিয়ে বাঁ পায়ের দিকে নিয়ে; বাঁ হাত ডান পায়ের দিকে। এরপর কোমরে হাত দিয়ে অ্যাঙ্কেল ঘোরানো। খানিক বাদেই মাঝমাঠ থেকে ডেকে পুরো দলকে ডেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামের টাচলাইনের দিকে নিয়ে এলেন ট্রেনার। ওই লাইনে নেইমার বেশ পেছনে। হঠাৎ বল হাতে নিয়ে দৌড় শুরু করেন। থিয়াগো সিলভা, ফিলিপে কৌতিনিয়ো, কাসেমিরো— সবাইকে পেরিয়ে যান একে একে। লম্বা চুলের লেফট ব্যাক ফেলিপে লুইসের পেছনে গিয়ে বল ছুড়ে মারেন গায়ে। ছেলেমানুষি এ দুষ্টুমিতে এরপর কী হাসি! মার্সেলোও এসে যোগ দেন তাতে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের ‘ফ্লাইং সসার’ নাম পেয়ে যাওয়া নতুন স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন শূন্য। ব্রাজিলের অনুশীলন দেখার সুযোগ নিয়ে শ তিনেক সাংবাদিকই তখন দর্শক। বল পায়ে নেইমারের কারিকুরি দেখার অপেক্ষা তাঁদের। সতীর্থদের মতোই নীল ট্রেনিং জার্সি তাঁর গায়ে; কাঁধ থেকে হাতার ওপরের দিকের পুরোটাই সবুজ। নীল শর্টস। সাদা মোজার সঙ্গে সাদা বুট। তাঁর জাদুকরী ফুটবল দেখার অপেক্ষায় ছিল হৃদয়; কিন্তু মস্তিষ্ক ঠিকই বলছিল, উন্মুক্ত ট্রেনিং সেশনে অমন কিছু করবেন না নেইমার। করেনওনি। কোচ লিওনার্দো বাচ্চি তিতের নির্দেশ মেনে ৪-৩-৩ ফরমেশনে আক্রমণভাগের বাঁ পাশে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। এখানে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পায়ে বল থাকলে কিভাবে পায়ে পায়ে একই ছন্দে একই দিকে সরে যেতে হবে, সেটি দেখান কোচ। অনুগত শিষ্যের মতো তা পালন করেন নেইমার। এরপর প্রতিপক্ষ বল ছেড়ে দিলে কিভাবে সেদিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, সেই ড্রিল। ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন নেইমার।

মহাকাল থমকে গেলেই ভালো হতো। কিন্তু সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত ১৫ মিনিট সময় যে শেষ ততক্ষণে!

ফিরে যাই তাই কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া সংবাদ সম্মেলনে। কোচ তিতের দার্শনিকতায় বুঁদ হই আরেকবার। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে যাচ্ছেতাই খেলেছেন নেইমার। এরপর অনুশীলন করেননি এক দিন; পরদিন ফিরলেও বেরিয়ে যান মিনিট দশেক পর। কোস্টারিকার বিপক্ষে তাঁর খেলা নিয়ে ধোঁয়াশা তাই ছিলই। তিতে নিশ্চিত করে দিলেন যে, নেইমার খেলছেন। আর বিধ্বংসী শ্রেষ্ঠত্বে প্রত্যাবর্তনের পথে রয়েছেন বলেও জানালেন, ‘সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পায়ে ও সামান্য ব্যথা পেয়েছে। এটি স্বাভাবিক। কেননা ইনজুরিতে পড়ার পর সাড়ে তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম ও ৯০ মিনিট শেষ করল। আমরা ওকে নিয়ে শান্ত আছি। জানি যে, পুরোপুরি ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পেতে অন্তত পাঁচ ম্যাচ লাগবে।’

সেই পাঁচ ম্যাচের তিনটি এরই মধ্যে খেলা সারা। ফেব্রুয়ারিতে প্যারিস সেন্ট জার্মেইর হয়ে ব্যথা পাওয়ার পর অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হয়েছে নেইমারকে। ফেরার পর দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছেন ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। গোল করেছেন দুই ম্যাচেই। বিশ্বকাপে সুইসদের বিপক্ষে গোল পাননি। শুধু তা-ই নয়, তাঁর খেলায় ব্যক্তিগত কারিশমা দেখানোর ঝোঁকও দেখা গেছে দৃষ্টিকটুভাবে। নিজের কথা না ভেবে দলের খেলায় মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ নেইমারকে দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নও তাই ছুটে যায় কোচের দিকে। তিতে তা উড়িয়ে দেন দৃপ্ত কণ্ঠে, ‘আমি কখনোই এমন কিছু ওকে বলিনি। বলবও না। ফুটবল দলীয় খেলা সত্যি, একই সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেরও। প্রতি খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য মিলিয়েই দলের খেলা হয়। নেইমার গ্রেট এক ফুটবলার। কোচ হিসেবে ওর কাছ থেকে ফুটবলীয় কারিশমা আমি কেড়ে নিতে পারি না।’

নেইমার তাই খেলবেন নেইমারের মতোই। সমালোচনার স্রোতের বিপরীতে কোচের সমর্থন পাচ্ছেন প্রবলভাবে। ১৫ মিনিটের উন্মুক্ত ট্রেনিং সেশনে জাদুর থলে তো খোলেননি তিনি। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেও বন্ধ ছিল তা। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ না আজই হয়ে যায় সেন্ট পিটার্সবার্গে!

কোস্টারিকার জন্য তাই আগাম সমবেদনা!



মন্তব্য