kalerkantho


যেখানে একাকার ১৮৯৭ থেকে ২০১৮

নোমান মোহাম্মদ সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



যেখানে একাকার ১৮৯৭ থেকে ২০১৮

দুবার মেট্রো বদল করে পার্কের সবুজ পেরিয়ে, বিশাল লেক ছাড়িয়ে, মার্কেট-বাড়িঘর দূরে রেখে গুগল ম্যাপ যে জায়গায় নিয়ে আছড়ে ফেলল, সেটি তো দেখি বিরান ভূমি! এখানে রাশিয়ান ফুটবল জাদুঘর কোথায়!

রাশিয়ায় ফুটবল শুরু সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেখানে ফুটবলের জাদুঘরে থরে থরে সাজানো ইতিহাস—ফিফার লোকজনের কাছ থেকে তেমনটাই তো শুনেছিলাম। ওখান থেকে ঠিকানা নিয়ে রুশ ভাষায় ভরসা না করে আস্থা গুগল ম্যাপ। সেটি দেখছি বড্ড ভুল হলো। দূরে রোমান কলোসিয়ামের মতো কাঠামো দেখা যাচ্ছে বটে। সেখানে গিয়ে কারাতে বা তায়কোয়ান্দো ধরনের একটি খেলার ছবিও দেখলাম। ফুটবলের কিচ্ছুটি নেই। তাহলে?

জিজ্ঞেস করার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর এক বৃদ্ধা হেঁটে এলেন ধীর পায়ে। ফুটবল জাদুঘর যে খুঁজছি, সেটি বোঝাতে যথারীতি গলদঘর্ম। হঠাৎ তাঁর চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস। ‘মুজেইয়ে, মুজেইয়ে’ বলে দেখিয়ে দিলেন বিশাল এক ভবন। ‘মুজেইয়ে’র অর্থ মিউজিয়াম ধরে এগিয়ে দেখি সত্যিই তাই। তবে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। একটি মাত্র পোস্টার সাঁটিয়েই এর চিহ্ন দেওয়া।

আসলে জাদুকর না, ছোট্ট এক ঘরে প্রদর্শনী মাত্র। নাম ‘রাশিয়া, মাই হিস্টোরি’। তবে সেখানে ঠিকই খুঁজে পাওয়া গেল রুশ ফুটবলের ঠিকুজি। রাশিয়ায় প্রথম ফুটবল খেলা হয়েছে এই সেন্ট পিটার্সবার্গে। ইংরেজদের বিপক্ষে স্থানীয় কিছু রুশের অংশ নেওয়ার জার্সিটি সযত্নে সংরক্ষিত কাচের বাক্সে। কমলা রঙের সে জার্সি, গলার দিকে ফিতা প্যাঁচানো। সঙ্গে কালো শর্টস। পাশেই পাম্প চলে যাওয়া কালো রঙের ফুটবল। সাদা ফিতার সেলাই খুলে হাঁ হয়ে আছে। এই বল দিয়েই খেলা হয় প্রথম ম্যাচটি; সেই কবে! ১৮৯৭ সালে।

এই শহরের বড় ক্লাব এখন জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গ। সাম্প্রতিক সময়ে এখানকার সবচেয়ে বড় তারকা আন্দ্রেই আরশাভিন। ২০০৮ ইউরোতে আলো ছড়িয়েছেন; ইংল্যান্ডের আর্সেনালে গিয়েও দারুণ খেলেছেন কয়েক মৌসুম। এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ছবিও রয়েছে এই জাদুঘরে; আর ঝুলছে তাঁর লাল-সাদা বুট। সেই বুটের ওপর আরশাভিনের সই। এগুলো কাচবন্দি। প্রমাণ সাইজের পোস্টারে দেখা যাচ্ছে আর্তেম জুবাকে। সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে যে গোল দিয়েছিলেন তিনি, সেটিও মনে করিয়ে দেন এখানকার প্রশাসক আলেক্সান্দার বেলিউইচ।

আলেক্সান্দারের কোনো কথাই বোঝার উপায় নেই; অনরবত বকবক করছেন রুশ ভাষায়। তা ইংরেজিতে অনুবাদ করছেন ট্যুর গাইড ফারিজা বেতাকুভা। দেখালেন ১৯৮৫ সালের জেনিতের চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পেপার কাটিং। এখানকার আরেক কিংবদন্তি আলেক্সান্দার কাজাকভের ১১ নম্বর জার্সি পরা ছবি এবং অটোগ্রাফ। ২০০৮ সালে ২৯ আগস্ট চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-জেনিতের ম্যাচের স্যুভেনির। এ শহরের আদি ক্লাব দিনামো লেনিনগ্রাদের জার্সি। পুরনো দিনের পোস্টার। আরো কত কী!

আছেন কাচবন্দি কিরিল লাভরনও। তাঁকে না চেনাটা যেন অপরাধ। এখানকার বিখ্যাত অভিনেতা তিনি। সেন্ট পিটার্সবার্গ তো থিয়েটারের শহরও। এখানকার থিয়েটারগুলো নিয়েও হয় ফুটবল প্রতিযোগিতা, যে চ্যাম্পিয়নশিপের নামকরণ ওই লাভরনের নামে। শিশুদের আঁকা কিছু ছবিও রয়েছে একদিকে। একটি ছবি হৃদয় নাড়িয়ে দেয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবরুদ্ধ অবস্থায় রুশদের ফুটবল খেলার ছবি তা।

ফুটবল জাদুঘর যখন, সেখানে পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনা না থাকলে চলে! রয়েছেন তো তাঁরা দুজনও। সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই ফুটবলার একই ছবিতে ফ্রেমবন্দি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে। এ বিশ্বকাপ উপলক্ষেই তোলা ছবিটি। সামনে ২০১৮ আসরের বল।

‘রাশিয়া, মাই হিস্টোরি’র ‘ফুতবল মুজেইয়ে’তে এভাবেই একাকার হয়ে যায় ১৮৯৭ থেকে ২০১৮!



মন্তব্য